একটু হেঁ-হেঁ করে হাত কচলে উঠে দাঁড়াল সমাদ্দার। এগিয়ে চলল দরজার দিকে। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে ধরলাম। এবং খেয়াল করলাম, আমার সাহিত্যজীবনে এই প্রথম এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমি এক নিখুঁত খুনের প্লট চিন্তা করে চলেছি। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শ্রীঅমিত সান্যাল জীবনে সর্বপ্রথম এক যুগান্তকারী গোয়েন্দা উপন্যাস লেখায় হাত দেবেন।
কিন্তু দরজা ছেড়ে বেরোনোর সময়ও প্রাণকান্ত আমার মনের পরোপকারী চিন্তাধারার কথা টের পেল না। কারণ, আমার মুখের অমায়িক হাসিটা ওকে ভাববার সুযোগ দিচ্ছিল, আমি ভয় পেয়েছি।
ইলার ফিরতে যে খুব বেশি দেরি হবে না, তা জানতাম। তাই ওর স্নায়ুর ওপর যাতে হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করা যায়, সেইজন্যে দৃশ্যসজ্জায় চটপট মনোযোগ দিলাম। ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খুলে রাখলাম। নিভিয়ে দিলাম ঘরের সব ক’টা আলো। তারপর বসবার ঘর ছেড়ে শোওয়ার ঘরে গেলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারে বসলাম—দরজার ঠিক মুখোমুখি। তারপর আমার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকা শেড দেওয়া টেবল-ল্যাম্পটাকে জ্বেলে দিলাম। অর্থাৎ, দরজার সামনে থেকে দেখলে আমার শরীরের সিলুয়েট ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়বে না। আর দেখা যাবে শুধু জ্বলন্ত সিগারেটের অগ্রভাগটুকু।
প্রতীক্ষা শুরু করার মিনিট-দশেকের মধ্যেই সদর দরজার কাছ থেকে কানে এল একটা অস্ফুট চাপা আর্তনাদ। তারপরেই ইলার কাঁপা স্বর, অমিত, অমিত।
আমি নীরব।
অমিত, তুমি কোথায়?
আমি তবুও নীরব। সিগারেটের ধোঁয়ার কালো ছায়া ঘুরে বেড়াতে লাগল ঘরের দেওয়ালে।
এবার ওর হালকা পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল শোওয়ার ঘরের দরজার দিকে, যে-ঘরে আমি বসে আছি।
দরজার কাছে আসামাত্রই আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবং একইসঙ্গে ঘটে গেল তিনটে ঘটনা।
এক, কিনে আনা জিনিসপত্রের বাক্সগুলো ইলার হাত থেকে স্খলিত হয়ে পড়ে গেল।
দুই, ওর ভোক্যাল কর্ড ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। ওর গলাফাটানো চিৎকারে গমগম করে উঠল গোটা ঘরটা।
আর শেষ ঘটনাটা যেমন চমকপ্রদ তেমনি আকস্মিক। ইলা ঘুরে দাঁড়িয়েই উন্মাদের মতো ছুটতে শুরু করল।
আমিও আর দেরি না করে ক্ষিপ্রগতিতে ওকে অনুসরণ করলাম। সিগারেটের টুকরোটা বসবার ঘরের টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলাম। তারপরই ফ্ল্যাটের খোলা দরজা লক্ষ্য করে দৌড়তে শুরু করলাম।
বাইরে বেরোতেই করিডরের অলোয় কিছুক্ষণের জন্যে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কিন্তু বুঝতে অসুবিধে হল না, ইলা সিঁড়ি ধরে দৌড়চ্ছে। সুতরাং আমিও সিঁড়ি ভেঙে দুদ্দাড় করে ছুটলাম।
তিনতলার সিঁড়ির কাছাকাছি এসেই ইলাকে ধরে ফেললাম। এবং ও চিৎকার করবে বুঝতে পেরেই বাঁ-হাতের তালু দিয়ে ওর মুখটা চেপে ধরলাম। ও বোবা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমি পেছন থেকে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ভয় নেই, ইলা। আমি—আমি অমিত।
ইলা ঘুরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ল আমার বুকে। ওকে ধরে ধীরে-ধীরে ওপরে নিয়ে চললাম। আমার এই সাজানো পরিবেশ যে ওর মনে এতটা আতঙ্কের সৃষ্টি করবে, তা ভাবতেই পারিনি। ইলার এই আকস্মিক ভয় পাওয়ার কারণ আমাকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলল। তা হলে কি…?
