জিতেন সায় দিল।
সন্ধের অন্ধকার নেমে আসতেই আমি জিতেনকে নিয়ে বেরোলাম। বেরোনোর সময় শিবনাথ আমাকে আলাদা ডেকে নিল, বলল, ‘বেশি দেরি কোরো না কিন্তু—।’
রমা বলল, ‘উলটোপালটা কোনও মতলব ভেঁজে সুবিধে হবে না।’
আমি বললাম, ‘কোনও ভয় নেই। তোমরা ওকে আস্তই পাবে—।’
তারপর দুজনে বেরিয়ে পড়লাম।
জিতেন কেমন একটু থম মেরে ছিল। বোধহয় আগামী উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ ওর বুকের ভেতরে পাক খাচ্ছিল। ও বারবার মুখ ফিরিয়ে আমাকে দেখছিল।
বৃষ্টি এখন আর নেই। কিন্তু চারপাশে বৃষ্টির আদরের ছোঁওয়া লেগে রয়েছে। গাছের পাতায়, ঘাসে, মাটিতে, আকাশে, বাতাসে—কোথায় নয়!
মেঘ সরে গেছে একপাশে। চাঁদ আবার দেখা দিয়েছে—চতুর্দশীর কিশোরী চাঁদা। গত দু-দিন ও গা-ঢাকা দিয়েছিল।
চাঁদ দেখলে আমাদের কেমন পাগল-পাগল লাগে। আমি জানি, বাড়িতে শিবনাথরা এখন চাঁদ দেখতে শুরু করেছে। কিন্তু আমার ভেতরে এখন সেই অস্থির ব্যাপারটা টের পেলাম না। আমি জিতেনের হাত ধরে ছিলাম। সেই ছোঁওয়া আমাকে পালটে দিচ্ছিল। টের পেলাম, ওর গায়ে কেমন একটা জ্বর-জ্বর ভাব।
ভিজে মাটিতে পা ফেলে গাছপালার ফাঁক দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। অন্ধকারে আমার দেখতে অসুবিধে হচ্ছিল না। জিতেনকে বললাম, ‘আমার হাত ধরে এসো—কোনও ভয় নেই।’
দুটো ধান খেত পেরিয়ে কয়েকটা বড় গাছের জটলার নীচে আমরা দুজনে পাশাপাশি বসলাম।
হঠাৎ একঝলক বাতাস গাছের পাতায়-পাতায় শব্দ তুলল। রাতপাখির ডাক শুনতে পেলাম। আর কোনওরকম ভূমিকা ছাড়াই স্যাঁতসেঁতে মাটির ওপরে আমরা ভালোবাসাবাসি শুরু করলাম।
জিতেন দিশেহারা হাউইয়ের মতো আমাকে এলোমেলো আদর করতে লাগল। মরণাপন্ন দানব যেভাবে প্রাণভোমরা আঁকড়ে ধরতে চায়, ও পাগলের মতো আকুল হয়ে সেই প্রাণভোমরা খুঁজতে লাগল আমার শরীরে।
জিতেন হাঁফাচ্ছিল, দাপাদাপি করছিল, কিন্তু ক্লান্ত হয়নি এতটুকু। ছদ্মবেশ ধরে রাখতে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। মাঝে-মাঝেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছিল চাপা গর্জনের টুকরো। কিন্তু জিতেন সেগুলোকে তৃপ্তির শব্দ বলে ভাবছিল।
পশুপ্রবৃত্তি আমাকে পেয়ে বসল। কোনওরকমে শরীরটাকে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে উলটোদিকে ঘুরে গেলাম। তাতে জিতেনের যেন সুবিধেই হল। ও পেছন থেকে আমাকে আদর করতে লাগল। আর আমি যেন শূন্যে ভেসে যেতে লাগলাম।
চূড়ান্ত মুহূর্তে জিতেন এক ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠল। তখন ওকে হঠাৎই শিবনাথ বলে মনে হল। দু-চারটে পাখি ডেকে উঠল গাছের আড়াল থেকে। আর আমরা আনন্দে কুটিকুটি হয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ আমরা অন্ধকারে চোখ মেলে শুয়ে রইলাম। তারপর জিতেন আমাকে পরম যত্নে চুমু খেতে লাগল। বারবার বলতে লাগল, ‘রিনি, আই লাভ ইউ। তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না….’
