লোকটা আবার কাশল। পাতলা ধোঁয়াশা বেড়াচ্ছে চারদিকে। রোজই এইরকম থাকে। কেমন মেঘলা ঘোলাটে পরিবেশ।
খোকাবাবু, এই পাখি, মৌমাছি, সবই তোমাদের বিজ্ঞানীদের তৈরি। ওদের শরীরের কলকবজায় ঠিক যেরকম-যেরকম নির্দেশ দেওয়া আছে, ঠিক সেরকমভাবেই ওরা গুনগুন করে, শিস দেয়, উড়ে বেড়ায়। এই যে সব ফুল–এগুলো বিজ্ঞানীদের হিসেবমতো ফোটে আর ঝরে পড়ে। ফুলের গন্ধও তৈরি হয়েছে তোমাদের ল্যাবরেটরিতে। তারপর সেই নকল সুগন্ধি ভরে দেওয়া হয়েছে ফুলের ভেতরে। ওই যে গাছের ফল, ওগুলো তোমরা কি কখনও খেয়ে দেখেছ? দেখোনি নিশ্চয়ই!
না, মা-বাবা বারণ করেছেন। আমরা তো শুধু ভিটামিন খাই চামচে করে, আর কার্বোহাইড্রেট প্রোটিন মেশানো ফুড ট্যাবলেট।
হাসল বুড়ো। মাথা নাড়ল হতাশায়। লাঠিটা নামিয়ে রাখল পাশে। তারপর চিকুর পিঠে হাত রেখে বলল, খোকাবাবু, ওই ফল শুধু দেখবার জন্যে। আর নকল পাখিগুলো বিজ্ঞানীদের তৈরি করে দেওয়া রুটিনমাফিক ওই ফলগুলো মাঝে-মাঝে ঠোকরায়। এমনকী খাওয়ার ভানও করে। হায় রে! কী দিনকালই না এল!
বুড়ো আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখ তুলে ওপরে আকাশের দিকে তাকাল। ভুরুর ওপরে হাত রেখে নজর করে দেখতে চেষ্টা করল আকাশটা। ঘোলাটে মেঘলা আকাশে অনেক আলো জ্বলছে। শক্তিশালী আকাশ-প্রদীপের মতো সাদা উজ্জ্বল আলোক-পিণ্ডগুলো আকাশে ভাসছে। আলো ছড়াতে চেষ্টা করছে আবছায়া পৃথিবীর বুকে।
চিকুর দিকে তাকিয়ে বুড়ো প্রশ্ন করল, তুমি কোনওদিন সূর্য দেখেছ, খোকাবাবু? সূয্যিমামা?
না। মাথা নাড়ল চিকু। তবে সূর্যের কথা ও শুনেছে মা-বাবার কাছে। বছর কুড়ি আগেও নাকি সূর্য দেখা যেত পৃথিবীর আকাশে। পুবে উঠত, পশ্চিমে অস্ত যেত। দিন ছিল উজ্জ্বল আলোময়, রাত ছিল ঘন অন্ধকার। এখন দিন আর রাতের তফাত বেশ কমে এসেছে। পরিবেশ গাঢ় হয়ে, ঘন হয়ে, সূর্য ঢেকে গেছে। বুদ্ধিমান মানুষ এখন নতুন ধরনের আলোর উৎস তৈরি করেছে। হাউইয়ের মতো আলোক-পিণ্ড ছুঁড়ে দিয়েছে আকাশে। সেগুলো ভারী বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকে। আলো ছড়ায়। মাসখানেক পরে সেগুলোর জ্যোতি কমে আসে। নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। তখন নতুন-নতুন আলোক পিণ্ড ছুঁড়ে দেয় মানুষ। আবার আলো হয়।
বিশাল আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা কাপড়ের ঝোলা বের করল বুড়ো। ঝোলাতেও আলখাল্লার মতো রংবেরঙের অজস্র তালি। হাতড়ে হাতড়ে তার ভেতর থেকে একটা বিবর্ণ প্যাকেট বের করল। হলদেটে কাগজে মোড়া। কাগজ বেশ কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। চিকু আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিল। কঁপা হাতে প্যাকেট থেকে কয়েকটা রঙিন ফটো বের করল সে। বহুদিনের হাওয়ায় ফটোগুলোর রঙের জৌলুস অনেক ফিকে হয়ে গেছে। চিকুর বেশ কৌতূহল হল। এরকম ফটোগ্রাফের ব্যবহার আজকাল প্রায় নেই বললেই চলে। এখন শুধু মাইক্রোফিম, মাইক্রো-ভিডিয়ো, মাইক্রো টিভি ক্যামেরা–এসবের যুগ।
