রঙ্গিলা বিক্রমের ওপরেও নজর রাখতে লাগল। কখন তিনি অফিসে আসেন, কখন বেরোন, কখন লাঞ্চ সারেন, সবই খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
বিক্রম ভট্টাচার্য এমনিতে খুব ডিসিপ্লিনড আর পাংচুয়াল মানুষ। রোজ ঠিক পাঁচটায় তিনি অফিস থেকে বেরোন। এলিভেটরের জন্য লাইনে না দাঁড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যান। তারপর অফিস-বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে পার্ক স্ট্রিট ক্রস করেন। তারপর মিডলটন স্ট্রিটে বাঁক নিয়ে নিজের লাল রঙের ইন্ডিকা গাড়িতে ওঠেন। গাড়ি চালিয়ে সোজা বাড়ি যান।
আমার মাথার মধ্যে ‘ম্যাথামেটিক্স অফ ইভেন্ট স্পেকুলেশান’-এর গল্প ঘোরাফেরা করতে লাগল। আমি জোর করে ওইসব আজগুবি রাবিশকে মাথা থেকে তাড়ালাম। ধুস, যতসব ফালতু ব্যাপার!
একদিন—সেদিনটা ছিল বৃহস্পতিবার—পাঁচটা বাজতে পাঁচমিনিট নাগাদ বিক্রম যখন ওঁর চেম্বার থেকে বেরিয়ে চটপটে পা ফেলে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তখন রঙ্গিলা ওঁকে ডাকল।
‘স্যার—।’
বিক্রম থমকে দাঁড়ালেন। চোখে প্রশ্ন।
রঙ্গিলা তড়িঘড়ি ওঁর কাছে এগিয়ে গেল। তারপর নর্থ ইন্ডিয়া রিজিয়ানে আমাদের হোলসেল বিজনেস নিয়ে এলোমেলো কথা বলতে লাগল।
বিক্রম ভুরু কুঁচকে একবার নিজের রিস্টওয়াচের দিকে তাকালেন। তারপর শুধুমাত্র রঙ্গিলা শর্মা বলেই ওর কথা শুনতে লাগলেন।
আমি অফিসের ওয়াল ক্লকের দিকে নজর দিলাম। ওঁরা তখনও কথা বলছে। লক্ষ করলাম, রঙ্গিলাও আড়চোখে ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছে।
ঠিক পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড পার হওয়ামাত্রই রঙ্গিলা হঠাৎ করে ‘থ্যাংক ইউ, স্যার’ বলে কথাবার্তায় আচমকা ইতি টানল। তারপর অনেকটা অশোভনভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের চেম্বারের দিকে রওনা দিল।
বিক্রম ভট্টাচার্যও তাড়াতাড়ি সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।
আমি কী ভেবে রাস্তার দিকের একটা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
নীচে ব্যস্ত পার্ক স্ট্রিট।
একটা ঠান্ডা চোরা স্রোত আমার শরীরের ভেতরে বইতে শুরু করল। ভাবলাম, বিক্রমকে ডেকে সাবধান করি। কিন্তু কীসের জন্যে সাবধান করি। কিন্তু কীসের জন্যে সাবধান করব? আমাকে পালটা ওঁর ধমক খেতে হবে।
দেখলাম, বিক্রম ভট্টাচার্য অফিস বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে ফুটপাথের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর প্রথম সুযোগেই রাস্তা পার হতে শুরু করলেন।
রাস্তার মাঝবরাবর আসতেই একটা ট্যাক্সি পাগলের মতো ছুটে এসে বিক্রমকে ধাক্কা মারল। ওঁর শরীরটা শূন্যে ছিটকে গেল। তারপর…।
