‘সে পরে দেখা যাবে’খন।’
আমি জিতেনের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ও কি আমার ফেরোমোনের গন্ধ পাচ্ছে? আমি কিন্তু অন্যরকম একটা গন্ধ পাচ্ছি।
আমি জিতেনকে দেখছিলাম।
ছিপছিপে ফরসা চেহারা। তবে পাতলা হাওয়াই শার্টের নীচে শক্তিশালী পেশি টের পাওয়া যায়। গাল সামান্য ভাঙা। একমাথা ঝাঁকড়া চুল। চোখ টানা-টানা। সারাটা মুখে কেমন এক মমতা মাখানো।
আমি অদ্ভুত এক আকর্ষণ টের পাচ্ছিলাম। অথচ আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, শিবনাথ আর রমার ঠোঁটের কোণে লালা গড়াচ্ছে।
আমি তাড়াতাড়ি জিতেনকে নিয়ে ভেতরে চলে যেতে চাইলাম। ওরা কি আজ রাতেই ওকে শেষ করে দেবে?’
‘আমার সঙ্গে আসুন—’ জিতেনকে নরম গলায় ডেকে নিলাম।
ও লাজুক মুখে আমাকে অনুসরণ করল। একবার শুধু বলল, ‘আপনারা খুব ভালো। নইলে অচেনা-অজানা লোককে কে আর থাকতে দেয়…।’
ওর কথায় আমার নবীন সমাজদারের কথা মনে পড়ে গেল।
নবীন সমাজদার স্কুল-মাস্টার ছিল। গত বছর বর্ষার সময় এক দুর্যোগের রাতে আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। সে-ও ঠিক এই কথাই বলেছিল, ‘আপনারা খুব ভালো লোক—’ আর সেই রাতেই আমরা ওকে খতম করেছিলাম।
সাধারণত কোনও শিকারকে খতম করার আগে তাকে ঘিরে আমরা পাগলের মতো নাচি। তখন ভয়ে-আতঙ্কে তার চিৎকার করার মতো অবস্থাও থাকে না। কিন্তু নবীন মাস্টার হঠাৎই এক চিৎকার দিয়ে উঠেছিল। তখন শিবনাথ আর রমা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তারপর সব শেষ।
তার কিছুদিন পরে কী করে যেন নবীন মাস্টারের বউ আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিল। মেয়েটার সে-কী বুকফাটা কান্না! সে-কান্নার মানে আমরা ঠিকমতো বুঝতে পারিনি।
বউটাকে তো কোনওরকমে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরই এল পুলিশ আর ইনসিওরেন্স কোম্পানির লোক। আমাদের নানাভাবে জেরা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারেনি। ডেডবডির কোনওরকম চিহ্ন না-পাওয়াতে ওরা বেশ মুশকিলে পড়ে গিয়েছিল। সন্দেহের হাত থেকে আমরা একটুর জন্যে বেঁচে গিয়েছিলাম। কে জানে, পুলিশ এখনও ব্যাপারটা নিয়ে লেগে রয়েছে কি না!
