মাসির বাড়ি আমার আর যাওয়া হয়নি। রাতের অন্ধকারে কোন একটা স্টেশনে যেন আমি নেমে পড়েছিলাম। তারপর হারিয়ে গেছি অন্য জগতে। চিরকালের জন্যে।
ওই পশুটাকে আমি মন-প্রাণ দিয়ে ঘেন্না করি। তেমনি ঘেন্না করি নিজেকেও। শিবনাথ, রমা, বিনোদকেও। কিন্তু আমার শরীরটা ওদের মতো বলে ওদের পছন্দের কাজ আমাকে করতে হয়। আমার মনটা যে পুরোপুরি এখনও ওদের মতো হয়ে ওঠেনি সেটা বেশ বুঝতে পারি।
একটা চাপা গর্জন কানে এল। চমকে উঠে দেখি শিবনাথ আর রমা ফিরে এসেছে। অন্ধকারে ওদের চোখ জ্বলছে।
আর তখনই খেয়াল করলাম, আমার সারা গায়ে বড়-বড় কুৎসিত লোম, আর চোয়ালটাও নেকড়ের মতো লম্বা হয়ে গেছে।
আমি এ-ঘর থেকেই জিতেনের গন্ধ পাচ্ছিলাম—অন্যরকম গন্ধ। সেই গন্ধে পাগল হয়ে বাকি রাতটুকু ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে ছুটোছুটি করে কাটিয়ে দিলাম।
ভোর হতেই টের পেলাম খিদেয় আমার পেট জ্বলছে। তাই ছদ্মবেশ ধরে চলে গেলাম বাড়ির বাইরে।
বৃষ্টি এখন আর নেই। তবে এখানে-ওখানে জল জমে আছে। গাছের পাতায়, ঘাসে, জলের ফোঁটা।
গাছপালার ফাঁক দিয়ে টিলার ওপারে চলে গেলাম। কিছুক্ষণের চেষ্টায় একটা বনবেড়ালকে দেখতে পেলাম। ওটাকে তাড়া করে শেষ পর্যন্ত একটা পাথরের খাঁজে কোণঠাসা করে ফেললাম। বনবেড়ালটা মরিয়া হয়ে থাবা বাগিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপরে। আমি থাবা দিয়ে সপাটে এক থাপ্পড় কষাতেই ওটা ঘাড় মটকে ছিটকে পড়ল মাটিতে।
ভোরের প্রথম আলোয় খিদে মিটিয়ে নদীতে হাত-মুখ ধুয়ে আমি যখন বাড়ি ফিরে এলাম, জিতেন তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করছে।
আমাকে দেখেই ও জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার, মর্নিংওয়াকে গিয়েছিলেন বুঝি?’
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘হ্যাঁ।’
‘কাল আমাকে নিয়ে যাবেন?’
আমি ঘাড় নাড়লাম।
জিতেন গলা বাড়িয়ে থুথু ফেলল ঘাসের ওপর। তারপর বলল, ‘সাড়ে ছ’টায় আমাকে ডাকবেন বলেছিলেন—দেখুন, তার আগেই আমি উঠে পড়েছি।’
খিদের চোটে ব্যাপারটা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। চমকে হাতঘড়ি দেখলাম: সবে সাড়ে ছ’টা বাজে।
জিতেন আড়চোখে আমার বুকের দিকে দেখছিল। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল।
আমি বললাম, ‘আপনার চা-বিস্কুট নিয়ে আসছি—।’
‘হ্যাঁ, চা-টা খেয়েই ফোন করতে বেরোব। তারপর এসে ওয়্যারিংগুলো চেক করতে শুরু করব।’ একটু থেমে আমাকে দেখে নিয়ে: ‘আপনি আমার সঙ্গে থেকে হেল্প করবেন কিন্তু—।’
আমি ওর গন্ধ পাচ্ছিলাম। শরীরটা কেমন অবশ লাগছিল। ছদ্মবেশ ধরে থাকতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল।
ওর কথার উত্তরে ছোট্ট করে বললাম, ‘হ্যাঁ।’
