‘বই ছাড়াও অন্য ইভেন্ট নিয়ে এরকম অঙ্ক তুমি করতে পারো?’
আমি ভীষণ অবাক হচ্ছিলাম। রঙ্গিলা এসব বলছে কী! আজ ও খুব ক্যান্ডিড মুডে আছে। ওর সিক্রেট রুমের দরজা খুলে দিচ্ছে ধীরে-ধীরে। আর আমিও অন্ধকার ঘরটার ভেতরে উঁকি-ঝুঁকি মারার চেষ্টা করছি।
কফি শেষ করে কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখল ও। তারপর নীচু গলায় বলল, ‘অন্য ইভেন্ট নিয়ে এরকম করতে পারি কিনা? হ্যাঁ, পারি। কখনও ভেবে দেখেছ, যখন কোনও লোক গাড়িতে ধাক্কা খায় তখন একই জায়গায় ঠিক একই সময়ে দুটো অবজেক্ট এসে মিট করে? এই অবজেক্ট দুটো কিন্তু নানান চেইন অফ ইভেন্টস-এর মধ্যে দিয়ে এসে ওই পারটিকুলার মোমেন্টে মিট করেছে—যাকে আমরা বলি অ্যাক্সিডেন্ট। তা হলে ভেবে দ্যাখো, লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি ঘটনা—যাদের একটার সঙ্গে আর-একটার কোনও কানেকশান নেই—কীভাবে এসে মিট করে! একটা ইভেন্ট চেইন কীভাবে আর একটা ইভেন্ট চেইনকে ইন্টারসেক্ট করে!’
‘এরকম কোনও ইভেন্ট চেইনকে তুমি কি সত্যিই কন্ট্রোল করতে পারো?’
‘কিছু-কিছু পারি।’ ঠোঁট টিপে হাসল রঙ্গিলা: ‘আমি ক্যালকুলেট করতে পারি। ইভেন্ট স্পেকুলেশানের ম্যাথ অ্যাপ্লাই করতে পারি। সেসব করে ইভেন্ট চেইনের কয়েকটা টুকরোকে ম্যানিপুলেট করতে পারি। একজন পাঠক আর একটা বইকে একজায়গায় নিয়ে আসতে পারি। একটা গাড়ি আর একজন রাস্তা-পার হওয়া মানুষকে ধাক্কা লাগাতে পারি। ইয়েস আই ক্যান।’
ওর মুখের সিরিয়াস ভাব দেখে আমি হেসে ফেললাম: ‘রঙ্গিলা, এবার ব্যাপারটা সায়েন্স ফিকশানকে ছাপিয়ে যাচ্ছে কিন্তু! তার মানে, তুমি বলছ বহু ঘটনার ভবিতব্য তোমার হাতে?’
‘ভবিতব্য মানে?’ রঙ্গিলা ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল।
‘ডেসটিনি। আই মিন, ইউ থিংক ইউ ক্যান কন্ট্রোল ডেসটিনি?’
আমার প্রশ্নটায় ব্যঙ্গের ছোঁয়া থাকলেও রঙ্গিলা সেটাকে আমল দিল না। ও সিরিয়াস মুখে বলল, ‘হ্যাঁ, প্রীতম, ডেসটিনি আমি কন্ট্রোল করতে পারি—খানিকটা অন্তত পারি।’
এ নিয়ে কথাবার্তা সেখানেই শেষ হয়েছিল। তারপর কাজের চাপে ব্যাপারটা মন থেকে সরে গেল। নতুন একটা অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ লঞ্চ করার প্ল্যানিং নিয়ে আমাদের এডিটোরিয়াল গ্রুপ মেতে উঠল। আমি আর মনোজ বর্মন ঘনঘন মিটিং করতে লাগলাম। কলকাতা বুক ফেয়ার কাছাকাছি এসে গেল। প্রতি বছরের মতো ‘ইয়োর বুকস’-এ সাজ-সাজ রব পড়ে গেল।
সেইসময় একদিন বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ রঙ্গিলা আর বিক্রম ভট্টাচার্যের তুমুল খটাখটি লাগল। রঙ্গিলা চারটে আউট অফ প্রিন্ট পেপারব্যাক রিপ্রিন্টের জন্যে প্রোডাকশনের পাইপলাইনে দিয়েছিল, কিন্তু বিক্রম সেগুলো নাকচ করে দিয়েছেন।
