‘বাপি’ জিতেনকে বলল, ‘লজ্জা করে খেয়ো না। ঘরের ছেলের মতো চেয়ে-চেয়ে খাও।’
আমি বললাম, ‘বাপি, আমাদের বাড়ির ওয়্যারিংগুলো তো একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। জিতেনবাবুকে যখন হাতে পেয়েছি তখন ওগুলো পালটে ঠিকঠাক করে নিলেই তো হয়।’
‘মা’, ‘বাপি’, আর ‘ভাই’ সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকাল। ইলেকট্রিকের ওয়্যারিং বদলানোর নাম করে আমি কি জিতেনকে বেশ কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে চাইছি?
শিবনাথ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপর গম্ভীর গলায় বলল, ‘তা ঠিকঠাক করে নিলেই হয়। কিন্তু ওর কি সময় হবে?…ব্যস্ত মানুষ, কাজের মানুষ…কাল ভোরেই চলে যাবে বলছে…।’
আমি উজ্জ্বল চোখে জিতেনের দিকে তাকালাম।
লাজুক ছেলেটা আমার দিকে আড়চোখে দেখল, তারপর বলল, ‘না, না—ব্যস্ত আর কীসে—এটাই তো আমার কাজ। তা হলে কাল সকালে বাড়িতে একটা এস. টি. ডি. করে দেব। তারপর গোটা বাড়ির ওয়্যারিংগুলো একবার ভালো করে টেস্ট করে নেব। যদি কেউ সঙ্গে থেকে একটু দেখিয়ে-টেখিয়ে দেয়…’ আমার দিকে আবার তাকাল জিতেন। তারপর: ‘তারপর একটা এস্টিমেট দিয়ে কাজ শুরু করে দেব।’
জিতেনের তাকানোর ব্যাপারটা ওরা তিনজনেই খেয়াল করেছিল। ‘মা’ তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘কোনও চিন্তা নেই। রিনিই তোমাকে সব দেখিয়ে দেবে। ও এসব একটু-আধটু বোঝে—ফিউজ হয়ে গেলে ও-ই ফিউজ তার পালটে ঠিক করে দেয়—।’
জিতেন আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমিও অপ্রস্তুত হাসলাম।
খাওয়া-দাওয়া সেরে জিতেন নিজের ঘরে শুতে চলে গেল। আমি ওকে খানিকটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ভোর সাড়ে ছ’টায় চায়ের কাপ নিয়ে গিয়ে আমি আপনার ঘুম ভাঙাব। সাড়ে ছ’টায় ঘুম থেকে ওঠেন তো?’
ও অদ্ভুতভাবে হাসল, বলল, ‘এমনিতে উঠি না—তবে আপনি ডাকলেই উঠে পড়ব।’
যখন আবার খাওয়ার ঘরে ফিরে এলাম তখন ‘মা’ টেবিল পরিষ্কার করে গুছিয়ে ফেলেছে, ‘বাপি’ খড়কে দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে, আর ‘ভাই’ মুখ গোঁজ করে বসে আছে।
আমাকে দেখেই ‘ভাই’—মানে, রমা—একেবারে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উঠল: ‘ভেবেছিস ওকে একা খাবি? সেটা কিছুতেই হতে দিচ্ছি না।’
‘আমার ওকে খাওয়ার কোনও ইচ্ছে নেই।’
‘তা হলে তোমার মতলবটা কী? ওকে এরকম আগলে-আগলে রাখছ কেন?’ প্রশ্নটা করেছে শিবনাথ। ওর খিদে রমার চেয়ে কিছু কম নয়।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমি বললাম, ‘জিতেনকে তোমরা যা করার কোরো। তার আগে আমি শুধু একবার ওকে চেখে দেখতে চাই…।’
‘তার মানে?’ ‘মা’ বিনোদ অবাক হয়ে জানতে চাইল।
আমি হেসে বললাম, ‘ওর গায়ে আমি অন্যরকম একটা গন্ধ পেয়েছি। আমার পুরোনো সব কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ওর সঙ্গে খুব ইয়ে করতে ইচ্ছে করছে।’
রমা একইরকম দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল, ‘মানুষের সঙ্গে আমাদের আবার ইয়ে কী! এমন ইচ্ছে তো আমাদের কখনও হয় না! আসলে তুই ওকে একা খাওয়ার প্ল্যান করেছিস—।’
কথা বলার সময় রমার চোয়াল লম্বা হয়ে যাচ্ছিল, হাত-পায়ের নখ বেরিয়ে আসছিল, শরীর লোমশ হয়ে উঠেছিল।
আমি শান্তভাবে বললাম, ‘আমার ওসব কোনও প্ল্যান নেই। জিতেন আমাকে পুরোনো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। আমি ওকে একবার চেখে দেখতে চাই….’
