জিতেনকে দেখে আমার বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক কষ্ট হচ্ছিল। ওর মধ্যে এত আকাঙক্ষা, এত স্বপ্ন…অথচ…।
ভাবলাম, ওকে বলি, ‘তুমি আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাও—’ কিন্তু তাতে কোনও লাভ নেই। শিবনাথরা সহজে ওকে ছাড়বে না। ওকে তাড়া করবে। দরকার মতো ছদ্মবেশ পালটে-পালটে ওকে অনুসরণ করবে। তারপর প্রথম সুযোগেই। ওকে খতম করবে।
আমার ভীষণ মনখারাপ লাগছিল—সুবীরদা আমেরিকা চলে যাওয়ার সময় যেরকম মনখারাপ লেগেছিল।
কথা বলতে-বলতে জিতেন কতবার যে বলল, ‘রিনি, তোমরা খুব ভালো। কত সহজে অচেনা লোককে আপন করে নাও।’
জিতেন আমাকে নানা কথা জিগ্যেস করছিল। ‘বাপি’ কোথায় চাকরি করত, ‘ভাই’ কোন স্কুলে পড়ে, আমি কলকাতার কোন স্কুলে পড়তাম, কোন কলেজে পড়তাম, লেখাপড়া ছেড়ে দিলাম কেন, কলকাতার কোথায় আমরা থাকতাম, আমাদের আত্মীয়স্বজন কোথায়-কোথায় থাকে—এরকম আরও কত প্রশ্ন।
আমি ওর প্রশ্নের যথাসাধ্য উত্তর দিচ্ছিলাম। ঠিকমতো গল্প বানাতে না-পারলে পাশ কাটানো জবাব দিচ্ছিলাম।
আমরা যখন ‘বাপির’ শোওয়ার ঘরের লাইন টেস্ট করছি তখন শিবনাথ কোথা থেকে এসে ঘরে ঢুকল। ওর হাতে সিগারেট। গলাখাঁকারি দিয়ে ও বলল, ‘আজ বাজার থেকে বড়-বড় পাবদা মাছ নিয়ে এসেছি। বলেছি পাবদা মাছের ঝাল রান্না করতে। জিতেন, তুমি পাবদা মাছ খাও তো?’
জিতেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।
এমন সময় ঘরে এসে ঢুকল রমা। ‘বাপি’কে জড়িয়ে ধরে আদূরে গলায় বলল, ‘বাপি’, পাবদা মাছের ঝালের নাম শুনে আমার জিভে জল এসে যাচ্ছে।’
‘বাপি’ রমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘খাবি, খাবি—সময় হোক, খাবি—’
কথাটা বলার সময় ‘বাপি’ জিতেনের দিকে তাকিয়ে ছিল, যাতে আমি অন্তত তার কথার ঠিকঠাক মানে বুঝি।
রমা বলল, ‘আমি আর ওয়েট করতে পারছি না—গন্ধে আমি পাগল হয়ে যাব।’
রমা একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, ছদ্মবেশ ধরে থাকতে রমার এখন কষ্ট হচ্ছে। তাই জিতেনের সামনে থেকে ও পালাল।
এরপর শিবনাথ জিতেনের সঙ্গে ওয়্যাংরি নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিল। জিতেন কাগজ-পেন বের করে ‘বাপি’কে কী-সব হিসেব বোঝাতে লাগল।
একটু পরে ‘বাপি’ চলে যেতেই জিতেন আবার ওর কাজ শুরু করল, আর আমিও ওকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে লাগলাম।
কাজ করতে-করতে যখন বেলা একটা বাজল তখন আমি জিতেনকে স্নান করতে যাওয়ার তাড়া দিলাম।
ও আমার দিকে কেমন একটা চোখে তাকাল। তারপর বলল, ‘খেয়েদেয়ে আবার শুরু করব, কেমন?’