আজও ঠিক ওই কথাটাই বলল জিতেন, ‘আপনারা খুব ভালো।’
জিতেনকে ওর ঘরে পৌঁছে দিয়ে বসবার ঘরে ফিরে এলাম। সেখানে তখন আমার ‘মা’, ‘বাপি’ আর ‘ভাই’ জিতেনকে নিয়ে আলোচনায় মশগুল।
রমা ওর গোলগাল বাচ্চা-বাচ্চা মুখ নিয়ে একেবারে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। বারবার শুধু বলছে, ‘আমি আর ওয়েট করতে পারছি না…।’
ও যে আর অপেক্ষা করতে পারছে না সেটা ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে । ও কিছুতেই ওর ছদ্মবেশ ধরে রাখতে পারছে না। থেকে-থেকেই ওর চোয়ালটা লম্বা হয়ে সামনে এগিয়ে আসছে, হাত-পায়ের লোম বড়-বড় হয়ে যাচ্ছে, কথাগুলো জড়িয়ে গিয়ে চাপা-জান্তব গর্জন বেরিয়ে আসছে, আর ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা গড়াচ্ছে।
শিবনাথের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। ছদ্মবেশটাকে কোনওরকমে সামলে রেখে ও বলল, ‘রিনি, চেয়ার-টেবিলগুলো সরিয়ে ঘরটা ফাঁকা করে দাও। তারপর ও এলেই আলোগুলো নিভিয়ে দেবে…।’
তা হলে জিতেন এ-ঘরে আসামাত্রই শুরু হবে আমাদের কাজ। কিছুতেই কি আর দু-চারটে দিন আমরা অপেক্ষা করতে পারি না? জিতেনকে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। ওর চেহারায় এমন নিষ্পাপ একটা ব্যাপার আছে যে, আমার সেই বালিকা বয়েসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সুবীরদার কথা মনে পড়ছে। ওকে দেখলেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠত। সুবীরদা আমেরিকায় পড়াশোনা করতে চলে গেছে। কত বছর আগের কথা, তবুও মনে হয় এই তো সেদিন! বিদেশ যাওয়ার আগে একদিন আমি সুবীরদার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। সেদিন লোডশেডিং ছিল, বাড়িতে আর কাউকে চোখে পড়েনি। সুবীরদা কখনও আমাকে আশাকারা দেয়নি, কিন্তু আমার কী যে হয়েছিল। সেইদিন সুবীরদা আমাকে নিয়ে যা-খুশি করতে পারত। আমিও মনে-মনে সেটাই চেয়েছিলাম। কিন্তু সুবীরদা আমাকে বকুনি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, জীবন এত সহজ-সরল নয়।
আমি সেদিন সে-কথার মানে বুঝিনি। পরে, নিজের জীবনটা যখন হাতের বাইরে চলে গেল, অনেক জটিল হয়ে গেল, তখন বোধহয় খানিকটা বুঝতে পেরেছিলাম।
কিন্তু আজ, জিতেনকে দেখার পর থেকে, আমার নিজের কেমন অন্যরকম লাগছে।
আমার ছদ্মবেশটা ঠিকঠাক রেখে সিরিয়াস গলায় ওদের বললাম, ‘আজ রাতেই কিছু করাটা ঠিক হবে না। নবীন সমাজদারের ব্যাপারটা কি তোমরা এত সহজে ভুলে গেলে! পুলিশ হয়তো কেসটা নিয়ে এখনও লেগে আছে। কে জানে, জিতেনকে ওরা টোপ হিসেবে এখানে পাঠিয়েছে কি না !’
‘তা হলে তোমার কী মত?’ বিনোদ জানতে চাইল।
‘আমার ইচ্ছে দু-চারদিন অপেক্ষা করা—।’
শিবনাথ ওর ছদ্মবেশের ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, ‘দু-চারদিন কেন, একটা দিন ওয়েট করলেই তো হয়!’
সমর্থনের আশায় ও বাকি দুজনের দিকে তাকাল।
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘না! তাড়াহুড়ো করলে চলবে না…।’
এমনসময় পায়ের শব্দ পেলাম।
চমকে ঘুরে তাকিয়ে দেখি জিতেন দাস আসছে। এরই মধ্যে ও স্নান-টান সেরে পরিপাটি। মুখটা এখন আরও বেশি ছেলেমানুষ-ছেলেমানুষ লাগছে।
সুখী পরিবার একজন অতিথিকে যেভাবে অভ্যর্থনা জানায় সেভাবেই আমরা জিতেনকে খাওয়ার টেবিলে সাদরে আমন্ত্রণ জানালাম।
‘মা’ গরম ভাত, মুগের ডাল, মোচার ঘণ্ট আর মুরগির মাংস সাজিয়ে রাখল খাওয়ার টেবিলে। তারপর আমাদের পরিবেশন করতে লাগল। মুরগির ঠ্যাং রমার খুব প্রিয়। মানে, মুরগি হোক আর যা-ই হোক, ঠ্যাং হলেই হল। ও বারবার বায়না করছিল।
