ঝামেলার এই একটাই গোলমাল। এখনও শুদ্ধ বাংলা বলতে শেখেনি। সাধু-চলিত আর ইংরেজির জগাখিচুড়ি তৈরি করে যা প্রাণ চায় বলে বেড়ায়। যদিও অবশ্য ওর প্রাণ বলতে ঘাড়ের কাছে লুকিয়ে রাখা ব্যাটারি।
ছোটকা বলে, ঝালাপালার কাছে ঝামেলার এখন ট্রেনিং পিরিয়ড চলছে।
চন্দ্রকান্ত ঝামেলাকে লক্ষ করে বলল, ঝামেলা, স্টপ!
ওর নির্দেশে ঝামেলা নীরব স্ট্যাচু হয়ে গেল।
ছোটকা হেসে বলল, ঝামেলা তোদের পোষা রোবট, না গার্জেন!
ঝালা-পালা কোনও কথা না বলে ছুটল মায়ের কাছে। মাকে খুশির খবরটা বলে ঝটপট তৈরি হয়ে নিতে হবে।
ছোটকা সেই ফাঁকে ঝামেলার নানান পার্টস চেক করে নিতে লাগল।
ঝালাপালা তৈরি হয়ে আসতেই ওরা চারজন রওনা হয়ে পড়ল।
ইন্দ্ৰকান্ত বলল, ঝামেলা, স্টার্ট।
সঙ্গে-সঙ্গে ঝামেলার কপালে লাগানো লাল-নীল-হলদে-সবুজ রঙের ছোট ছোট বাতিগুলো জ্বলে উঠল। তারপর দপদপ করে জ্বলতে আর নিভতে লাগল। ঝামেলা খুশি হলে বা উত্তেজিত হলে এই বাতিগুলো এইরকম জ্বলে-নেভে।
ঝামেলা চেঁচিয়ে বলে উঠল, তাই-তাই-তাই, পুজোর জামা চাই।
ছোটকা একটা ট্যাক্সি ডাকতেই সবাই তাতে উঠে পড়ল। ট্যাক্সি ছুটে চলল ধর্মতলার দিকে।
রাস্তায় অনেক লোকজন, যানবাহন। চারপাশে ছড়িয়ে আছে শরতের রোদ্দুর। মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ।
এপাশ-ওপাশ মাথা ঘুরিয়ে সবকিছু দেখতে-দেখতে ঝামেলা মন্তব্য করল, বাতাসে কেমন একটা পূজা-পূজা স্মেল। তোমরা টের পাইতেছ?
ছোটকা হেসে বলল, হ্যাঁ পাইতেছি। কিন্তু তুমি দয়া করে একটু চুপ করবে? নইলে তোমার পুজোর জামা কিনে দেব না।
ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে ঝামেলা চুপ।
কিন্তু ঝামেলাকে নিয়ে ঝামেলা শুরু হল রেডিমেড জামাকাপড়ের বিশাল মাপের দোকানটায় ঢুকতেই।
না, ঝামেলা রোবট বলে নয়। কারণ আজকাল অনেকেই নানা মাপের নানা ঢঙের রোবট সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বেরোয়। বহু কোম্পানি রোবট তৈরি করে, টিভিতে তারা ইনস্টলমেন্টে রোবট বিক্রির বিজ্ঞাপনও দেয়।
দোকানে ঢুকে জামাকাপড় পছন্দ করার সময় ঝামেলা হঠাৎ ছোটকার কাছে এসে চাপা গলায় বলল, আমি একজন তস্করকে দেখিতে পেয়েছি।
ছোটকা এবং ঝালাপালা তিনজনেই অবাক হয়ে ঝামেলার দিকে তাকাল। কারণ, ঝামেলার দেখা ও শোনার ব্যাপারটা যে মোটেই সাধারণ নয় সেটা ওরা জানে। ঝামেলার টেনিসবল সাইজের কাচের গুলির মতো চোখ দুটো পুঞ্জাক্ষি অনেকগুলো লেন্স মিলিয়ে তৈরি। এই চোখ দিয়ে ঝামেলা একমাইল দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পায়–ঠিক টেলিস্কোপের মতো। আর ওর কানের জায়গায় রয়েছে স্রেফ দুটো ফুটো। কিন্তু তার ভেতরে এমন সব কলকবজা আছে যে, ও আলট্রাসনিক মানে, শব্দোত্তর তরঙ্গ–পর্যন্ত শুনতে পায়।
চন্দ্রকান্ত ঝামেলার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে জিগ্যেস করল, কী দেখতে পেয়েছ?
