সুবীর বলল, ‘ইনভেনশানের ইতিহাসে গিনিপিগ অমর হয়ে গেল।’
সোনি বলল, ‘ ”গিনিপিগ”—কী কিউট নেম!’
জিনিয়া তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘ওর কথা ছাড়ুন তো! এই মেনিটার আমি নাম দিয়েছি ”মিন্টি”।’ তারপর বেড়ালটাকে ‘মিন্টি! মিন্টি!’ বলে আদুরে গলায় ডেকে কোলে নেওয়ার জন্যে হাত বাড়াল। সঙ্গে-সঙ্গে হতভাগা বেড়ালটা মেঝে থেকে একলাফে জিনিয়ার কোলে চড়ে বসল। ‘মিঁউ-মিঁউ’ করতে লাগল।
নেহাত আমার এক্সপেরিমেন্টে প্রায়ই মালটাকে কাজে লাগে তাই। নইলে এটাকে আমি লাথি মেরে বাড়িছাড়া করতাম। যখন তখন বাড়ির যেখানে সেখানে নোংরা করে!
গ্যারাজের এককোণে রয়েছে একসেট টেবিল-চেয়ার আর একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার। এ ছাড়া বাকি স্পেসটা একেবারে ছন্নছাড়া। ছুরি, হাতুড়ি, স্ক্রু ড্রাইভার, সলডারিং আয়রন আর হাজাররকম যন্ত্রপাতি এখানে সেখানে ছড়ানো। সোনি আমার যন্ত্রগুলো দেখে ‘গৌরী বালিকা’ হয়ে গেল। ওর সেকী আনন্দ, সেকী খুশি!
ও প্রশ্নে-প্রশ্নে আমাকে পাগল করে তুলল। জিনিয়া সামনে থাকায় আমি মনের উচ্ছ্বল আবেগ চেপে বিজ্ঞানীর গাম্ভীর্য বজায় রেখে ছোট-ছোট জবাব দিতে লাগলাম। কোথা দিয়ে সময় গড়িয়ে গেল টেরই পেলাম না।
সুবীর আর সোনি যখন চলে গেল তখন রাত দশটা। সন্ধেটা কী দারুণ কাটল ভেবে আমি তৃপ্তির নেশায় ডুবে গেলাম। অনেক রাতে সোনিকে ফোন করলাম।
আমার ফোন চলতে লাগল। সোনির আসা-যাওয়াও। আমার আবিষ্কার নিয়ে ওর এনথুর দেখলাম শেষ নেই। ওর কাছে আমার গ্যাজেটগুলোর মেকানিজম এক্সপ্লেইন করতে-করতে আমি ক্লান্ত হতাম না। কোথা থেকে যেন অফুরান এনার্জি আমার শরীর আর মনে ঢুকে পড়ত।
সোনি আমার ল্যাবের সব যন্ত্রপাতিগুলো দেখতে-দেখতে প্রায়ই বলত, ‘ইনভেন্টর, ইউ আর আ জিনিয়াস!’