প্রথম ছবিটা চিকুকে দেখাল বুড়ো। সূর্য উঠছে পূর্ব দিক থেকে। লাল। গোল বলের মতো। আকাশে অল্প-অল্প মেঘ। মেঘের কিনারে লাল রেখা। একপাশে কিছু সবুজ গাছপালা। তার পাশ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে একপাল গরু নিয়ে যাচ্ছে একটি ছেলে। খালি গা। হাতে লিকলিকে খাটো বেত।
রাখাল ভোরবেলায় যাচ্ছে গরু চরাতে। বুড়ো বিড়বিড় করে বলল। চিকু ছবিটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। গরু শুধু ও মিউজিয়ামের ছবিতেই দেখেছে। গরু দেখতে সুন্দর নয় বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তাই তাঁরা নকল গরু তৈরি করে নকল তৃণভূমিতে নিশ্চয়ই রাখেননি। তা ছাড়া বইতেও পড়েছে, একসময়ে মানুষ গরুর দুধ খেত। গরু ছিল গৃহপালিত পশু। কিন্তু এখন তো ওসব খাদ্য বা পানীয় দূষিত। চিকু কখনও দুধ দেখেনি।
ছবিটা দেখতে-দেখতে ওর নাকে ধুলো উড়ে আসছিল। কী সুন্দর!
তারপর দ্বিতীয় ছবিটা দেখাল বুড়ো। কুলকুল করে বয়ে যাওয়া নদী। নদীর বুকে কালো ছায়ার মতো নৌকো ভেসে যাচ্ছে। ওপারে অস্ত যাচ্ছে টকটকে লাল সূর্য। আকাশে নানা রঙের মেঘ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভাসছে। অপূর্ব!
নদীর তীরে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আবার বিড়বিড় করল বুড়ো। তারপর বাকি ছবিগুলোও একে-একে দেখাল সে। ছেলেমেয়েরা পার্কে ছুটোছুটি করে খেলা করছে। বাগানে রংবেরঙের ফুলের উৎসব! দীপাবলির আলোকসজ্জা। কত চিত্র-বিচিত্র পাখি…।
ছবিগুলো দেখানো শেষ হলে সেগুলো আবার প্যাকেটে ভরে রাখতে লাগল বুড়ো। বলল, এখন সূর্যও নেই, আর এসব কিছুও নেই, খোকাবাবু। আরও অনেক ফটো ছিল আমার কাছে…নষ্ট হয়ে গেছে। এই বুড়ো শরীরে পালিয়ে বেড়ানো কি কম ধকলের কাজ! খকখক করে কাশতে শুরু করল সে। কিছুক্ষণ পর কাশি থামলে জড়ানো গলায় বলল, এই নোংরা বাতাসে আমি শ্বাস নিতে পারি না। চারদিকে সব কেমন ধোঁয়াটে মেঘলা। অক্সিজেন কত কমে গেছে। চারদিকে শুধু বিষ বাতাস। কথা আটকে গিয়ে বুড়ো আবার কাশতে লাগল।
শ্বাস নিতে চিকুর কোনওরকম কষ্ট হচ্ছিল না। ও জানে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এখন অক্সিজেন শতকরা আট ভাগ। বাকি অংশে নাইট্রোজেন ছাড়াও রয়েছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড। গত পঞ্চাশ বছরে ক্ষতিকর গ্যাসগুলো পরিমাণে অনেক বেড়ে গেছে। কলকারখানা-যানবাহনের ধোঁয়া বিপদসীমা ছাড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর আবহাওয়াই গেছে পালটে। সূর্য ঢাকা পড়ে গেছে। আকাশ-বাতাস মেঘলা, ঘোলাটে। সেইজন্যেই কি আসল পশু-পাখিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে? মরে গেছে আসল ফুল, ফল, গাছ? তাই যদি হয়, তা হলে মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে রইল কেমন করে! সবকিছুই কেমন দুর্বোধ্য আর রহস্যময় ঠেকছিল চিকুর কাছে। ওর কোনও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে না, অথচ এই বুড়ো মানুষটার কাশতে কাশতে প্রাণ বেরুবার জোগাড়।
