আগে কেনাকাটা সেরে নে, তারপর যেতে-যেতে বলছি।
কেনাকাটা সেরে রাস্তায় বেরোনোর সময় একটা লম্বা রোবট ঝামেলাকে লক্ষ করে মন্তব্য করল, ন্যাড়া খোকা।
সেটা শুনে ঝামেলা তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে উঠে তেড়ে গেল লম্বা রোবটটার দিকে। বলল, টুডে তোর ওয়ান ডে কি আমার ওয়ান ডে!
ঝালাপালা কোনওরকমে ঝামেলাকে টেনে ধরে সামাল দিল।
ছোটকা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ও কী বলল একটু ঝুঝিয়ে দে তো!
চন্দ্র বলল, ঝামেলা বলল, আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।
ইন্দ্র বলল, ওসব বাদ দাও। তুমি আগে ব্যাগের মিস্ট্রিটা বলো দেখি।
চোর ধরল ঝামেলা
ছোটকা বলল, শোন তা হলে বলছি। ব্যাপারটা বিজ্ঞানের খুব জটপাকানো ব্যাপার, তোরা সহজে বুঝবি না–তবুও সহজ করে বোঝাতে চেষ্টা করছি।
আমরা যে দুনিয়ায় বাস করি সেটা হল ত্রিমাত্রিক দুনিয়া বা থ্রি ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ড। সেইজন্যেই আমাদের তিনটে মাপ আছে–দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা। এইবার কল্পনা কর যে, একটা দ্বিমাত্রিক দুনিয়া, মানে টু ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ড আছে। সেখানকার প্রাণীদের শুধু দুটো মাপ থাকবে– দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ। অর্থাৎ, প্রাণীগুলো হবে চিঁড়েচ্যাপটা চেহারার, আর ওরা দ্বিমাত্রিক কোনও সমতলে লেপটে চলাফেরা করবে। শুধু কি তাই! ওদের দেখার কাজটাও হবে ওই দ্বিমাত্রিক সমতল বরাবর। ফলে ওদের জগতে–মানে, ওই সমতলে–যদি একটা ফুটো করে দেওয়া যায় তা হলে ওরা সেটাকে একটা অন্ধকার গর্ত হিসেবে দেখবে। কারণ, ওদের দেখার অভ্যেসটা সমতল বরাবর –তাই ওরা ফুটো দিয়ে কিছু দেখতে পাবে না। আর দেখতে না পাওয়া মানেই অন্ধকার। একটা কাগজের পৃষ্ঠা নিয়ে তাতে একটা ফুটো করে ব্যাপারটা ভাবলে অনেক সহজে বোঝা যাবে।
তা হলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল? ওই ফুটোটা হল দ্বিমাত্রিক জগৎ আর ত্রিমাত্রিক জগতের মধ্যে যাতায়াতের একটা পথ–মানে, টানেল। দ্বিমাত্রিক জগৎ থেকে যা কিছু ওই ফুটো দিয়ে ঢুকবে তা সরাসরি চলে যাবে ত্রিমাত্রিক দুনিয়ায়। ফলে দ্বিমাত্রিক জগতের প্রাণীরা দেখবে জিনিসগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কাগজের পৃষ্ঠায় একটা ব্যাগের ছবি এঁকে তার মধ্যে একটা ফুটো করে নিলে ব্যাপারটা আরও সহজে বোঝা যাবে। দ্বিমাত্রিক প্রাণীরা ভাববে ব্যাগটার কোনও শেষ নেই। ঠিক আমার হাতের ব্যাগটার মতো। কথাটা বলে রূপালির কাছ থেকে নেওয়া ব্যাগটা ছোটকা ওদের দেখাল। তারপর বলল, এইবার ত্রিমাত্রিক আর চতুর্মাত্রিক দুনিয়ার মধ্যে ঠিক একইরকম জিনিস কল্পনা করে দ্যাখ। রূপালির ব্যাগটার মধ্যে কেউ হয়তো এমন একটা ফুটো করে দিয়েছে যাতে ব্যাগের মুখটা ত্রিমাত্রিক আর চতুর্মাত্রিক দুনিয়ার মধ্যে একটা টানেল তৈরি করে ফেলেছে। ওই ফুটো দিয়ে যা কিছু ঢোকানো হচ্ছে তা সরাসরি চলে যাচ্ছে ফোর ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ডে।
কিন্তু ফুটোটা তৈরি হল কীভাবে? চন্দ্রকান্ত জিগ্যেস করল।
হাতের ব্যাগটার দিকে একবার তাকিয়ে চিন্তিত মুখে ছোটকা বলল, সেটাই তো তখন থেকে ভাবছি। দেখি, অফিসে গিয়ে ব্যাপারটা জানাই। তারপর আমাদের রিলেটিভিটি ল্যাবরেটরিতে ব্যাগটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে।
ঝামেলা উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, সবই সম্পূর্ণরূপে বুঝিলাম। তবে কিছু সামথিং ঝাপসা রয়ে গেল।
ঝালাপালা হেসে জবাব দিল, তোমার কাছে ঝাপসা থাকাই ভালো। তুমি বেশি বুঝে গেলে আর এক বিপদ হবে। এখন চুপচাপ বাড়ি চলো, নইলে তোমাকে ওই টানেলে ঢুকিয়ে ফোর ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ডে পাচার করে দেব।
ঝামেলা মাথা নেড়ে বলল, সে যা-ই বলো, আজ আমার জন্যেই তস্করং ধৃতং
চন্দ্রকান্ত অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, শেষের কথাগুলোর মানে?
ঝামেলা বলল, ওগুলো হল মডার্ন সংস্কৃত–তোমরা বুঝবে না। সেই কোন আদিম যুগে পড়ে আছ! তস্করং ধৃতং মানে চোর ধরা পড়ল।
আর হস্তনস্ত মানে? ইন্দ্ৰকান্ত প্রশ্ন করল।
ছোটকা হেসে জবাব দিল, হস্তনস্ত মানে বোধহয় হাতেনাতে। কী রে, ঝামেলা, ঠিক বলিনি?
ঝামেলা মিহি গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ফুজিয়ামা! ফুজিয়ামা! সেই সঙ্গে ওর কপালের লাল নীল-হলদে-সবুজ বাতিগুলো দপদপ করে জ্বলতে-নিভতে লাগল।
