ঝালাপালা কিন্তু ছোটকার পিছু ছাড়তে চায়নি। বিশেষ করে ঝামেলার তস্কর দর্শন রহস্য ওদের কৌতূহলী করে তুলল।
সুতরাং ভিড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে যমজ জুটি সামান্য চেষ্টাতেই পৌঁছে গেল ছোটকার কাছে। দোকানের বেশ কয়েকজন ক্রেতা অবিকল একই চেহারার একই পোশাক পরা দুই ভাইকে বারবার অবাক নজরে দেখেছিল। কিন্তু ঝালাপালার সেদিকে কোনও খেয়াল ছিল না। ওরা শুধু ঝামেলাকে দেখছিল।
ঝালা-পালাকে দেখে ছোটকা শাসনের সুরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ঝামেলা ওর শক্ত হাতে ছোটকার পেটে চোরা চিমটি কাটল, আর একইসঙ্গে মিহি গলায় বলল, লুক! লুক! অপহরণ করছে।
ছোটকা এবং ঝালাপালা তিনজনেই স্পষ্ট দেখতে পেল ব্যাপারটা।
প্রমাণ মাপের একটা জিন্সের প্যান্ট কাউন্টার থেকে তুলে নিয়ে ছোট সাইডব্যাগটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে লাগল মেয়েটি। এবং ওদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্যান্টটা অনায়াসেই ঢুকে গেল ব্যাগের ভেতরে।
বড়সড়ো ব্যাগ বা ঝোলা নিয়ে দোকানে ঢোকা নিষেধ। তাই দরজার কাছেই রয়েছে ব্যাগ জমা দেওয়ার কাউন্টার। কিন্তু পার্স বা ছোট সাইডব্যাগ জমা রাখার কোনও দরকার নেই। সেগুলো সঙ্গে নিয়ে সবাই ঢুকতে পারে দোকানের ভেতরে–যেমন এই মেয়েটি ঢুকেছে।
পার্স বা ছোট সাইডব্যাগে জামাকাপড় লুকিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। সে কথা মাথায় রেখেই দোকানের নিরাপত্তাকর্মীরা মেয়েটিকে ওই ছোট ব্যাগসমেত দোকানে ঢুকতে দিয়েছে। কিন্তু ছোটকারা চোখের সামনে যে-ঘটনা দেখল তা একেবারেই অবিশ্বাস্য।
ছোটকা কিছু একটা মন্তব্য করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ঝামেলা বলে উঠল, এইরূপ জামাকাপড় প্রচুর লইয়াছে এবং ওই ব্যাগের ভেতরেই সব ঠেসে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
ঝালাপালা প্রায় একসঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে বলল, ছোটকা, ঝামেলার সার্কিটে মনে হয় বেশ বড় রকমের গোলমাল হয়েছে। তাই ও উলটোপালটা দেখছে আর ভুলভাল বকছে। ওইটুকু ব্যাগে কখনও এত জামাকাপড় ঢোকে!
ঝামেলা রেগে গিয়ে বলল, তোমরা কী করে বুঝিবে! বানর থেকে মানুষ হওয়ার পর সেই কোন আদিমকালে পড়ে রয়েছ! যদি আমাদের মতো রোবট হতে তা হলে বুঝিতে!
ঝামেলার বিশ্বাস, মানুষ থেকে বহু বিবর্তনের পর এসেছে রোবট। তাই ও মাঝে-মাঝেই ঝালা-পালাকে আদিমযুগের মানুষ বলে খোঁটা দেয়।
হঠাৎই ছোটকা ঠোঁটে আঙুল তুলে ওদের চুপ করতে ইশারা করল। তারপর চাপা গলায় বলল, ওই দ্যাখ মেয়েটা আবার চুরি করছে!
তারপর ওদের চোখের সামনেই রীতিমতো অলৌকিক ঘটনা ঘটতে লাগল।
মেয়েটি বেশ কয়েকটি জামাকাপড় সেলসম্যান-সেক্সগার্লদের চোখ এড়িয়ে পটাপট ঢুকিয়ে ফেলল ওর ব্যাগে।
ছোটকা আপনমনেই বলল, মেয়েটা ক্লেপটোম্যানিয়াক নয় তো?