আমার কান্না পেল। কারণ, শিবনাথ-রমাদের কথা মনে পড়ছিল। কিন্তু চোখে আমার জল এল না। একটা নাম-না-জানা কষ্ট ভেতরে-ভেতরে মাথা খুঁড়ে মরছিল।
আরও কিছুক্ষণ পর আমরা উঠলাম। আমি মানুষ না অমানুষ সেটাই আমার কাছে গুলিয়ে যাচ্ছিল। জিতেন আমার এই জঘন্য জীবনে একটা নতুন মানে জুড়ে দিয়েছে।
অন্ধকারে গাছপালার আড়াল দিয়ে ফিরতে-ফিরতে নানা কথা মনে হচ্ছিল। জিতেনের গলায় দাঁত বসিয়ে আমি কি ওকে আমাদের একজন করে নিতে পারি না? তা হলে অন্তত ও প্রাণে বেঁচে থাকবে। কিন্তু তখন যে ও সারাটা জীবন আমাকে ঘেন্না করবে, যেমন রাতের ট্রেনের ওই শয়তানটাকে আমি ঘেন্না করি। ওর ঘৃণা সহ্য করে আমার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তার চেয়ে এই ভালো—আমরা দুজন-দুজনকে ভালোবাসি—এটাই শেষ সত্যি হয়ে থাক জিতেনের কাছে।
যখন আমরা বাড়ির প্রায় কাছাকাছি এসে পড়লাম, তখন জিতেনকে বললাম, ‘তুমি আগে চলে যাও। দুজনে একসঙ্গে গেলে মা-বাপি সন্দেহ করবে।’
জিতেন কপট ভয়ের সুরে বলল, ‘ওরে বাবা! এসব জানতে পারলে তোমার বাবা আমাকে খেয়ে ফেলবে।’
জিতেন বুঝতে পারল না, ও কতবড় সত্যি কথাটা বলল।
ওকে বললাম, ‘তুমি বলবে, রিনি গাছপালার আড়ালে কোথায় হারিয়ে গেল। ওকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে আমি চলে এসেছি। তা হলেই হবে—।’
ও আমার ঠোঁটে গভীর চুমু খেল। তারপর বলল, ‘বেশি দেরি কোরো না, তাড়াতাড়ি চলে এসো…।’
আমি হেসে ঘাড় নাড়লাম।
জিতেন অন্ধকার থেকে এগিয়ে গেল আলোর দিকে। সেখানে ওর জন্যে নতুন এক অন্ধকার অপেক্ষা করছে।
এইবার আমার কান্না পেল। আকাশের চাঁদের দিকে তাকালাম। ছদ্মবেশের নিয়ন্ত্রণের কথা ভুলে গিয়ে চারপায়ে দাঁড়ালাম। আমার বুকফাটা হাহাকার জন্তুর গর্জন হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। একে কি কান্না বলে? আমার একমাত্র ভালোবাসার মানুষটার জন্যে কান্না?
ওই বাড়িতে আমি আর ফিরতে পারব না। আমি জানি, সব আলো নিভিয়ে দিয়ে শুরু হয়ে গেছে ওদের নাচ। ওরা পাগলের মতো জিতেনকে ঘিরে নাচছে। আর জিতেন সাদা, ফ্যাকাসে মুখে ওই ভয়ঙ্কর তিনটে প্রাণীর দিকে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরিয়ে আসতে পারছে না। তবে ওর নিশ্চয়ই বৃদ্ধা মায়ের কথা মনে পড়ছে, মনে পড়ছে ছোট-ছোট দুটো বোনের কথা—যাদের ও ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল।
আচ্ছা, জিতেনের আমার কথাও একটু-একটু মনে পড়ছে তো?
টাইম-কিলার (নভেলেট)
লেখার শুরুতেই শ্রীহার্বাট জর্জ ওয়েলস-কে আমার প্রণাম জানাই। যাকে আপনারা সবাই এইচ. জি. ওয়েলস নামে বেশি চেনেন। ডি. এসসি., ডি. লিট. ইত্যাদি ডিগ্রিওয়ালা মস্ত পণ্ডিত ছিলেন তিনি। কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখে প্রচুর নাম-টাম করেছিলেন। আজও ওঁর লেখার জবাব নেই।