তস্কর, তস্কর। সাদা বাংলায় থিফ মানে, চোর।
কথা বলার সময় ঝামেলার কপালের বাতিগুলো দপদপ করে জ্বলে উঠতে লাগল। ঝালা পালা বুঝল ঝামেলা উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।
ছোটকা ঝামেলার কথা মোটেই উড়িয়ে দিতে পারল না। কারণ, রোবটটা ওর নিজের হাতে তৈরি। তা ছাড়া রোবট কখনও মিথ্যে কথা বলে না। অবশ্য কোনও ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা করাটা রোবটের পক্ষে অসম্ভব নয়।
ছোটকা দোকানের চারদিকে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে নিল।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দোকানটায় জামাকাপড়ের যেমন স্টক তেমনই খদ্দেরের ভিড়ে একেবারে গিজগিজ করছে। প্রচুর সেল্সম্যান ও সেক্সগার্ল এদিক-ওদিক নানান কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে। স্টিরিও স্পিকারে গমগম করে মিউজিক বাজছে। দোকানের বিশাল বিশাল দেওয়ালে নানা রঙের ইলেকট্রনিক রোলিং ডিসপ্লে। তাতে নামি কোম্পানির জামা-প্যান্টের বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে পুজোর স্পেশাল ডিসকাউন্টের ঘোষণা পর্যন্ত রয়েছে। দোকানের দরজার পাশে এক কোণ ঘেঁষে দশ বাই দশ মাপের একটা কাচের ঘর। সেখানে তিনটে কম্পিউটার নিয়ে ক্যাশিয়ারবাবুরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
ওই ভিড়ের মধ্যেই ছোটকা ঝামেলাকে একপাশে ডেকে নিল। তারপর চাপা গলায় বলল, ঝামেলা, ঝটপট বলো, কোথায় তুমি চোর দেখলে।
ঝামেলা বলল, আমার সঙ্গে ওদিকটায় চলো, মেয়েটাকে দেখাইয়া দিতেছি। আমার পু…পু…
ছোটকা ঝামেলার মাথায় এক চাটি মারতেই ও বলল, পু…পুঞ্জাক্ষিকে ফাঁকি দেওয়া বড়ই
ছোটকা ঝালা-পালাকে বলল, তোরা এই কাউন্টারেই থাক–জামা-প্যান্ট পছন্দ কর–আমি এক্ষুনি আসছি…।
ঝালা-পালাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ছোটকা ঝামেলাকে সঙ্গে নিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
ভিড় ঠেলে একটা কোণের দিকে পৌঁছেই ঝামেলা ছোটকাকে ইশারায় থামতে বলল। তারপর ফিসফিসে গলায় বলল, তোমার পশ্চাৎদিকে তিরিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে কেয়ারফুলি তাকাও। হলুদ টপ এবং কালো স্কার্ট পরা ফরসা মেয়েটিকে লক্ষ করিতেছ? উনিই হলেন শ্রীমতী তস্কর।
ঝামেলার কথা মতো ধীরে-ধীরে পিছনে ফিরল ছোটকা। তারপর মোটামুটি তিরিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে নজরটা ঘোরাতেই মেয়েটিকে দেখতে পেল।
মেয়েটির গড়ন সুন্দর ছিপছিপে। বয়েস বড়জোর ষোলো কি সতেরো হবে। ওর হাতে একটা ছোট মাপের সাইডব্যাগ। ব্যাগটার রং নীল আর কালোয় তৈরি দাবার ছক–তবে বেশ মলিন। বিশেষ করে মেয়েটির চেহারা ও পোশাকের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