চন্দ্রকান্ত অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ক্লেপটোম্যানিয়াক মানে?
ইন্দ্রকান্তও বলে উঠল, সেটা আবার কী?
ছোটকা বলল, ক্লেপটোম্যানিয়া মানে হল চুরি করার অসুখ। মেয়েটার সেরকম কোনও অসুখ নেই তো!
ঝামেলা বলল, ব্যাপার বড়ই বিপত্তারিণী।
ঝালাপালা ভুরু কুঁচকে ঝামেলার দিকে তাকাতেই ছোটকা বলল, ও বোধহয় বলতে চাইছে, ব্যাপার বড়ই বিপজ্জনক।
আরও দু-এক মিনিট মেয়েটিকে লক্ষ করার পর ছোটকা বলল, দাঁড়া, আমি ওর কাছে। গিয়ে ব্যাপারটা একটু খুঁটিয়ে দেখি। তোরা এখানেই থাক, কোথাও যাস না কিন্তু।
ছোটকা ভারত সরকারের গোপন তদন্ত বিভাগে চাকরি করে। সুতরাং গোয়েন্দাগিরির অভ্যেস তো ওর আছেই, সেইসঙ্গে নানা অস্ত্রশস্ত্রও নাড়াচাড়া করতে পারে। ওরা দেখল, ছোটকা দিব্যি ভালোমানুষ-ভালোমানুষ মুখ করে এদিক-ওদিক ঘুরে-ফিরে মেয়েটির ঠিক পাশটিতে গিয়ে দাঁড়াল।
মেয়েটির ব্যাগের মুখটা খোলাই ছিল। উঁকি মেরে ব্যাগের ভেতরে তাকিয়ে ছোটকার তো চক্ষু চড়কগাছ। ব্যাগের ভেতরটা শূন্য! কোনও জামাকাপড়ই সেখানে নেই!
তা হলে এতক্ষণ ধরে মেয়েটি যে জামাকাপড়গুলো ব্যাগের মধ্যে ঢোকাল সেগুলো গেল কোথায়।
ছোটকা আর থাকতে পারল না। পকেট থেকে অফিসের আইডেন্টিটি কার্ডটা বের করে শক্ত গলায় মেয়েটিকে বলল, তোমাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে।
সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েটির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চোখে-মুখে ফুটে উঠল ভয়ের ছাপ। আমতা আমতা করে ও বলল, আমি…আমি… মানে…।
ছোটকা ওর কথায় কান না দিয়ে একজন সেল্সম্যানকে ডেকে জিগ্যেস করল দোকানের মালিক বা ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করা যাবে কি না।
উত্তরে সেল্সম্যানটি আঙুল তুলে ক্যাশিয়ারদের কাচের ঘরটা দেখিয়ে বলল, আমাদের মালিক মিস্টার আস্থানা ওই ঘরে আছেন।
ছোটকা তখন মেয়েটিকে জিগ্যেস করল, তোমার সঙ্গে আর কে আছে?
মেয়েটি হোঁচট খেয়ে কোনওরকমে জবাব দিল, আমার দু-বন্ধু। ওরা এসব কিছু জানে না। ওরা ওইদিকটায় জিনসের শার্ট দেখছে। প্লিজ, ওদের কিছু বলবেন না।
ছোটকা দু-চার সেকেন্ড কী যেন ভাবল। তারপর বলল, আমি ওই কাচের ঘরটায় যাচ্ছি। তুমি বন্ধুদের যা-হোক কিছু একটা বলে ওখানে চলে এসো। ভুলেও পালানোর চেষ্টা কোরো না। আর এই সাইডব্যাগটা আমাকে দিয়ে যাও।
মেয়েটি শুকনো মুখে ছোটকার আদেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করল। বন্ধুদের খবর দিয়ে একমিনিটের মধ্যেই ও চলে এল কাচের ঘরের সামনে।
ছোটকা মিস্টার আস্থানার সঙ্গে কথা বলছিল। মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে ইশারায় ওকে ভেতরে আসতে বলল।
