তার সঙ্গে ওই গরগর শব্দ।
রোজকার রুটিন থেকে বিশ্বনাথ জানেন, ভিক্টর এখন টয়লেটে যাবে। পারমিতা ট্রেনিং দিয়ে ওকে এটা অভ্যেস করিয়েছে। টয়লেট ব্যবহার করার সময় ভিক্টর একা থাকতে চায়—আশপাশে লোকজন চায় না। অর্থাৎ বিশ্বনাথকে এখন টয়লেটের কাছ থেকে সরে যেতে হবে।
বিশ্বনাথ সরে এলেন।
ভিক্টরের কাছাকাছি হতে ওঁর ভয় করে। কারণ, মাসকয়েক আগে ভিক্টর ওঁর হাতেকামড়ে দিয়েছিল। আলোক আর পারমিতার কাছে সে ঘটনা জানানোর পর ওদের যা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল!
আলোকের কথাগুলো মনে পড়তেই বিশ্বনাথের কান গরম হয়ে উঠল। অপমান আর ধিক্কারের জ্বালা নতুন করে ছুঁচ ফোটাল বুকে।
ঘরে এসে অলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন বিশ্বনাথ। আজ আর বই পড়তে কিংবা টিভি দেখতে ইচ্ছে করল না।
বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে একটা হাত মাথার ওপরে রেখে অন্ধকার সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আলোক আর পারমিতার কাছে বিশ্বনাথের পরিচয় প্রয়োজনহীন নিষ্কর্মা একজন বাড়তি মানুষ। বিশ্বনাথ থাকলেই বা কী, না থাকলেই বা কী! বিশ্বনাথ যে বেঁচে আছেন সেটা কেউ টের পায় না। আবার চলে গেলেও কেউ যে ওঁর অভাব টের পাবে তাও মনে হয় না।
সব মিলিয়ে এক হতচ্ছাড়া জীবন।
সেইজন্যই সন্দীপনের কথাটা মনে পড়ছিল বারবার।
সত্যিই তো! যে-জীবনটা অবহেলা আর অপমানে একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে সেটাকে একটু বদলে নিলে ক্ষতি কী!
বিশ্বনাথের ইচ্ছে হল, এক মুহূর্তে সন্দীপনকে একটা ফোন করেন। কিন্তু উপায় নেই। বেস ফোন আলোকদের ঘরে। আর বিশ্বনাথের মোবাইল ফোন নেই।
কিন্তু সন্দীপনের আছে।
এই নতুন ‘চাকরি’টা নেওয়ার পরই বোধহয় তিনি মোবাইল ফোন কিনেছে।
কমিউনিটি পার্কে রিটায়ার্ড বৃদ্ধদের আড্ডায় সন্দীপন বিশ্বনাথের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কারণ, দুজনের জীবনে অনেকটা মিল আছে।
সন্দীপন বিপত্নীক। ওর এক ছেলে। ছেলে যেমন একরাশ মেয়েবন্ধু জুটিয়ে ফূর্তিফার্তা করে, ছেলের বউও একই টাইপের। দুজনে একেবারে যেন রাজযোটক। সন্দীপন ওদের সঙ্গে কোনওরকমে টিকে আছেন।
সেইজন্যই বিশ্বনাথের সঙ্গে সন্দীপনের সুখ-দুঃখের কথা হয় বেশি।
আজ সন্ধেবেলা পার্কে বসে সন্দীপনের কাছে ব্যাপারটা শোনার পর বিশ্বনাথ হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। একটা ভয়ংকর ধাক্কা খেয়েছিলেন।
কিন্তু যতই ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করছেন ততই মনে হচ্ছে, সন্দীপন ঠিকই করেছেন।
প্রথমত, এই ‘চাকরি’টা নিলে একটা কাজের মধ্যে থাকা যাবে। আর দ্বিতীয়ত, আর্থিক টানাপোড়নের জায়গাটা অনেক নরম আর সহজ হয়ে যাবে। তা ছাড়া, এখন যে-জীবনে বিশ্বনাথ হাঁটছেন—হাঁটছেন কি না কে জানে!—তার ডাকনাম হয়তো ‘জীবন’, কিন্তু পোশাকী নাম যে ‘মরণ’ সেটা ক’জন বুঝবে!
