উঁঃ।—পাশ না ফিরেই ও অস্ফুটে জবাব দিল।
সমাদ্দারের ব্যাপারটা আমার ভাবা হয়ে গেছে।
এবারে ইলা পাশ ফিরল। মাথার কাছে জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা মরা চাঁদের আবছা আলোয় ওর চোখদুটো দেখতে পেলাম। সে-চোখে নীরব প্রশ্ন।
দ্যাখো, ব্যাপারটা হবে ঠিক এইরকম।—হাত নেড়ে ইলাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম। আগামীকাল প্রাণকান্ত এলে ওকে ওর পাওনা দু-হাজার টাকা আমি দিয়ে দেব। তারপর ও স্বাভাবিকভাবেই আরও টাকা চাইবে। তখন ওকে বলব আগামী সপ্তাহে বুধবার আসতে। বুধবার আসতে বলার একটা কারণ আছে। তা হল, ওই দিন থেকে অফিসে আমার রুমে যে অন্য আর-একটা ছোকরা কাজ করে, সে সোমবার পর্যন্ত ছুটি নিচ্ছে। পুরো ব্যাপারটা খুলে বললেই সব বুঝতে পারবে। যা হোক, প্রাণকান্ত কাল টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার পর আমি আমার কাজ শুরু করব। প্রথমে বাথরুম থেকে সাবানটা নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা থেকে চাবির ফুটোর ছাপ নেব। তারপর সেই সাবান নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অচেনা এক চাবিওয়ালার কাছ থেকে দরজার একটা নকল চাবি তৈরি করব। চাবি তৈরি হয়ে গেলে সোমবার সকালে থানায় গিয়ে আমাদের ফ্ল্যাটে চুরি হয়েছে বলে একটা ডায়েরি করব। আর ইতিমধ্যে তোমার কাজ হবে, সেই ছাপ নেওয়া সাবানটাকে বাথটাবে রেখে জলে পুরোপুরি গলিয়ে ফেলা এবং ওটার হাত থেকে নিখুঁতভাবে নিষ্কৃতি পাওয়া। তারপর ঘরের গোটাকয়েক ড্রয়ার-টয়ার খুলে রেখে আর কাগজপত্র কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে মঞ্চসজ্জার কাজ সম্পূর্ণ করে রাখবে। পুলিশ তদন্তে এলে ভালোই হবে। ওদের এক্সপার্টরা যখন দেখবে দরজা ফোর্স করা হয়নি, তখন স্বাভাবিকভাবেই ওদের নজর পড়বে চাবির ফুটোর দিকে। ওরাই আমাদের জানাবে, চোর এসেছিল নকল চাবি দিয়ে দরজা খুলে। আমরা সবাই যেন সাবধানে থাকি—কিছু হলেই যেন ওদের খবর দিই ইত্যাদি, ইত্যাদি। অর্থাৎ নকল চাবির ব্যাপারটা পুলিশের মনে আমরা গেঁথে দেব।
ইলা বোধহয় এতক্ষণে আমার এই প্রাথমিক পরিকল্পনার তাৎপর্য বুঝতে পারল। ও চোখ গোল-গোল করে শুনতে লাগল।
প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত হল। এইবার শুরু হবে প্রাণকান্ত-সংহার পালার দ্বিতীয় অধ্যায়।
বুধবার বিকেল পাঁচটা একুশের ট্রেনে আমরা দুজনে বাইরে যাচ্ছি।
কেন?—বাধা দিয়ে জানতে চাইল ইলা।
দরকার আছে, তাই। যাকগে, শোনো। সেইদিন ঠিক পৌঁনে পাঁচটার সময় প্রাণকান্তর সঙ্গে আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করব। ওকে প্রচুর টাকার লোভ দেখাব, তা হলে ও ঠিক সময়মতোই আসবে। এদিকে অফিস থেকে পাঁচটা বাজতে পঁচিশের সময় আমি বেরিয়ে পড়ছি। কিন্তু আমার সহকর্মী সমর জানবে আমি বেরুলাম ঠিক পাঁচটায়—পাঁচটা বাজতে পঁচিশে নয়। কারণ, বুধবার আমার রুমের দেওয়াল-ঘড়ির কাঁটা সমরকে লুকিয়ে আমি পঁচিশ মিনিট এগিয়ে দেব। এগিয়ে দেব আমার হাতঘড়ির কাঁটাও। এবং সমরের হাতঘড়ির কাঁটাও যে করে হোক আমাকে সরাতে হবে। মোটমাট পাঁচটা বাজতে পঁচিশ মিনিটের সময় অফিস থেকে বেরিয়ে আমি সোজা বাড়িতে আসছি।
