শেষ কবে যে মানুষের স্বাদ পেয়েছি তা প্রায় ভুলেই গেছি। তা ছাড়া গ্রামের একেবারে শেষে মাঠঘাট পেরিয়ে কোনও মানুষ কখনও এই পুরোনো বাড়িটায় আসে!
প্রায় মাসখানেক আগে, ঝাপসাভাবে মনে পড়ছে, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে এসেছিল গুঁড়ো সাবান বিক্রি করতে। তখন সন্ধে হয়-হয়। শিবনাথ বুদ্ধি দিল ওদের চা-জলখাবার দিয়ে আটকে রাখতে। তারপর সন্ধে একটু বাড়তেই আমরা চারজন ওদের দিয়ে জলখাবার সেরে নিলাম। শিবনাথ পাগলের মতো খাচ্ছিল। ওর আবার খিদে একটু বেশি—আর অপেক্ষা করার ধৈর্যও বড় কম।
বাড়িটায় আমরা চারজন আস্তানা গেড়েছি। আমি, শিবনাথ, রমা আর বিনোদ। তার আগে, টিলার ওপাশে, আমি আর শিবনাথ জোড় বেঁধে বেশ ছিলাম। একদিন রাতে, পুকুরে জল খেতে গিয়ে রমা আর বিনোদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে যায়। ওরা দুজন খুশিমতন চেহারা পালটাচ্ছিল আর এ ওর ঘাড় কামড়ে ধরছিল, ফষ্টিনষ্টি করছিল।
আমরা ওদের চিনতে পেরেছিলাম, ওরাও আমাদের চিনতে পেরেছিল। তারপর থেকে আস্তানা খুঁজতে-খুঁজতে শেষে এই খাঁ-খাঁ করে পুরোনো বাড়িটায়। খিদে পেলে খাবার খুঁজতে চলে যাই টিলার ওপাশে, জঙ্গলে—অথবা, নদীর কিনারায় ঝোপঝাড়ের ফাঁকফোকরে।
এমনিতে মানুষ সেজে থাকতে আমাদের খারাপ লাগে না। লোকজনের সঙ্গে একটু-আধটু মিশে, ভাত-ডাল-পাঁউরুটি-বিস্কুট খেয়ে দিন কেটে যায়। কিন্তু মাঝে-মাঝেই ভেতরের লুকোনো জন্তুটা অস্থির হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন পাগলের মতো লাগে। রক্তের নেশাটা ভুলে থাকার জন্যে শিবনাথ তখন আমার ঘাড় কামড়ে আমাকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে। ওই খিদে-তেষ্টার মধ্যেও বেশ টের পাই আমি আসলে রমণী।
এইরকম একটা অবস্থার মধ্যে পড়ে শিবনাথ আজ আবার ওর পুরোনো পথ বেছে নিয়েছে। আমাকে ঘরের কোণে কোণঠাসা করে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরেছে প্রাণপথে। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে বিনোদ তেষ্টার চোখে আমাদের দেখছে। রমা আশেপাশে নেই—বাইরে কোথায় খাবারের খোঁজে বেরিয়েছে।
এমনসময় দরজায় কেউ কড়া নাড়ল, সেইসঙ্গে স্পষ্ট চিৎকার: ‘মাসিমা, মাসিমা!’
রাত প্রায় আটটা বাজে। কে ডাকতে এল এই অসময়ে?
