আর তখনই দেখতে পেলাম, ওর কপাল থেকে গলা পর্যন্ত একটা গভীর ক্ষত। বাঁ-দিকের চোখটা কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে বাইরে। নাকের পাশে মাংস ফাঁক হয়ে গেছে। চোয়ালের নীচে নরম মাংস ফালা-ফালা হয়ে ঝুলছে।
তারপরই কাদা-মাখা কুকুরটা নদীর পাড় বেয়ে নেমে গেল নীচে। আমার চোখের আড়ালে চলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পরেই শুনতে পেলাম লোকজনের চিৎকার—আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তার মধ্যে বড়মেসো আর রাহুলের গলা আমি চিনতে পারলাম।
বোধহয় আমার ভাঙা গলার চিৎকার কেউ শুনতে পেয়েছিল।
অপরূপ অন্ধকার
বিশ্বনাথকে গোপন খবরটা দিয়েছিলেন ওঁরই বন্ধু সন্দীপন।
তবে সেটা মোটেই সহজে দেননি। ওঁকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে অনেক চাপাচাপি করতে হয়েছিল, সঙ্গে ঘুষ দিতে হয়েছিল এক প্যাকেট বিদেশি সিগারেট। তারপর একটু-একটু করে ব্যাপারটা ফাঁস করেছিলেন সন্দীপন।
ফাঁস করেছিলেন আরও একটা কারণে। বিশ্বনাথের রোজকার হেনস্থার কথা শুনে সন্দীপনের মনটা নরম হয়েছিল। বন্ধুর দুঃখ-কষ্ট দাগ কেটেছিল মনে। তাই গোপন কথাটা আর গোপন রাখতে পারেননি।
শুনে থ’ হয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বনাথ। এরকমটাও হয়।
‘হয় মানে!’ চোখ পাকিয়ে বলেছিলেন, সন্দীপন, ‘হচ্ছে! এই তো আমি জলজ্যান্ত তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তারপরেও তুমি অবিশ্বাস করবে?’
না, শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস করতে পারেননি বিশ্বনাথ। কিন্তু অভিনব ধাক্কাটা সামলাতে সময় লেগেছিল। আর সেই বেসামাল অবস্থাতেই একটা গোপন ইচ্ছে মনের জানলা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছিল।
সন্দীপনকে আর কিছু বলেননি বিশ্বনাথ। শুধু একটা ঝিম ধরা ভাব নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন।
সেদিন রাতে ছেলের বউ পারমিতা যখন ওঁর সামনে খাবারের থালা রেখে দিয়ে চলে গেল তখন বিশ্বনাথ বিরক্ত হতেও ভুলে গেলেন। সন্দীপনের কথাগুলো ওঁকে এমনই মশগুল করে রেখেছিল।
খানিকক্ষণ পর খেয়াল হতেই থালায় সাজানো পদগুলো দেখতে পেলেন। তিনটে রুটি, বেগুনপোড়া, একটা সবজি, আর একটা ছোট্ট বাটিতে দই।
ওঁর মতো ষাট পেরোনো বৃদ্ধের স্বাস্থ্যরক্ষা করতে এই ধরনের মেনুই নাকি ডাক্তারের পরামর্শ।
বিশ্বনাথের মনে হল, পাশেই ডাইনিং স্পেসে গিয়ে পারমিতা আর আলোকের পাতটা দেখে আসেন। ডাক্তাররা কোন ধরনের মেনু সাজেস্ট করেছেন বত্রিশ আর সাতাশের স্বামী-স্ত্রীর জন্য। আর ডাইনিং স্পেসের পাশের বারান্দায় গিয়ে দেখে আসেন, আলোকের পোশা অ্যালসেশিয়ান ভিক্টরের জন্য কোন মেনু বরাদ্দ হয়েছে।
স্ত্রী রেণুকণা বেঁচে থাকলে বলতেন, ‘ছেড়ে দাও! এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে কিছু বোলো না। সবাই তোমাকে ছোট ভাববে। তার চেয়ে বরং একটু না হয় স্যাক্রিফাইস করলে…।’
স্যাক্রিফাইস! আলোক আর পারমিতা জানে এই শব্দটার মানে?
