অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও ছোটকার কথাবার্তা ঝামেলা সবই শুনতে পাচ্ছিল। আর সেগুলো ও মিহি চাপা গলায় রিলে করে শোনাচ্ছিল যমজ দু-ভাইকে। মেয়েটি কাচের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তেই ঝামেলা বলে উঠল, এবার গ্লাসঘরের নিকটে চলো। নহিলে কিছু শুনতে পাইব না। আমার ভেরি কিউরিয়োসিটি হইতেছে, তৎসহ উত্তেজনা। ফুজিয়ামা! ফুজিয়ামা!
ঝামেলার কপালের রঙিন বাতিগুলো দপদপ করে জ্বলতে নিভতে লাগল। অনেক সময় আনন্দে বা উত্তেজনায় ঝামেলা ফুজিয়ামা! ফুজিয়ামা! বলে চেঁচিয়ে ওঠে। ওর আনন্দ বা উত্তেজনায় সঙ্গে জাপানের এই আগ্নেয়গিরিটির যে ঠিক কী ধরনের সম্পর্ক সেটা ঝালাপালা বা ছোটকা এখনও আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি।
ওরা তিনজনে কাচের ঘরের খুব কাছটিতে এসে দাঁড়াল। ঝালাপালা সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। আর ওদের শোনার সমস্যার সমাধান করে দিল আলট্রাসনিক কানের মালিক ঝামেলা।
দোকানের মালিক মিস্টার আস্থানা মোটাসোটা প্রৌঢ় মানুষ। মাথায় টাক। ঘাড়ের কাছে কয়েক গোছা সাদা চুল। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। তাঁকে সব ঘটনা খুলে বলল ছোটকা।
ব্যাপার-স্যাপার শুনে ভদ্রলোক খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। ছোটকা ব্যাগটা খুলে আগেই দেখেছিল, এখন মিস্টার আস্থানাকে দেখাল।
ব্যাগের ভেতরটা কালো, অন্ধকার-জামাকাপড়ের চিহ্নমাত্রও সেখানে নেই।
ছোটকা ব্যাগের ভেতরে হাত ঢোকাল।
কিন্তু অবাক কাণ্ড! ছোটকার হাত ব্যাগের কোনও তল খুঁজে পেল না!
ব্যাগের মুখটায় নিকেল করা ধাতুর পটি লাগানো ছিল। সেটার উষ্ণতা স্বাভাবিক মনে হলেও ছোটকা টের পেল যে, ব্যাগের ভেতরটা ভীষণ ঠান্ডা। ঠিক যেন দার্জিলিং।
মিস্টার আস্থানা হতভম্ব হয়ে ছোটকাকে দেখছিলেন। আর মেয়েটিও মুখ কঁদো-কঁদো করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে সব লক্ষ করছিল।
মিস্টার আস্থানার টেবিল থেকে একটা বলপয়েন্ট পেন তুলে নিল ছোটকা। সেটা টুপ করে ফেলে দিল ব্যাগের ভেতরে। পেনটা যথারীতি অদৃশ্য হয়ে গেল। ব্যাগের ভেতরে হাতড়ে ওটাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। অথচ বাইরে থেকে ব্যাগটার গভীরতা সাত-আট ইঞ্চির বেশি মনে হয় না।
ছোটকা একজন ক্যাশিয়ারের টেবিল থেকে একটা মেটাল স্কেল তুলে নিল। স্কেলটার দৈর্ঘ্য একফুট। অথচ সেটা খাড়াভাবে ব্যাগে ঢোকাতেই স্কেলটা বিনা বাধায় তলিয়ে গেল ব্যাগের অতলে।
মিস্টার আস্থানা অবাক হয়ে ছোটকাকে জিগ্যেস করলেন, এ তো ভারী পিকিউলিয়ার মিস্টিরিয়াস ব্যাপার! আপনি কি কিছু বুঝতে পারছেন?