আমি ঘাড় নাড়লাম।
আমি ক্লান্ত পায়ে বসবার ঘরে আসতেই ওরা তিনজন আমাকে ছেঁকে ধরল।
রমা হিংস্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোর সাধ মিটেছে? আমরা আর ওয়েট করতে পারছি না।’
শিবনাথ বলল, ‘শুধু-শুধু দেরি-করেই বা লাভ কী! আজ রাতেই তো সেরে ফেললে হয়…’ ও সমর্থনের আশায় বিনোদের দিকে তাকাল।
বিনোদের গায়ে পলকের জন্যে বড়-বড় লোম দেখা গেল, তারপরই আবার ও গিন্নিবান্নি চেহারার ‘মা’ হয়ে গেল। ও মেয়েলি গলায় আমাকে বলল, ‘রিনি, তোমার যা করার আজ সন্ধের মধ্যে সেরে নাও। জিতেন বেশিদিন আমাদের এখানে থাকলে সবাই সন্দেহ করবে…’
আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম ওদের খিদের সঙ্গে আমি পেরে উঠব না। জিতেন যে কেন মরতে আমাদের বাড়িতে এল।
খাওয়া-দাওয়ার পর কাজ শুরু করতে-করতে প্রায় সাড়ে তিনটে বেজে গেল। আকাশে তখন আবার মেঘ জমেছে, ঝিরঝির করে বৃষ্টিও পড়ছে।
জিতেনের কাছে আসার আগে ওরা তিনজন আমাকে আবার তাড়া দিয়েছে। তার মধ্যে রমা তো বলতে গেলে আমকে একরকম শাসিয়েছে। বলেছে, আমার যদি অন্য কোনও মতলব থাকে তা হলে বিশেষ সুবিধে হবে না।
জিতেনকে যে-ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে সেই ঘরটায় কাজ করছিলাম আমরা।
আশ্চর্য! একটা দিন এখনও পুরো হয়নি, এরই মধ্যে জিতেনের গন্ধে ঘরটা টইটম্বুর।
জিতেন একটা চেয়ারের ওপরে উঠে দাঁড়িয়ে লাইন টেস্টার দিয়ে লাইনটা টেস্ট করছিল। হঠাৎই টাল সামলাতে না-পেরে ওর দেহটা নড়ে উঠল। ও পড়ে যেতে পারে ভেবে আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার হাত-মুখ-বুক সব ওর শরীরে লেপটে গেল। জিতেন খানিকক্ষণ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু আমি গালে টের পাচ্ছিলাম, ওর শরীর আয়তনে বাড়ছে।
জ্বর হওয়া গলায় জিতেন বলল, ‘কেউ এসে পড়বে…।’
‘না, কেউ আসবে না।’
জিতেন তখন সাহস করে আমার বাঁধন ছাড়িয়ে নেমে পড়ল চেয়ার থেকে। লক্ষ করলাম, ওর শরীর কাঁপছে।
ও কোনওরকমে দরজার কাছে গেল। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়েই ফিরে এল আমার কাছে। আমাকে এক ঝটকায় জাপটে ধরে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল। আমাদের শরীরের তাপ বিনিময় হতে লাগল। আমার ছদ্মবেশ ধরে থাকার ক্ষমতা বোধহয় শিথিল হয়ে আসছিল। কারণ হঠাৎই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল ছোট্ট এক টুকরো চাপা গর্জন।
জিতেন চমকে উঠে আমাকে ছেড়ে দিল, অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে।
আমি ছদ্মবেশ সামলে নিয়ে জড়ানো গলায় বললাম, ‘আমি আর পারছি না…’
জিতেনের অবাক ভাবটা পুরোপুরি মিলিয়ে গেল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, ‘এখানে আমার ভয় করছে, রিনি। যদি কেউ হুট করে এসে পড়ে!’
ওকে বলতে পারলাম না যে, কেউ আসবে না। কিংবা এলেও কোনও ক্ষতি নেই। তা হলে ও নির্ঘাত সন্দেহ করবে।
তাই বললাম, ‘সন্ধে হলে আমরা বাইরে কোথাও চলে যাব।’