রেণুকথার কথা মনে পড়তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের জমাট অন্ধকার ঠেলে বেরিয়ে এল বাইরে।
দীর্ঘশ্বাসের আর দোষ কী! রেণুকথা চলে যাওয়ার পর গত পাঁচ বছর ধরে এটা বিশ্বনাথের গা সওয়া হয়ে গেছে।
বেশ মনে পড়ে, আলোকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। ও কলেজ থেকে বি. এসসি. পাশ করে বেরোনোর পর-পর।
এমনিতে ছোটবেলা থেকেই ও বেশ আদরে-আদরে মানুষ হয়েছে—একমাত্র সন্তান হলে সাধারণত যেমনটা হয়। তবে ও যতই বড় হয়েছে ওর মধ্যে জেদ আর স্বার্থপর ভাব ততই মাথাচাড়া দিয়েছে।
বিশ্বনাথ ব্যাপারটা ভীষণ অপছন্দ করতে শুরু করেছিলেন।
রেণুকথা আলোককে যেমন স্নেহ করতেন, তেমন শাসনও করতেন। তবে দুটোর মাত্রা বোধহয় সঠিক অনুপাতে ছিল না। অথবা বোধহয় ভাবতেন, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু হয়নি।
আলোকের সঙ্গে যেদিন বিশ্বনাথের প্রথম সরাসরি সংঘর্ষ বাধে সেদিনটা বিশ্বনাথ ভোলেননি। কারণ, দিনটা ছিল আলোকের জন্মদিন। তখন ও থার্ড ইয়ারে পড়ে।
বাড়িতে বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করেছিল আলোক। আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে সারাটা দিন ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাত পুড়িয়ে ছ’-সাত পদ রান্না করেছিল রেণুকথা। ফ্রায়েড রাইস, চাইনিজ আলুর দম, চিনি চিকেন, আরও কত কী!
জন্মদিন আসার দিনসাতেক আগে থেকেই মায়ের কাছে বায়না করেছিল আলোক। বলেছিল, ‘মা, কলেজে এবারই আমাদের লাস্ট ইয়ার—এরপর বন্ধুরা কে কোথায় ছিটকে যাবে। এবারের বার্থডেটা একটু জোরদার করতে হবে। আমার খুব ক্লোজ পাঁচ-ছ’জন বন্ধুকে সেদিন নেমন্তন্ন করব—রাতে এখানে খেতে বলব।’
রেণুকথা হেসে রাজি হয়েছিলেন। কারণ, আলোকের সেই কোন সাত বছর বয়েসে বেশ ঘটা করে ওর জন্মদিন উদযাপন করা হয়েছিল। তারপর থেকে প্রায় সব বছরেই শুধু ওরা তিনজন। আর রেণুকণার হাতে তৈরি পায়েস, সঙ্গে মাংস, কিংবা চিংড়ি মাছের মালাইকারি।
তাই সেবার খাওয়াদাওয়ার আয়োজনটা ভালোই হয়েছিল। বিশ্বনাথ নিজের হাতে চুটিয়ে বাজার করেছিলেন।
সন্ধেবেলা আলোকের পাঁচজন বন্ধু এসে হাজির হল। তিনজন ছেলে, দুজন মেয়ে। ওদের পোশাক বেশ আধুনিক ফিটফাট। চেহারাও টগবগে, তরতাজা। মুখে হাসি লেগেই আছে। আর হাতে গিফটের প্যাকেট।
বিশ্বনাথ আর রেণুকণার সঙ্গে বন্ধুদের আলাপ করিয়ে দিল আলোক। ওরা সবাই পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করল।
বিশ্বনাথের ব্যাপারটা ভালো লেগেছিল। যদিও যুগ এখন অনেক এগিয়ে গেছে, চারপাশটা অনেক আধুনিক, তা সত্ত্বেও এই সেকেলে অভ্যাসটা বিশ্বনাথকে তৃপ্তি দিয়েছিল।