ছোটকার ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল। ব্যাগটার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে ও গভীরভাবে কিছু ভাবছিল। কিছুক্ষণ পর বারকয়েক মাথা নেড়ে ছোটকা জবাব দিল, একটু একটু আঁচ করতে পারছি।
তারপর ছোটকা মেয়েটিকে জিগ্যেস করল, তোমার নাম কী? কোথায় থাকো?
মেয়েটি কাঁদো কাঁদো স্বরে উত্তর দিল, আমার নাম রূপালি-রূপালি চ্যাটার্জি। সল্টলেকে বিডি মার্কেটের কাছে থাকি।
এই ব্যাগটা তুমি কোথায় পেয়েছ?
সল্টলেকে বাস স্টপেজের কাছে কুড়িয়ে পেয়েছি।
রূপালির কথা থেকে জানা গেল, ব্যাগটা যখন ও কুড়িয়ে পায় তখন আশেপাশে কেউ ছিল না। তাই ও ব্যাগটা নিয়ে বাসে উঠে পড়ে। কঁকুড়গাছির কাছে ওর বন্ধু রীতার বাড়ি। সেখানে ওদের আর-এক বন্ধু রঙ্গনার আসার কথা। তারপর তিন বন্ধুতে মিলে ধর্মতলার পুজোর ড্রেস কিনতে রওনা হবে এইরকমই ঠিক করা ছিল।
বাস থেকে নেমে রীতার বাড়ি যাওয়ার সময় ও কী ভেবে ওর ছোট্ট পার্স আর রুমালটা এই ব্যাগটায় রাখে। কিন্তু তারপরই দ্যাখে যে ওগুলোর আর কোনও হদিস নেই। তখন ও অবাক হয়ে ঢিল-পাটকেল, গাছের পাতা, চায়ের ভঁড়, অনেক কিছুই ব্যাগটার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় এবং দ্যাখে যে, সেগুলোও বেমালুম অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রথমটায় ও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরই ওর মনে হয়, ব্যাপারটা খুব মজার। তাই রীতা আর রঙ্গনাকে ও কিছুই জানায়নি। শুধু বলেছে, বাস থেকে নামার পর ওর পার্সটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তারপর এই দোকানে ঢুকে ও স্রেফ মজা করার জন্যই বেশ কিছু জামাকাপড় ব্যাগটায় ঢুকিয়ে অদৃশ্য করে দেয়। কিন্তু ওগুলো যে কোথায় গেছে ও তার বিন্দুবিসর্গও জানে না।
কথা শেষ করে রূপালি কেঁদে ফেলল। ছোটকাকে বারবার করে অনুরোধ করল ওর বাড়িতে যেন কিছু না জানানো হয়।
ছোটকা মালিকের কাছ থেকে একটা প্যাডের কাগজ নিয়ে খসখস করে একটা রিপোর্ট লিখে সই করে দিল। তারপর তিন জায়গায় ফোন করে মিনিটকয়েক ধরে কথাবার্তা বলল।
কথাবার্তা শেষ হলে ছোটকা রূপালিকে বলল, তোমার আর কোনও চিন্তা নেই–তুমি যাও। শুধু জেনে রেখো, আজ তুমি সাংঘাতিক বিপদ থেকে বেঁচে গেছ। কারণ এই ব্যাগটা আসলে ব্যাগ নয়…একটা টানেল।
রূপালি কাচের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চোখ মুছতে মুছতে বন্ধুদের খোঁজে চলে গেল।
মিস্টার আস্থানার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ব্যাগটা নিয়ে ছোটকাও বেরিয়ে এল কাচের ঘর থেকে।
ছোটকা বেরিয়ে আসতেই ঝামেলা জিগ্যেস করল, কী হল, সলভ হইল?
ছোটকা হেসে বলল, হ্যাঁ, হইল। তারপর ঝালা-পালাকে লক্ষ করে বলল, এখন চটপট তোদের প্যান্ট-জামা পছন্দ কর তো।
চন্দ্রকান্ত আবদারের সুরে বলল, ব্যাগটার মিস্ট্রিটা আমাদের খুলে বলো, ছোটকা।
