ঘটনাটা ঘটেছিল পরের শীতে—তখন আমি ক্লাস সেভেনে।
দুপুরবেলা নদীতে ছিপ ফেলে বসে আছি। আমার একপাশে পিংকি, আর একপাশে রাহুল।
হঠাৎ ওপারের জঙ্গল থেকে শিসের শব্দ ভেসে এল। আমি চমকে মুখ তুলে তাকালাম। মেসোর কাছেই শুনেছি বুনো কুকুরগুলো শিস দেওয়ার মতন করে অদ্ভুতভাবে ডাকতে পারে। কিন্তু কোনও কুকুর আমার নজরে পড়ল না। তখন আবার ফাতনার দিকে মন দিলাম।
এমনসময় সমু নামে একটা ছেলে হাঁপাতে-হাঁপাতে রাহুলকে ডাকতে এল। বলল, ভীষণ দরকার। কাল সকালের ট্রেনে পরেশদা নামে একজন কলকাতা যাবে। তার হাত দিয়ে ক্লাবের ক্রিকেট ব্যাটটা কলকাতার দোকান থেকে আনানো হবে। তার চাঁদা তোলার জন্যে সুবিন আর তোতন রাহুলকে এক্ষুনি ডাকছে। ওদের সঙ্গে কথা সারতে দশ-পনেরোমিনিটের বেশি লাগবে না।
রাহুল উঠে দাঁড়িয়ে সমুর সঙ্গে রওনা হয়ে গেল।
আমাদের সশস্ত্র পাহারাদার চলে যাওয়াতে পিংকি বেশ ভয় পেয়ে গেল। ও আমার গা ঘেঁষে বসে জামা খামচে ধরল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, ‘কোনও ভয় নেই…।’
কিন্তু আমার কথায় ও খুব একটা ভরসা পেল বলে মনে হল না।
একটু পরেই বেশ কয়েকবার শিসের শব্দ শোনা গেল আবার। ব্যস, তাতেই হয়ে গেল। হঠাৎই পিংকি আমার পাশ থেকে উঠে একেবার দে ছুট।
আমি হকচকিয়ে গিয়ে ওকে চিৎকার করে ডাকলাম, ফিরে আসার জন্যে বারবার বললাম। কিন্তু কোনও লাভ হল না।
রাহুল এক্ষুনি ফিরে আসবে এই ভরসায় আমি ছিপ নিয়ে বসে রইলাম।
বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল কিন্তু রাহুল ফিরল না। ততক্ষণে আমি একটা চারাপোনা ধরেছি এবং প্রবল উৎসাহে আবার নদীতে ছিপ ফেলেছি।
মাছ ধরার দিকে মনোযোগ দিয়ে মনে-মনে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। চোখ ছিল ফাতনার দিকে, কিন্তু মনে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল। রাহুল বা পিংকি যে ফিরে আসেনি সেটা যেমন খেয়াল ছিল না, তেমনই সূর্য যে জঙ্গলের মাথায় হেলে পড়েছে সেটাও নজর করিনি।
জঙ্গল থেকে হিংস্র ডাকগুলো কানে আসতেই আমার ঘোর কাটল। ডাকগুলো বেশ তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসছিল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। একটানে ছিপ তুলে নিলাম নদী থেকে। নাইলনের থলেটা হাতে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে যাব, অমনি পাথর হয়ে গেলাম।
কখন যেন ছ’টা বুনো কুকুর পেছন থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে। এতই চুপিসাড়ে ওরা কাজটা সেরেছে যে, আমি একটুও টের পাইনি। মনে হয়, ওরা আধপোড়া মড়ার খোঁজে নদী পেরিয়ে শ্মশানের দিকে এসে উঠেছিল। তারপর শিকারের খোঁজে নদীর পাড় ধরে হেঁটে এদিকটায় চলে এসেছে।
কয়েকটা ঢোল শিস দেওয়ার মতো শব্দ করছিল। আর কয়েকটা হিসহিস শব্দ করছিল। আবার কখনও-বা চাপা গর্জন।
ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। কিন্তু শরীরটা পুরো অবশ হয়ে পড়েনি। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করার জন্যে তৈরি হলাম। আমার হাতের অস্ত্র বলতে পলকা একটা ছিপ।
এগিয়ে আসা কুকুরটাকে ছিপের এক ঘা বসিয়ে দিলাম। ওটা ‘কেঁউ’ শব্দ করে দু-পা পিছিয়ে গেল বটে কিন্তু পাশ থেকে একটা কুকুর সাপের ছোবল মারার ঢঙে আমার ডানপায়ে এক কামড় বসিয়ে দিল।
সেদিকে ঘুরে তাকাতেই বাঁ-দিকে কোমরের কাছটায় একটা কামড় টের পেলাম। প্যান্টের মোটা কাপড় ফুটো করে ধারালো দাঁত বসে গেল শরীরে। আমি যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠলাম। ডান পা থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে মাটিতে। কোনদিক সামলাব আমি? আমাকে ঘিরে হিংস্র কুকুরগুলো যেন ব্যালে নাচছে। একবার ছুটে এসে এ কামড়ায় তো আর-একবার ও কামড় দেয়।
আমি ছিপটাকে এলোপাতাড়ি চালাতে লাগলাম, আর প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু শুকনো গলা দিয়ে যে-স্বর বেরিয়ে এল তা কারও কান পর্যন্ত পৌঁছনো সম্ভব নয়।
বুনো কুকুরগুলো আঁচড়ে-কামড়ে আমাকে ঘায়েল করে চলল। নদীর পাড়ে রক্ত ছিটিয়ে পড়তে লাগল এখানে-ওখানে। আমার মাথা টলে গেল। নিজের ভাঙা গলার চিৎকার শুনে মনে হচ্ছিল আমি নয়, অন্য কেউ চিৎকার করছে।
আর সহ্য করতে পারলাম না। অবশ হাত থেকে ছিপ খসে পড়ল। আমিও কাত হয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে। একটা কুকুর আমার বাঁ-পায়ের ডিম থেকে এক খাবলা মাংস তুলে নিল। মনে হল, আমার শরীরে কেউ একটা গরম লোহার শিক ঢুকিয়ে দিল।
ঠিক তখনই নদীর পাড় ধরে সে উঠে এল।
সর্বাঙ্গে কাদা-মাখা অন্ধকার রঙের এক বিশাল কুকুর। সে বিদ্যুতের মতো ছুটে এল শিকারি কুকুরগুলোর দিকে। হিংস্র চোয়াল আর ধারালো নখ দিয়ে ওদের শরীর ছিন্নভিন্ন করতে লাগল।
বাতাস লোম উড়তে লাগল। দাঁতে দাঁত লাগার খটাখট শব্দ শোনা গেল। সেইসঙ্গে ছোট-বড় গর্জন।
ছ’জন শত্রুর সঙ্গে একাই লড়তে লাগল সেই অন্ধকার কুকুর। একবার এর ওপর লাফিয়ে পড়ে তো আর-একবার ওর ওপর।
আমি অসাড় শরীরে শুয়ে-শুয়ে সেই আশ্চর্য লড়াই দেখতে লাগলাম। কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে জল এসে গেল।
তিনটে বুনো কুকুর পড়ে গেল মাটিতে। আর উঠতে পারল না। বাকি তিনটে প্রাণভয়ে ঝাঁপ দিল নদীতে। তখন দেখি আরও তিনটে বুনো কুকুর নদীর ওপারে এসে দাঁড়িয়েছে। বোধহয় সঙ্গীদের অবস্থা দেখে ওরা আর লড়াইয়ে সামিল হয়নি।
লড়াই শেষ হলে জিভ বের করে বড়-বড় শ্বাস ফেলতে লাগল কাদা-মাখা কুকুরটা। আমার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে থমকে দাঁড়াল, অদ্ভুতভাবে তাকাল।
আমি যেন মনে-মনে শুনতে পেলাম, ‘দ্যাখো প্রভু, আমি ওদের হারিয়ে দিয়েছি।’
