সারা সন্ধে ধরে আলোকের ঘরে ওরা হুইহুল্লোড় করল। সাউন্ড সিস্টেমে চড়া আওয়াজে গান বাজিয়ে নাচল। গোটা ফ্ল্যাটে আনন্দ আর খুশির পাগলা হাওয়া উদ্দামভাবে ছুটে বেড়াতে লাগল।
পাশের ঘরে বসে বিশ্বনাথ আর রেণুকণা উৎসবের এই মেজাজটা বেশ ভালোই উপভোগ করছিলেন। কয়েকটা গানের সঙ্গে রেণুকথা গুনগুন করে গলাও মেলাচ্ছিলেন।
বিশ্বনাথের বয়েসটাও পিছিয়ে যাচ্ছিল দ্রুতবেগে। তিনি রেণুর হাত চেপে ধরে একটা গোপন ইশারা করলেন, তারপর হো-হো করে হাসিতে ফেটে পড়লেন।
কিন্তু রাতের খাওয়াদাওয়ার পরেও ওদের হুইহুল্লোড় চলতে লাগল।
বিশ্বনাথের ভুরু কুঁচকে গেলেও ব্যাপারটা অতটা গায়ে মাখেননি। শুধু ঘড়ির কাঁটা দশটা পার হতেই রেণুকণাকে বললেন, ‘দশটা বেজে গেছে…এখনও এরকম শোরগোল হচ্ছে…আশপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন এবার মাইন্ড করতে পারে…।’
রেণু বললেন, ‘তুমি গিয়ে একবার আলোকে বলো না…।’
বিশ্বনাথ বেঁকে বসলেন। রেণুকণাকেই বললেন দায়িত্বটা নিতে। কিন্তু রেণুও গাঁইগুঁই করে বিশ্বনাথের কোর্টে বল পাঠাতে চাইলেন।
এইভাবে বেশ কয়েকবার বল চালাচালির পর বিশ্বনাথ হেরে গেলেন। ব্যাজার মুখে উঠে দাঁড়ালেন। রওনা হলেন আলোকের ঘরের দিকে।
ওর ঘরে যেতে-যেতে মনে-মনে রিহার্সাল দিচ্ছিলেন বিশ্বনাথ। ঠিক কীভাবে কথাটা বলবেন আলোকে? ঘরের বাইরে ইশারায় ডেকে নেবেন? তারপর চাপা গলায় বলবেন, ‘আলো, রাত হয়েছে—এবার বন্ধুদের বাড়ি যেতে বলো।’
নাঃ, এটা একটু শাসনের মতো শোনাচ্ছে। ছেলে বড় হয়েছে। ওর ইগো এতে হার্ট হতে পারে।
তার চেয়ে এরকম করে বললে হয়: ‘আলো, সাউন্ড সিস্টেমের আওয়াজটা একটু আস্তে করে দাও। অন্য ফ্ল্যাটের লোকজন হয়তো ডিসটার্বড হচ্ছে…।’
হ্যাঁ, এটা অনেক বেটার। এ-কথা বলে আলোক মোটেই বিশ্বনাথের ওপরে রাগ করবে না।
সুতরাং রিহার্সাল দেওয়া সংলাপটা একরকম মুখস্থ করে বিশ্বনাথ আলোকের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
ঘরের বাইরের বারান্দার আলোটা নেভানো ছিল। খোলা দরজা দিয়ে ঘরের আলো আর শব্দ চলকে পড়ছে বাইরে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছেলেকে ইশারা করে ডাকার জন্য আলোর এলাকায় মাথাটা বাড়িয়ে দিলেন বিশ্বনাথ। সঙ্গে-সঙ্গে ওঁর ভেতরকার ছন্দ-তাল সব গরমিল হয়ে গেল।
কারণ, যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।
মিউজিক সিস্টেমের ঝংকারের তালে-তালে ছ’টা ছেলেমেয়ে উদ্দামভাবে নাচছে। মেঝেতে ওদের এলোমেলো পা ফেলার ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছিল, পায়ের সঙ্গে মাথার তেমন সুষম যোগযোগ নেই।
আলোককে দুপাশ থেকে ধরে রেখেছে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। ছেলেটি রোগা, লম্বা, থুতনিতে এক চিলতে দাড়ি। আর মেয়েটি মাথায় খাটো, ফরসা মুখের দুপাশে কোঁকড়া চুলের ঢল, চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা, গায়ে লাল রঙের থ্রি-কোয়ার্টার হাতা টপ, পায়ে স্কিন-টাইট জিনস।