ওনারশিপ ফ্ল্যাটগুলোর একটা সুবিধে আছে। এরা কেউই কারও ব্যাপারে নাক গলায় না। এমনকী কারও সঙ্গে কারও আলাপ-পরিচয়ও তেমন নেই। তা ছাড়া বহু ফ্ল্যাটে এখনও লোক আসেনি। তাই এত গন্ডগোল সত্ত্বেও কেউ যে দরজা খুলে বেরিয়ে এল না, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার উলটোদিকের ফ্ল্যাটে যে-পাঞ্জাবি ভদ্রলোক থাকেন, তিনি যখন প্রত্যেকদিন রাত বারোটা-একটার সময় টলটলায়মান অবস্থায় ফিরে এসে একাদিক্রমে তার ফ্ল্যাটের দরজা এবং তার দজ্জাল গৃহিণীর সঙ্গে পানিপথের চতুর্থ এবং পঞ্চম যুদ্ধ বেশ উৎসাহ সহকারে শুরু করেন, তখন আমি আর ইলা বন্ধ দরজার পেছন থেকেই সে-যুদ্ধের ধারাবিবরণী শুনি। ভুলেও দেখতে যাই না যুদ্ধের ফলাফল।
সুতরাং বিন্দুমাত্রও বিচলিত না হয়ে ইলাকে নিয়ে ঘরে এসে ঢুকলাম। আন্দাজে হাত বাড়াতেই হাতে ঠেকল আলোর সুইচ। আলো জ্বেলে ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে দিলাম।
ইলার ফোঁপানি বন্ধ হয়ে গেলেও ওর দেহটা এখনও ফুলে-ফুলে উঠছে। ওকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিলাম, বোসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।
ইলা একবার মুখ তুলে আমাকে দেখল, তারপর চোখ নামিয়ে বসে পড়ল সোফায়।
আমি ছড়িয়ে পড়া জিনিসপত্রের বাক্সগুলো গুছিয়ে রেখে ইলার মুখোমুখি এসে বসলাম। ওর জলে ভেজা মুখটা কি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে পাঁচ বছর আগে দেখা ইলাকে। ফরসা মুখে টানা-টানা গভীর জীবন্ত কালো চোখ। হাতছানি দেওয়া স্বপ্নিল ঠোঁটের নীচে সৌন্দর্যের পরিপূরক ছোট্ট তিলটা যেন শিল্পীর হাতের নিখুঁত পরশ।
ইলা একটা সামান্য ব্যাপার তুমি আমাকে জানাতে বোধহয় ভুলে গিয়েছিলে। তাই প্রাণকান্ত সমাদ্দার এসে সেই কথাটা আজ আমাকে জানিয়ে দিয়ে গেছেন।
ইলা কাপড়ের খুঁট নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল, আমার কথা শোনামাত্রই দু-হাতে আঁকড়ে ধরল সোফার হাতল। ভাবলেশহীন কঠিন মুখে আমার দিকে তাকাল। গভীর কালো চোখে ফুটে উঠল অনুচ্চারিত বিস্ময়, আতঙ্ক।
সমাদ্দার আমাকে সবই বলেছেন, ইলা। কোনওকিছুই জানতে আমার আর বাকি নেই। সুতরাং ব্যাপারটা সত্যি কি না সেটা তোমার মুখ থেকে আমি শুনতে চাই।