তারপর ওকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়লাম বাড়ির ভেতরে।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখি ‘মা’ উনুনে চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছে। জিগ্যেস করে জানলাম ‘বাপি’ আর ‘ভাই’ এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।
সারাটা দিন আমার জিতেনের সঙ্গে কাটল।
ও প্রত্যেকটা ঘরের ওয়্যারিং টেস্ট করে দেখছিল, আর আমি পাশে-পাশে থেকে ওকে সাহায্য করছিলাম।
ভাঁড়ার ঘরের ওয়্যারিং টেস্ট করতে-করতে জিতেন বলল, ‘ম্যাডাম, আপনাদের ওয়্যারিং-এর আর কিছু নেই। তারের রবারগুলো একেবারে নরম হয়ে গেছে। সব চেঞ্জ করে দিলে ভালো হয়—।’
আমি বললাম, ‘আমার নাম ম্যাডাম নয়—রিনি। তা ছাড়া আমি আপনার চেয়ে বেশ ছোট।’
‘দশ ঘণ্টার আলাপে নাম ধরে ডাকব?’ হাসল জিতেন: ‘তাতে আর কেউ কিছু মনে করতে পারে…।’
‘আমার বাপি-মা খুব ভালো। ওরা কিচ্ছু মনে করবে না।’
জিতেন একটা টুলের ওপরে দাঁড়িয়ে ওয়্যারিং দেখছিল। হঠাৎই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাদের বাড়িটা বেশ পুরোনো—বোধহয় ব্রিটিশ আমলের। কিন্তু তোমরা বেশ মডার্ন— মানে, ডাইনিং-টেবিল, টিভি এইসব আর কী।’ একটু চুপ করে থেকে তারপর: ‘তোমরা এ-বাড়িতে ক’বছর আছ?’
আমি ভয় পেলাম। কী করে বলব, একটা পড়ে-থাকা-বাড়ি আমরা জবরদস্তি করে দখল করেছি। আমাদের কথাবার্তা, চালচলন যে এই বাড়ির চেহারার সঙ্গে খাপ খায় না সেটা ও এই অল্প সময়েই টের পেয়েছে। ভাগ্যিস রমা, বিনোদ, শিবনাথরা এখন আশেপাশে নেই! থাকলে হয়তো বলত, ‘দেরি করে কোনও লাভ নেই। আজ রাতেই…’
আমি কোনওরকমে একটা গল্প বানিয়ে ওকে বললাম। আমার ‘বাপি’র এক জ্যাঠামশাই বছরচারেক আগে মারা যান। তিনি বিয়ে-থা করেননি। তাই এই বাড়ি, বাগান, আর ছ’বিঘে ধান জমি ‘বাপিকে’ দিয়ে গেছেন। ‘বাপি’ রিটায়ার করার পর আমরা কলকাতা ছেড়ে এখানে চলে এসেছি।
জিতেন হঠাৎই টুলটার ওপরে বসে পড়ল, বলল, ‘রিনি, একটানা কাজ করতে ভালো লাগছে না। এসো, দু-মিনিট গল্প করি।’
জিতেন ওর নানা কথা বলছিল। আমি স্বপ্ন দেখার মতো ওকে দেখছিলাম, ওর কথা স্বপ্নের ভেতর দিয়ে শুনছিলাম।
কলকাতায় গড়িয়াতে ওর বাড়ি। বাড়ি মানে ভাড়া করা একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই। সেখানে ওর বুড়ি মা আছে, আর আছে ছোট দু-বোন—ঝুমপা আর টুমপা। ওর বড়দা কেশব ভালো চাকরি করত। কিন্তু বছরদশেক আগে ম্যালেরিয়ায় মারা গেছে! বাবা রিটায়ার করার পর হার্টের অসুখে মারা যান। মাত্র একবছরের মধ্যে দুজনেই চলে গেছে। তারপর থেকে জিতেন একা সংসারের হাল ধরেছে। ছোট্ট একটা ইলেকট্রিকের দোকান আছে ওর। সেটাকে আঁকড়ে ধরেই অভাবের সঙ্গে ওর লড়াই। ওর খুব সাধ ভালো ঘরে দু-বোনের বিয়ে দেবে। তারপর ও নিজের বিয়ের কথা ভাববে—যদি অবশ্য তখনও ওর বিয়ের বয়েস থাকে।