আলোককে ওরা ধরে রেখেছে কারণ আলোক ঠিকঠাক অবস্থায় নেই। ও চোখ বুজে জিভটা লম্বা করে বাইরে বের করে রেখেছে। আর ওর জিভের সামনে লকলক করছে ছোট্ট একটা সবুজ সাপ। সাপটাকে আলোকের জিভের কাছাকাছি ধরে রেখেছে কালো মতন কদমছাঁট চুল একটি ছেলে। ছেলেটির চুলের ডানপাশটা সাপটার মতোই সবুজ। আর হাতে চামড়ার দস্তানা।
বেসামাল নাচের তালে-তালে আলোকের জিভ এপাশ-ওপাশ সরে যাচ্ছিল। আর সাপটাও জিভের নিশানা ঠিক রাখতে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ছিল।
বিদ্যুৎ-ঝিলিকের মতো সবুজ হিলহিলে সাপটা আলোকের জিভে ছোবল মারল।
ছোবল এসে পড়ল বিশ্বনাথের বুকেও। যন্ত্রণায় বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। ভেজা কাপড় নিংড়ানোর মতো ওঁর হৃৎপিণ্ডটা অমানুষিক শক্তিতে মোচড় দিচ্ছিল কেউ, আর টপটপ করে রক্ত ঝরছিল।
পৃথিবীর যত বয়েস বাড়ছে ততই সে আধুনিক হয়ে উঠছে। পৃথিবীর বয়েস আসলে যেন কমছে। কিন্তু বিশ্বনাথের বুকের ভেতরটা হুহু করছিল।
একটু-আধটু নেশা করা হয়তো দোষের নয়। কিন্তু তাই বলে সাপের ছোবল!
ছোবলটা জিভে পড়ার পরই পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল আলোক। ওর শরীরটা বেপরোয়াভাবে ছটফট করতে লাগল। ব্যাপারটা যন্ত্রণার না আনন্দের সেটা আলোকের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে বুঝতে চাইলেন বিশ্বনাথ। কিন্তু পারলেন না।
শুধু দেখলেন, আলোকের দুপাশের ছেলেটা আর মেয়েটা শক্ত করে আলোককে চেপে ধরে আছে। আর আলোকের ঠোঁটের কোণ থেকে লালা ঝরছে। একটা তৃপ্তির গোঙানিও যেন শোনা যাচ্ছে ওর মুখ থেকে।
ভাঙা বুক নিয়ে সরে এসেছিলেন বিশ্বনাথ। অন্ধকার বারান্দায় শুরু হয়ে গিয়েছিল ওঁর নতুন রিহার্সাল। রেণুকণাকে গিয়ে এখন কী বলবেন? বলবেন সাপের ছোবলের কথা? রেণুকণার সমস্ত আনন্দ আর সুখ শেষ করে দেবেন এক ছোবলে?
না, বিশ্বনাথ সেটা পারেননি। ফিরে এসে মিথ্যে কথা বলেছিলেন স্ত্রীকে: ‘আলো বলল, একটু পরেই ওরা চলে যাবে…।’
শাক দিয়ে মাছ ঢাকার সেই শুরু।
রেণুকণা বিশ্বনাথের কাছ থেকে আলোককে আড়াল করেছেন। আর বিশ্বনাথ পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে আলোর কালো দিকগুলো লুকিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।
এইভাবে দুজনে গোপনে সাপের ছোবল খেয়ে চলেছেন বরাবর।
সময় বদলে যাচ্ছিল, আর তার সঙ্গে-সঙ্গে আলোকও। কিন্তু বিশ্বনাথ আর রেণুকণা নিজেদের বদলে ফেলতে পারছিলেন না মোটেই। যখনই ওরা শক্ত হয়ে কোনও একটা রুক্ষ সিদ্ধান্তের কথা ভাবছিলেন, তখনই ম্যাজিকের মতো ছোট্টবেলার আলোক হাসিমুখে আধো-আধো কথা নিয়ে ওঁদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল। আর সেই স্নেহের তাপে বরফের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গলে জল হয়ে যাচ্ছিল ধীরে-ধীরে।