বিশ্বনাথ ভেবে দেখলেন, মরে থাকা মানুষ আর মরতে পারে না। তাই ঠিক করলেন, কাল রাস্তায় বেরিয়ে সন্দীপনকে ফোন করবেন।
বাড়িটার বাইরের চেহারাটা যে ছদ্মবেশ সেটা বোঝা গেল ভেতরে ঢোকার পর। বাইরেটা যেমন জরাজীর্ণ, আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ো, ভেতরটা ততটাই উলটো—ঝকঝকে, স্মার্ট। এটাই ‘শটস অ্যান্ড বিকস’-এর অফিস।
রাস্তার ফোনবুথ থেকে সন্দীপনকে ফোন করে একটা কোম্পানির নাম আর একটা সেল ফোনের নম্বর নিয়েছিলেন বিশ্বনাথ। তারপর দুরুদুরু বুকে সেই নম্বরে ফোন করেছেন।
‘হ্যালো…”শটস অ্যান্ড কিকস”?’
‘ইয়েস।’ একটা মেয়েলি গলা উত্তর দিল, ‘আপনি কে বলছেন?’
বিশ্বনাথ নাম বললেন।
‘এই ফোন নাম্বারটা আপনাকে কে দিয়েছেন—রেফারেন্সটা কাইন্ডলি বলবেন?’
বিশ্বনাথ সন্দীপনের নাম-ঠিকানা বললেন।
সঠিক রেফারেন্স না দিতে পারলে কথাবার্তা যে সেখানেই শেষ সেটা সন্দীপন বারবার করে বিশ্বনাথকে বলে দিয়েছেন। বলেছেন যে, ওরা স্রেফ ‘রং নাম্বার’ বলে লাইন কেটে দেবে।
ও-প্রান্তে মেয়েটি একটু সময় নিচ্ছিল। বোধহয় কম্পিউটারের ডেটাবেস-এ সন্দীপনের নাম-ঠিকানাটা ক্রসচেক করে নিচ্ছিল।
একটু পরেই: ‘ও. কে., মিস্টার বোস, বলুন কীভাবে আপনাকে আমরা হেলপ করতে পারি—।’
বিশ্বনাথ বেশ চেষ্টা করে বললেন, ‘আমি সি. ভি. অপারেশান করাতে চাই।’
এ-কথা শুনে মেয়েটির যান্ত্রিক গলা একটুও কাঁপল না। ও বলল, ‘আপনার ফুল পোস্টাল অ্যাড্রেস দিন আর আপনার মায়ের বিয়ের আগের পদবী বলুন।’
বিশ্বনাথ নিজের পুরো ঠিকানা বললেন। তারপর আমতা-আমতা করে জানতে চাইলেন, ‘আমার মায়ের মেইডেন সারনেম? মা তো বহু বছর আগে মারা গেছেন…তাঁর বিয়ের আগের…।
মেয়েটি বিশ্বনাথকে বাধা দিয়ে বলল, ‘একটা-দুটো অফবিট পারসোনাল ইনফরমেশান আমরা ডেটাবেস-এ স্টোর করে রাখি, মিস্টার বোস। আমাদের কোনও পেশেন্ট ওভার দ্য ফোন কোনও ইনফরমেশান চাইলে আমরা তাঁর টেলিফোনিক পারসোনাল আইডেন্টিফিকেশান নাম্বার ছাড়াও দু-একটা পারসোনাল ইনফো ক্রসচেক করে নিই—সেইজন্যেই আপনার মায়ের মেইডেন সারনেমটা দরকার। যদি বাই চান্স কেউ আপনার টি-পিন নাম্বারটা জেনেও যায়, সে আপনার নাম করে ফোন করেও আমাদের কাছ থেকে আপনার কোনও প্রাইভেট ইনফো বের করতে পারবে না।’ একটু দম নিল মেয়েটি। তারপর বলল, ‘দিস ইজ অ্যাবসোলিউটলি ফর প্রোটেকশান অফ ইয়োর প্রাইভেসি, মিস্টার বোস। আই হোপ ইউ উইল আন্ডারস্ট্যান্ড…।’
বিশ্বনাথ বুঝলেন, কিন্তু একইসঙ্গে অবাকও হলেন। এত সতর্কতা কীসের জন্য?’