শিবনাথ তাড়াতাড়ি আমাকে ছেড়ে দিয়ে ষাট-পেরোনো মোটাসোটা টাক মাথা এক প্রৌঢ়ের চেহারা নিল। বিনোদ সেজে গেল তার পঞ্চাশ-বাহান্নর গিন্নি। মুখে একগাল হাসি, কপালে বড় সিঁদুরের টিপ, পরনে লালপেড়ে তাঁতের শাড়ি।
আমি হাঁপাতে-হাঁপাতে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। চট করে হয়ে গেলাম বছর কুড়ির সুন্দরী তরুণী, সতেজ ফুলের মতো ফুটফুটে। শিবনাথ আমার এই চেহারাটা বেশি পছন্দ করে। কিন্তু উত্তেজনার সময়, মনের স্বাভাবিক আবেগগুলো যখন স্বাধীন হয়ে পড়ে, তখন আর ছদ্মবেশটা ঠিকঠাক ধরে রাখা যায় না।
ঠিক সেইরকম রমা পেছনের খোলা দরজা দিয়ে লাফিয়ে ভেতরে ঢুকল। ওর গায়ে কেমন একটা আঁশটে গন্ধ।
আমাদের দেখেই ও বুঝতে পারল কী করতে হবে।
বাইরে থেকে আবার ডাক এল ‘মাসিমা, দরজা খুলুন—।’
রমা পালটে গেল। ও হয়ে গেল আমার ছোট ভাই। বয়েস বারো বছর, গোলগাল ফরসা চেহারা—অল্পেতেই অভিমান করে ঠোঁট ফোলায়।
আমরা চারজনে এখন সুখী পরিবার।
বিনোদ এগিয়ে গিয়ে সদর দরজা খুলল।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দুজন যুবক। একজনের হাতে দুটো ভারি ব্যাগ। আর-একজন বোধহয় এই এলাকারই ছেলে। মুখটা চেনা-চেনা।
বিনোদকে দেখে ছেলেটি বেশ আশা নিয়ে বলল, ‘মাসিমা, একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট ছিল। মানে—’ সঙ্গের ব্যাগওয়ালা যুবককে দেখিয়ে সে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘এর নাম জিতেন দাস। চালাবাজারের মাঠে আজ রাত থেকে যাত্রা আছে। এ ইলেকট্রিকের লাইন করতে এসেছিল। ফেরার সময় ইস্টিশানে গিয়ে দেখে কেস জন্ডিস—লাস্ট ট্রেন মিস। তা রাতটা কোথায় এস্টে করাব…আমাদের তো জায়গা-ফায়গা নেই। তার ওপর বৃষ্টি হলেই কেস ক্যাচাল। তো লালটু বলল, আপনাদের বাড়িতে হেভি জায়গা আছে—মানে, রাতে এস্টে করা যায় তাই একে নিয়ে এলাম—শুধু আজকের রাতটা একটু শেলটার দিন। কাল ভোরেই এ চলে যাবে…।’
বিনোদের উত্তর দিতে একটু দেরি হল। কারণ, সব শুনে, আর ওদের শরীরের লোভনীয় গন্ধে ওর কথা বোধহয় জড়িয়ে যেতে চাইছিল।
শিবনাথ তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল দরজার কাছে। গলাখাঁকারি দিয়ে বিনোদকে সামান্য পাশে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘নো প্রবলেম—তুমি শুধু আজ রাতটা কেন, দু-চারদিনও থেকে যেতে পারো আমাদের সঙ্গে।’
বিনোদ সাত-তাড়াতাড়ি সায় দিল ‘স্বামী’-র কথায়: ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমাদের কোনও অসুবিধে হবে না। তুমি অনায়াসে থাকতে পারো। ‘তুমি’ বললাম বলে কিছু মনে করলে না তো!’
অভিনয়ের ব্যাপারে বিনোদ একেবারে জিনিয়াস। ওর শেষ কথাটার আগাপাস্তলায় মাতৃস্নেহ একেবারে উথলে উঠছিল।
সুতরাং ওর ভারী-ভারী ব্যাগসমেত জিতেন দাস ঢুকে পড়ল আমাদের বাড়িতে। ওর সঙ্গী ছেলেটি ‘থ্যাঙ্ক ইউ মাসিমা’ বলে এক কাঁধ বেঁকিয়ে হাঁটা দিল যাত্রার আসরের দিকে।
বিনোদ আমাকে ডেকে বলল, ‘রিনি, জিতেনকে ওর ঘরটা দেখিয়ে দে—’ তারপর জিতেনকে লক্ষ করে বলল, ‘তুমি বাবা হাত-মুখ ধুয়ে নাও। ইচ্ছে হলে স্নানও করতে পারো। আর রাতে আমাদের সঙ্গে দুটি খেয়ে নিয়ো।’
জিতেন বিব্রতভাবে বলল, ‘না, না, মাসিমা, আমি রাতে কিছু খাব না—খেয়ে এসেছি—।’