এখন ভালো করে শোনো তোমাকে কী করতে হবে। ঠিক পাঁচটা বাজতে পঁচিশের সময় তুমি রেডি হয়ে বাইরে বেরোবে—অবশ্য বেরোনোর আগে তোমার ঘড়ির কাঁটা পঁচিশ মিনিট এগিয়ে নেবে। যাতে সময় তখন পাঁচটা বলে মনে হয়। ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়েই তুমি অরোরাদের (আমাদের উলটোদিকের ফ্ল্যাটের সেই পাঞ্জাবি ভদ্রলোকদের কথা বলছি) ফ্ল্যাটের দরজায় আস্তে নক করবে। নক করেই চট করে এসে ঝুঁকে দাঁড়াবে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজায়। বেশ ‘খটাং-খটাং’ করে চাবি ঘোরাবে। তবে দরজার পাল্লায় সামান্য ফাঁক রেখে দেবে যাতে ঘরের ভেতরের শব্দ বাইরে থেকে শোনা যায়। এদিকে তোমার পেছনে অরোরাদের ফ্ল্যাটের দরজা ততক্ষণে খুলে গেছে। আর সেই দরজায় দাঁড়িয়ে মিসেস অরোরা বেশ কৌতূহলে তোমাকে লক্ষ করছেন (যেহেতু মিস্টার অরোরা রাত বারোটার আগে কোনওদিনই বাড়ি ফেরেন না)। তখন তোমার কাজ হবে ওর সঙ্গে কথা বলা। নকল চাবি দিয়ে যে আমাদের ফ্ল্যাটে গত রবিবার চোর ঢুকেছিল, সে-কথা ওঁকে চটাপট জানিয়ে দেবে। তুমি যে আমার সঙ্গে পাঁচটা একুশের ট্রেনে বাইরে যাচ্ছ সে-কথাও বলবে এবং রোববার পর্যন্ত, অর্থাৎ, যে-ক’দিন আমরা থাকব না, ওঁকে আমাদের ফ্ল্যাটের দিকে একটু নজর রাখতে রিকোয়েস্ট করবে। বলা তো যায় না, সেই চোরটা কখন আবার এসে নকল চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ে? মিসেস অরোরা নজর রাখতে পারুন আর না-ই পারুন, একগাল হেসে নজর রাখবেন বলে তোমাকে আশ্বাস দেবেন এবং আমিও সেটাই চাই। কারণ, পরে প্রাণকান্তর ডেডবডি পাওয়ার পর মিসেস অরোরা ওঁর নজর রাখার কাজে গাফিলতি করেছেন বলে নিজেই আপশোস করবেন। ইস, কেন তিনি ভালো করে নজর রাখলেন না! নয়তো ওই চোরটি কি কখনও ঢুকতে পারত?—যাক, আশা করি ব্যাপারটা তুমি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছ? হ্যাঁ, এইবার কথার ফাঁকে তোমার ঘড়িতে যে পাঁচটা বাজে (অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষে সময় তখন পাঁচটা বাজতে পঁচিশ মিনিট) সেটাও বেশ কায়দা করে জানিয়ে দেবে ওঁকে। আর ঠিক সেইসময় তুমি কাঁটা এগিয়ে দেওয়ার ফলে আমাদের দেওয়াল-ঘড়িতেও ঢং ঢং করে পাঁচটা বাজবে। সুতরাং ভবিষ্যতে মিসেস অরোরা যদি কোনওদিন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সামনে পড়েন, তখন তিনি শপথ করেই বলবেন যে, ঠিক পাঁচটার সময় তুমি ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে গেছ। ব্যস, তারপর মিসেস অরোরার চোখের সামনে দিয়েই চাবি ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে তুমি লিফটে চড়ে নামতে শুরু করবে।
