ইলা প্রথম ভয়টাকে এতক্ষণে অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। ও নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ল, বলল, হ্যাঁ অমিত, সত্যি।
এবার তা হলে সমস্যাপূর্ণ আসল চ্যাপ্টারটা তোমাকে আমি খুলে বলতে চাই। প্রাণকান্ত আমাকে ব্ল্যাকমেল করছে। সামনের শুক্রবার রাত ন’টায় ও আসবে প্রথম কিস্তির দু-হাজার টাকা নিতে। মনে রেখো, প্রথম কিস্তি। তারপর ব্যাপারটা চলবে—চলতেই থাকবে। একদিকে আমার সম্মান, সামাজিক মর্যাদা, আর অন্যদিকে টাকা, শুধু টাকা। জানি না, এভাবে কতদিন ওর মুখ আমি বন্ধ রাখতে পারব। আর এইরকম চলতে-চলতে আমরা হব রাস্তার ভিখিরি। শুধু আমার বইয়ের রয়্যালটির টাকায় কোনওরকমে দিন চলবে। কারণ ‘চলাচল’-এর চাকরি বজায় রাখা আমার পক্ষে আর সম্ভব হবে না—শুধু ওই প্রাণকান্তর জন্যে।
ওকে খুন করলে কেমন হয়?
এবার চমকানোর পালা আমার। বোবা বিস্ময়ে ইলার নিটোল নিষ্পাপ মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। ও বলে কী! তা হলে আমাদের মানসিক বোঝাপড়া কি এতই নিখুঁত? প্রাণকান্তকে খুন করার কথা মনে-মনে চিন্তা করলেও, সে সর্বনাশা-চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস বা শক্তি কোনওটাই আমার নেই। কিন্তু এখন ইলার প্রস্তাব পেয়ে উল্লাসের শিহরণ বয়ে গেল আমার শরীরের শিরা-উপশিরায়। কিন্তু মনের ভাব মনেই লুকিয়ে রেখে মুখে বললাম, খুন? মানে, সেটা কি ঠিক হবে?
কেন হবে না?–ইলার সপ্রতিভ স্বর ঝাঁঝিয়ে উঠল, ওই লোকটা আমার লাইফের সব আনন্দ, সুখ কেড়ে নিয়েছিল। আজ থেকে সাত বছর আগে একটা ইমোশনাল ঝোঁকে বাড়ির সকলের কথা না শুনে আমি ওকে বিয়ে করি। কিন্তু প্রাণকান্তর অবস্থা ছিল ভীষণ গরিব। তাই বেশিদিন আমরা সুখে থাকতে পারিনি। তার ওপর ওর স্বভাব-চরিত্র ক্রমশই গড়িয়ে চলেছিল নীচের দিকে। বিয়ের ক’মাস পরেই আমাকে ছেড়ে ও বেপাত্তা হয়ে যায়। তখন আমি দিশেহারা হয়ে পড়লাম। তারপর…তারপর একদিন বহু পুরুষের পর এলে তুমি। কেন জানি না, এবারের পরিচয়টাকে আমি হালকাভাবে নিতে পারিনি। পরের ঘটনা তো তুমি সব জানো। আজ এতদিন পর প্রাণকান্ত আমার অবস্থার সুযোগ নিতে এসেছে। তাই বলছি অমিত, ওই লোকটাকে খুন করার মধ্যে কোনও পাপ নেই, কোনও অন্যায় নেই।
ইলার শেষ কথাগুলোর রেশ আমার কানের পরদায় ঘুরে-ফিরে বাজতে লাগল: কোনও পাপ নেই, কোনও অন্যায় নেই।
ইলা, তা হলে একটা প্রশ্নের আমি সোজাসুজি উত্তর চাই।—নিষ্পলকে ইলার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলাম, আমাদের এই বিবাহিত জীবনে তুমি কী অসুখী?
এই আচমকা প্রশ্নে ইলা বেশ অবাক হয়ে গেল। আমার কথার জবাব না দিয়ে ও পালটা প্রশ্ন করল, কেন, হঠাৎ এ-কথা জিগ্যেস করছ কেন?
