শেষ পর্যন্ত ওঁরা আড়ালে শুধু চোখের জল ফেলেছেন।
আলোক বড় হয়ে উঠছিল আর চারপাশের উচ্ছৃঙ্খলতার সঙ্গে দিব্যি নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিল।
ওকে ব্যবসা করার জন্য টাকা দিয়েছিলেন বিশ্বনাথ। সে-টাকা নষ্ট হলেও কোনও প্রশ্ন করেননি ছেলেকে—কোনও জবাবদিহি চাননি। শুধু রেণুকণার কাছে আড়ালে আক্ষেপ করেছেন।
আলোক ওর ইচ্ছেমতো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আউটিং-এ গেছে। সারা রাত ধরে নাইটক্লাবে গিয়ে হুল্লোড় করেছে। কিংবা বাড়িতে ইয়ার দোস্তদের ডেকে রঙ্গিলা পার্টির আয়োজন করেছে।
একইসঙ্গে আলোকের পোশাক-আশাক, চুলের ছাঁট ইত্যাদি পালটে গিয়েছিল।
কখনও লম্বা-লম্বা চুল, এক কানে দুল, বুড়ো আঙুলে সোনার আংটি নিয়ে ও হাজির হয়েছে বিশ্বনাথের সামনে। আবার কখনও-বা জুলপি-হীন কদমছাঁট, হাতে রিস্ট ব্যান্ড, গলায় সরু চেন—তার লকেটে কঙ্কালের মাথা। আবার কোনওদিন নাভি পর্যন্ত খোলা থ্রি-কোয়ার্টার হাতা ফিনফিনে কাপড়ের জামা, বুকে নানান রঙের উল্কি, ডানবুকের নিপলে আটকানো সোনার রিং।
এইভাবে ছেলেটা ধীরে-ধীরে অচেনা হয়ে যাচ্ছিল বিশ্বনাথের কাছে। আলোক থেকে স্রেফ লোক হয়ে যাচ্ছিল।
জীবনের শেষ ক’টা বছর রেণুকণার বেশ কষ্টে কেটেছিল। চাপা গলায় আপনমনে প্রায়ই বলতেন, ‘আমাদের সেই আগের সময়টাই ছিল ভালো— যখন আর কেউ ছিল না…শুধু তুমি আর আমি…।’
কথাটা বলতে গিয়ে রেণুকণার গলা ধরে যেত। তিনি সবসময় বিশ্বনাথকে যেমন ছেলের কাছ থেকে আড়াল করতেন, একইসঙ্গে নিজেও ছেলের জীবন থেকে সরে থাকতে চাইতেন। গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকের মতো ওঁরা আলোকের জীবনযাপন দূর থেকে দেখতেন।
আলোক একটা ওষুধকোম্পানিতে প্রথম চাকরি নিয়েছিল। তারপর অত্যন্ত কম সময়ে উঠে গেল ওপরদিকে। হঠাৎ একদিন ও একটা এসি প্রিমিয়াম গাড়ি কিনে ফেলল—গাড়িটার রং তেল চকচকে কালো—ছ’টা দরজা। আর তার সপ্তাহদুয়েক পরেই একটা সুন্দরী মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এল। রেণুকণাকে ডেকে বলল, ‘মাম, এ হল পারমিতা। আজ থেকে আমার সঙ্গে থাকবে—।’
ঘটনাটা রেণুকণাকে নতুন করে তেমন ধাক্কা দেয়নি। আধুনিক টিভি প্রোগ্রামের দৌলতে সবাই জানে যে, শাঁখা-সিঁদুর-বিয়ে বহুবছর ধরে মাথায় উঠেছে। এখন শুধু থাকাথাকির যুগ। যতদিন পোষায় একসঙ্গে থাকো। তারপর ইচ্ছে হলে একা চলে যাও।
কিন্তু বিশ্বনাথ বা রেণুকণা ব্যাপারটাকে ‘বিয়ে’ বলেই ভেবেছেন। পারমিতা আজও বিশ্বনাথের চোখে আলোর ‘স্ত্রী’।
আলোকের বিয়ের—অথবা, ওইরকম কিছুর—বছরখানেক পর রেণুকণা চলে গেলেন। চলে যাওয়ার সময় নিজে যেমন কষ্ট পাননি, তেমনিই কাউকে কষ্ট দেননি। রাতে ঘুমিয়েছিলেন। সকালে সেই ঘুম আর ভাঙল না। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, সিভিয়ার সেরিব্রাল অ্যাটাক। হাই ব্লাড প্রেশারের সমস্যা ছিলই—সম্ভবত সেটাই ঘুমের মধ্যে লাগামছাড়া হয়ে গেছে।