এরপর একমাস কেটে গেলেও আমার মন থেকে চোরা অস্বস্তিটা গেল না। বিক্রম অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর রঙ্গিলা শর্মা এখন আমাদের কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট। ভিপির চেয়ারে গেলেও আমার সঙ্গে ও ‘তুমি-তুমি’-র বন্ধুত্বই বজায় রেখেছে। ওর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা দেখে অনেক সহকর্মীই আমাকে এখন পিঠ চাপড়ায়, আওয়াজ দেয়। আমিও বুঝতে পারি, রঙ্গিলার সঙ্গে আমার রিলেশানটা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। এরপর যদি একদিন আমাদের বিয়ে হয়, তারপর…।
তারপর আমাকে এই ভেবে সারাটা জীবন কাটাতে হবে যে, কবে ও আমাকে মাঝপথে দাঁড় করিয়ে আমার সঙ্গে ঠিক পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড কথা বলবে, দেরি করিয়ে দেবে। তারপর…।
ওই পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের ভয়েই আমি ‘ইয়োর বুকস’-এর চাকরি ছেড়ে দিলাম।
চোর ধরল ঝামেলা
কোনও রোবটের পুজোর জামা কেনা যে কীরকম ঝকমারি সেটা এবার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল ছোটকা। তার ওপর যদি সেই রোবট বাচ্চা খোকা হয়, আর তার নাম হয় ঝামেলা, তা হলে তো কথাই নেই।
যমজ দুই ভাইপো, চন্দ্রকান্ত আর ইন্দ্রকান্তকে পুজোর জামা-প্যান্ট কিনে দেবে বলে ছোটকা ওদের নিয়ে রওনা হচ্ছিল। কিন্তু কোথা থেকে হেলে দুলে হাঁটতে-হাঁটতে সামনে এসে হাজির হল তিনফুট মাপের বাচ্চা রোবট ঝামেলা। রিনরিনে মেয়েলি গলায় বলল, টুইন দুই ব্রাদারের সহিত আমিও পূজার জামা কিনিতে যাব…কিনিতে যাব..কিনিতে যাব…।
ঝামেলার কিনিতে যাব… ব্যাপারটা আর থামছিল না বলে ছোটকা ওর ন্যাড়া ধাতব মাথায় মারল এক চাটি। তারপর বলল, ওর ভেতরের সার্কিটে বোধহয় কোনও গণ্ডগোল হয়েছে। পরে দেখে দেব, বুঝলি, ঝালাপালা।
শেষ কথাগুলো ছোটকা বলেছে চন্দ্রকান্ত আর ইন্দ্রকান্তকে লক্ষ করে। ছোটবেলায় এই যমজ জুটি কান্নাকাটি, চিৎকার, চেঁচামেচি করে বাড়িসুদ্ধ সবার কান ঝালাপালা করে দিত। তাই ছোটকা ওদের নাম রেখেছিল ঝালাপালা। তবে এ-নামে আর কেউ ওদের ডাকলে দু-ভাই ভীষণ খেপে যায়।
ঝামেলার ঝকঝকে মাথাটা পাঁচ নম্বর ফুটবলের মতো প্রকাণ্ড। হাত-পাগুলো কাঠির মতো সরু লিকলিকে। তবে আঙুলগুলো খুব নিখুঁতভাবে তৈরি। সবসময় ও জামা-প্যান্ট পরে থাকে। ছুটতে পারে না, হেলে দুলে হাঁটতে পারে। ইচ্ছেমতো কথা বলতে পারে, কিন্তু গলার স্বরটা মিহি মেয়েলি।
সব মিলিয়ে ঠিক যেন একটা কথা-বলা পুতুল।
পঞ্চাশ কেজি ওজনের এই বাচ্চা রোবটটা ছোটকাই তৈরি করে দু-ভাইকে উপহার দিয়েছে।
ছোটকার চঁটি খেয়ে ঝামেলা চুপ করে গিয়েছিল–তবে সে মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য।
ঝালাপালা যখন পুজোর জামা কিনতে যাওয়ার আনন্দে হইহুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে তখন ঝামেলা গম্ভীরভাবে বলে উঠেছে, এত লম্ফঝম্পপূর্ণ উল্লাসের কী হইয়াছে? সেই কোন আদিম যুগে পড়ে আছ। বিবর্তন হয়ে আমার জায়গায় পৌঁছেলে বুঝতে সভ্যতার আর এক নাম সংযম। আমাকেই অবলোকন করো না। আনন্দ কি আমারও হইতেছে না? কিন্তু আমি কি শাখামৃগের ন্যায় জাম্প দিচ্ছি?