কারণ আছে, ইলা। আমি জানতে চাই তোমার কাছে কার দাম বেশি? আমার, না প্রাণকান্তর?
প্রাণকান্তকে আমি ঘৃণা করি।—দাঁতের ফাঁক দিয়ে হিসহিস করে কুটিল স্বরে জবাব দিল ইলা।
আমার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ইলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঝুঁকে পড়ে চুমু খেলাম ওর কোমল গালে। মৃদু স্বরে কানে-কানে বললাম, প্রাণকান্ত সমাদ্দারকে আমিও ঘৃণা করি।
প্রাণকান্তর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই ভীষণভাবে মাথা ঘামাতে শুরু করলাম। ইলার হাবভাবে কোনও পরিবর্তন দেখতে পাই না, কিন্তু জানি, ও চুপচাপ বসে নেই। প্রাণকান্তকে খতম করার ব্যাপারটা নিয়ে ইলাও যথাসাধ্য ভাবছে।
আমি কী অফিসে, কী বাড়িতে, সবসময়েই বিদেশি গোয়েন্দা গল্পের বই নিয়ে পড়ে থাকি। ভাবতে থাকি প্রাণকান্তকে খুন করার সহজ অথচ নিখুঁত উপায়। সবার আগে আমাকে ঠিক করতে হবে সমাদ্দারের মৃত্যুটাকে পুলিশের কাছে কীভাবে উপস্থিত করব। অ্যাক্সিডেন্ট? সুইসাইড? না স্বাভাবিক মৃত্যু? বেশ কিছুক্ষণ চিন্তার পর শেষ সম্ভাবনাটা মন থেকে মুছে ফেললাম। কারণ, এ পৃথিবীর কোনও লোকই পরের ফ্ল্যাটে এসে স্বাভাবিক উপায়ে মারা যায় না। সুতরাং হাতে রইল দুই। অর্থাৎ, হয় অ্যাক্সিডেন্ট না হয় সুইসাইড। আপনারা হয়তো হাসছেন দ্বিতীয় সম্ভাবনাটার কথা ভেবে। তা হাসারই কথা। এমন কোনও সুস্থমস্তিষ্ক মানুষ কি আছে, যে পরের ফ্ল্যাটে এসে আত্মহত্যা করে? অতএব, শেষ সম্ভাবনাটা মনে আঁকড়ে প্রস্তুতিপর্বের কথা ভাবতে শুরু করলাম।
হঠাৎই মনে পড়ল একটা বিদেশি ছবির কথা। জানি না ছবিটা আপনারা দেখেছেন কি না, তবে আমি আর ইলা দুজনেই দেখেছি। সেটা আলফ্রেড হিচককের বিখ্যাত ছবি ‘ডায়াল এম ফর মার্ডার’। তাতে এক বিশিষ্ট ব্যক্তির ঘরে একটি অপরিচিত লোকের মৃতদেহ পাওয়া যায়। সেই মৃত লোকটির পকেটে পুলিশ একটি মারাত্মক সূত্র পায়: একটা চাবি। যে-ঘরে লোকটি মারা যায় সেই ঘরের চাবি। তখন পুলিশ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে গৃহস্বামীকে গ্রেপ্তার করে। কারণ, ওই চাবিটি ছিল ওঁরই। তিনিই ওটা মৃত লোকটিকে দিয়েছিলেন ঘরে ঢোকার জন্যে।
ওই ছবির গল্পটাকে কাজে লাগালে কেমন হয়? অবশ্য গল্পের শেষটা হবে একটু অন্যরকম। মৃত প্রাণকান্ত সমাদ্দারের পকেটে যে-চাবিটা পাওয়া যাবে, তা আমাদের ফ্ল্যাটের হলেও আমার বা ইলার চাবি নয়। সেটা হবে সম্পূর্ণ নতুন একটা তৃতীয় নকল চাবি—চাবিওয়ালার হাতে তৈরি।
পরিকল্পনাটা যতই ভাবতে লাগলাম, ততই ওটা স্পষ্ট চেহারা নিতে লাগল। তাই বৃহস্পতিবার রাতে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ার পর পাশে শুয়ে থাকা তন্দ্রাচ্ছন্ন ইলাকে ডাকলাম, ইলা, ইলা?