আমার গলায় এমন কিছু একটা ছিল যে, ওরা তিনজন চুপ করে গেল।
একটু পরে ‘মা’ রমাকে বলল, ‘তুই আর-একটু চিকেন কারি খাবি? এখনও অনেকটা আছে—।’
রমা একই ভঙ্গিতে বলল, ‘চিকেন কারি না—আমি জিতেন কারি খাব।’
এ-কথা শুনে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম বাইরে।
মাঝরাত থেকেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছিল।
এমনিতেই রাতে আমাদের ভালো করে ঘুম আসে না, তার ওপর বৃষ্টি আর জিতেন আমাদের জাগিয়ে রাখল।
একসময় জানলার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। তখনই গাছপালা আর বৃষ্টির আড়াল ভেদ করে শিবনাথ আর রমাকে দেখতে পেলাম। ওরা বোধহয় শিকার ধরতে বেরোচ্ছে।
অন্ধকারে আমাদের দেখতে অসুবিধে হয় না। তাই ওরাও আমাকে দেখতে পেল। চাপা গর্জন করে শিবনাথ একবার আমাকে ডাকল। আমি সাড়া দিলাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে জিতেনের কথা ভাবতে লাগলাম। ওর জন্যে কেন যে এমন অদ্ভুত টান টের পাচ্ছি কে জানে! আমি জানি এটা ভালোবাসা নয়। কারণ, আমাদের মধ্যে ভালোবাসা, মমতা, ঈর্ষা—এইসব মানবিক বোধ নেই। এককালে যে ছিল সেটাই কোন যুগে ভুলে গেছি।
চোখের সামনে বৃষ্টি নিয়ে নিজেকে ঘৃণা করতে চাইলাম। যদি আমি জিতেনের মতো সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতাম তা হলে কত ভালো হত! কিন্তু বহুবছর আগে রাতের ট্রেনে আমি পালটে গিয়েছিলাম মানুষ থেকে অমানুষে।
কলকাতা থেকে পুরুলিয়ায় মাসির বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছিলাম। রাত বারোটার পরই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এসেছিল—বাঙ্কে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
মাঝরাতে হঠাৎই একটা অদ্ভুত যন্ত্রণায় ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ খুলতেই সামনে একরাশ অন্ধকার।
ট্রেন মাতালের মতো ছুটছে। চাকায় শব্দ উঠছে ঝমাঝম।
তখনই খেয়াল করলাম, অন্ধকারের মধ্যে দুটো আলোর বিন্দু—ক্ষুধার্ত, হিংস্র, পাশবিক।
চিৎকার করতে গিয়ে আমি চিৎকার করতে পারিনি। কোনওরকমে সামনে হাত বাড়িয়েছিলাম। আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, আমি ছুঁয়ে ফেলেছিলাম লোমশ এক শরীর।
পরক্ষণেই সব ঝাপসা হয়ে এসেছিল। আলোর বিন্দু দুটো সরে গিয়েছিল চোখের সামনে থেকে।
একটু পরেই আমার চেতনা ফিরে এসেছিল। কিন্তু এ কোন নতুন চেতনা—যা মানুষের চেতনার থেকে শতযোজন দূরের!