ওর ‘ইনভেন্টর’ সম্বোধনে আমি খুশি হতাম। জিনিয়াস বলাতেও। কিন্তু ‘জিনিয়াস’-এর মধ্যে ‘জিনিয়া’ অংশটুকু আমার মনে কাঁটার মতো খচখচ করত।
সোনি আর সুবীরকে আমার সব মেশিন দেখালেও টাইম মেশিনটা দেখাইনি। আর বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন সাকার হয়ে গেলে তারপর হয়তো দেখাব। আর মেশিনটা দেখিয়ে জিনিয়াকে বহু আগেই বলে দিয়েছি, এই উদ্ভট বেআক্কেলে যন্ত্রটা চিরকালের জন্যে অকেজো হয়ে গেছে।
সোনির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের ধরনটা জিনিয়া ঠিক বুঝতে পারেনি। আমার বিজ্ঞান নিয়ে ওর অ্যাপ্যাথি যেমন অবিচল, তেমনই সোনির ব্যাপারটা ও সবসময় দ্রৌপদী সিনড্রোমের আলোকে বিশ্লেষণ করতে লাগল। ওর নৃত্যকলা আর নৃত্যনাট্য চর্চার ফাঁকে-ফাঁকে আমাকে ও হুল ফুটিয়েই চলল।
এক-একসময় ব্যাপারটা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠত। তখন সেই পুরোনো বাজে চিন্তাটা মাথায় ধাক্কা মারত।
একদিন ঝোঁকের মাথায় ঠিক করেই ফেললাম, একটা খুন করব। এটা হবে আমার মার্ডার সিরিজের প্রথম এক্সপেরিমেন্ট।
আমি বেচারা সতুকে বেছে নিলাম। না, খুন করার জন্যে নয়। মানে, ওর বাড়িতে টার্গেট করলাম।
এর প্রথম কারণ, ওর সোদপুরের বাড়িতে আমি দু-চারবার গেছি।। ওর বোনের বিয়েতেও গিয়েছিলাম। সুতরাং বাড়িটার জিয়োগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশান আমার জানা।
আর দ্বিতীয় কারণ, ও একটা টিয়াপাখি পোষে। ওই পাখিটাই হবে আমার প্রথম টার্গেট। ভিকটিম নাম্বার ওয়ান। কিন্তু পাখিটাকে খুন করতে পারব তো? উঁহু, কিন্তু-কিন্তু করলে চলবে না। আমাকে পারতেই হবে।
আমার ইদানিংকার অ্যাক্টিভিটি সতু আর তারকের চোখে খুব একটা যে ভালো ঠেকছিল না সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম। দোকানে ঠিকমতো যাই না। মালপত্র পারচেজের ব্যাপারে গাফিলতি। এমনকী পাওনা টাকা তাগাদার ব্যাপারেও আগের মতো উৎসাহ দেখাই না।
কিন্তু আমি ওদের অবাক চোখকে আমল দিইনি।
আমি সতুর সঙ্গে দু-দিন ধরে গল্প জুড়ে দিলাম। দোকানে বসে তেলেভাজা-মুড়ি বা অন্য কিছু আনিয়ে আমি, সতু আর তারক সান্ধ্য টিফিন সারি আর গল্প করি। কখনও-কখনও মাটন রোল-টোলও আনাই।
গল্প করে-করে সতুর বাড়ির টোপোলজিটা ভালো করে ঝালিয়ে নিলাম। জেনে নিলাম, টিয়াপাখিটা কখন একা থাকে, রাতে খাঁচাটা কোথায় রাখা হয়, বেড়ালের ভয় আছে কি না, সদর দরজা রাতে কীভাবে বন্ধ করা থাকে, ভেতর থেকে তালা দেওয়া থাকে কি না ইত্যাদি।
এইরকম খোঁজখবর করে টিয়াপাখির ইনফরমেশান ফাইল কমপ্লিট হওয়ার পর কাজে নামলাম।
একটা ছোট তোয়ালে আর টর্চলাইট সঙ্গে নিয়ে আমি একদিন রাতে দশমিনিটের জন্যে ভবিষ্যতে উধাও হলাম। সোজা গিয়ে হাজির হলাম সতুর বাড়ির উঠোনে।
খাঁচাটা উঁচুতে একটা হুকে ঝুলছিল। তার ওপরে একটা পুরোনো শাড়ি ঢাকা দেওয়া। আমি শাড়িটা সাবধানে সরালাম। তারপর বাঁ-হাতে টর্চ জ্বেলে তোয়ালেসমেত ডানহাতটা খাঁচার ভেতরে ঢোকালাম।
হঠাৎ আলোয় টিয়াপাখিটার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। আমি ওটাকে তোয়ালেসমেত সাপটে বাইরে বের করলাম।
পাখিটা একবার চাপা চিৎকার করে উঠল।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কেউ যদি জেগে ওঠে!
একটা টিয়াপাখি খুন করতে এসে যে এত ভয় করতে পারে সেটা আগে বুঝিনি। আমার হাত কাঁপতে লাগল, বুকের ভেতরে ধড়াস-ধড়াস শব্দ, কান ভোঁ-ভোঁ করছে। সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। যা করার জলদি করতে হবে। দশমিনিট শেষ হতে এখনও অনেক দেরি।