রেণুকণা চলে যাওয়ার জন্য তৈরি ছিলেন না—তাই কিছুই গুছিয়ে যেতে পারেননি। বিশ্বনাথকে আচমকা ফাঁকা মাঠে একা দাঁড় করিয়ে চলে গেলেন। ঢেউয়ের দাপটে লাট খাওয়া মানুষের মতো বিশ্বনাথের সব ওলটপালট হয়ে গেল। তিনি হতবুদ্ধি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন।
তার পর থেকে পাঁচটি বছরে সবকিছুই কেমন বদলে গেল।
ফ্ল্যাটের সবচেয়ে ছোট ঘরটায় বিশ্বনাথের ঠাঁই হল। সরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ড্রাগ রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ থেকে সিনিয়ার সুপারিটেন্ডেন্ট হিসেবে রিটায়ার করলেন এবং ছোটবেলার মতো বেকার হয়ে গেলেন।
টিভি দেখে, রেণুকণার কথা ভেবে, আর বই পড়ে সময় কাটাতে লাগলেন বিশ্বনাথ। লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা কমিয়ে দিলেন। চারপাশের জীবন থেকে ধীরে-ধীরে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলেন। সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে তিনি যেন কোনও চরম মুহূর্তের অপেক্ষায় রইলেন। একটা অপ্রয়োজনীয় জীবনকে বয়ে বেড়ানোর ক্লান্তি আর গ্লানি বিশ্বনাথকে কুরে-কুরে খেতে লাগল।
সামনে রাখা থালার দিকে হাত বাড়ালেন। একটুকরো রুটি ছিঁড়ে নিয়ে সেটা দিয়ে খানিকটা বেগুনপোড়া মুড়ে নিলেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘দ্যাখো রেণু, কপালপোড়া দিয়ে রুটি খাচ্ছি—।’
গ্রাসটা মুখে পুরে দিলেন। একইসঙ্গে চোখ ফেটে জল এল। খাবারটা চিবিয়ে ঢোঁক গিলতে কষ্ট হল।
রেণুকণা ওঁর বুকের ভেতর থেকে বকুনি লাগালেন: ‘কী ছেলেমানুষের মতো করছ! কী খেলে সেটা বড় কথা নয়—শরীর রাখাটাই বড় কথা। ভুলে যাও কেন, তোমার বয়েস হয়েছে? নাও, খেয়ে নাও…কেঁদো না, লক্ষ্মীটি…।’
গলা ব্যথা করলেও খাওয়া শেষ করলেন বিশ্বনাথ। অনেকটা জল খেয়ে গলা সাফ করে তবেই ঠিকঠাক শ্বাস নিতে পারলেন আবার। পারমিতার ছকে দেওয়া নিয়ম মতো এঁটো থালা আর গ্লাসটা টয়লেটের কাছে ওয়াশবেসিনের নীচে রেখে দিলেন। তারপর বেসিনে হাত-মুখ ধুচ্ছেন, হঠাৎই একটা চাপা গরগর শব্দ শুনে বেসিনের সামনে আয়নার দিকে তাকালেন।
আলোকদের বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ভিক্টর।
লোমে ঢাকা ভারী শরীর। গলার কাছটায় লোমগুলো এত ঘন যে, গলার বেলটটা লোমে ডুবে গেছে। দুটো হলদে চোখ কী তীব্র! কপাল থেকে ছাই রং নেমে এলেও পরে সেটা গাঢ় হয়ে ছুঁচলো মুখের কাছে কালো হয়ে গেছে। চোয়াল দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। নাকের ডগাটা কুঁচকে ওপরের পাটির কয়েকটা দাঁত বের করে রেখেছে বলে হিংস্র আর ভয়ংকর লাগছে।