রঙ্গিলা বেশ জোরালো গলায় বলল, ‘আমার সিক্সথ সেন্স বলছে বুক ফেয়ারে এই বইগুলোর এক-একটা দু-হাজার করে বিক্রি হবে। সেইজন্যেই আমি পাইপলাইনে ওগুলো দিয়েছি।’
‘সরি, রঙ্গিলা। দিস টাইম আই উড গো বাই মাই সিক্সথ সেন্স। বইমেলায় নতুন টাইটেল হল টপ প্রায়োরিটি। অন্তত আমার কাছে। সো—।’
‘এই চারটে টাইটেল হল হাই পোটেনশিয়াল মেটিরিয়াল—নতুন টাইটেলের চেয়ে কিছু কম নয়।’
‘সো ইউ থিঙ্ক।’ বিক্রম ভট্টাচার্যের গলা সামান্য উঁচু হল।
ওঁর ঘরের বাইরে তখন আমাদের কয়েকজনের ভিড়। আমরা ভাবছি, জল কোনদিকে গড়ায়।
‘আমি তা হলে সি অ্যান্ড এম-ডি-কে ব্যাপারটা জানাচ্ছি।’ থমথমে গলায় বলল রঙ্গিলা।
‘অফ কোর্স জানান। আই উড লাভ দ্যাট। অ্যাজ পার দ্য রুলস অফ দ্য কোম্পানি এক্সক্লুডিং সি অ্যান্ড এম-ডি দ্য ভিপি অলওয়েজ হ্যাজ দ্য ফাইনাল সে। এক্সক্লুডিং সি অ্যান্ড এম-ডি অ্যান্ড আই অ্যাম স্টিল দ্য ভিপি হিয়ার। ইউ হ্যাভন্ট গট মাই জব ইয়েট। আমি আটমোস্ট ট্রাই করব যাতে এই কোম্পানিতে আপনি সবসময় ভিপি-র চেয়ারের নীচেই থাকেন। ও. কে., নাউ ইউ ক্যান বেগ ইয়োর লিভ, ম্যাম’। এই কথা বলে বিক্রম ওঁর চেম্বারের কাচের দরজা খুলে ধরলেন।
গলা ধাক্কা দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
রঙ্গিলা ঘর থেকে বেরিয়ে এর। ওর মুখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত ভাব। দেখে বোঝাই যায় না, একটু আগেই বিক্রম ভট্টাচার্য ওর ইগোতে হিংস্র কামড় বসিয়েছেন।
আমি ভাবলাম, এইবার বোধহয় কোম্পানিতে উথালপাথাল শুরু হবে, কলকাতা বইমেলার আগে একটা বোম-টোম কিছু ফাটবে।
কিন্তু কিছুই হল না।
এতে আমি যেমন অবাক হলাম, অফিসের আরও অনেকে অবাক হল। রঙ্গিলার বন্ধু হিসেবে অনেকে আমার কাছে ‘গোপন খবর’ শুনতে চাইল। কিন্তু আমি ছাই কিছু জানলে তো জানাব!
বিক্রম ভট্টাচার্যের সঙ্গে ক্ল্যাশের দশ-বারোদিন পর একদিন অফিসের কাজে রঙ্গিলার চেম্বারে ঢুকেছি, দেখি ও ঘরের খোলা জানলায় দাঁড়িয়ে বাইরের রাস্তার দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। ওর হাতে একটা ছোট নোটবই আর পেন। মাঝে-মাঝে কীসব লিখছে।
‘কী করছ?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
রঙ্গিলা ওর কাজে এতই বিভোর যে, কোনও উত্তর দিল না।
কিন্তু ততক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি, ও কী করছে।
রঙ্গিলা পার্ক স্ট্রিট আর মিডলটন স্ট্রিটের ক্রসিং-এর ট্র্যাফিক খুঁটিয়ে দেখছে। ক’টা গাড়ি যাতায়াত করছে তার হিসেব টুকে নিচ্ছে।
এরপর আরও কয়েকদিন ওকে একই অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। জানলা দিয়ে পার্ক স্ট্রিটের গাড়ি চলাচল দেখছে, নোট নিচ্ছে, আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছে। তারপর সেই নোটবই থেকে প্রচুর ডেটা নিয়ে ল্যাপটপে যে বোতাম টিপে ঢোকাচ্ছে সেটাও লক্ষ করলাম।
