সেই কথাই ও জিগ্যেস করল লোকটাকে।
লোকটা কাশি থামিয়ে আলখাল্লার হাতায় মুখ মুছছিল। বারদুয়েক গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, আমি পুরোনো দিনের মানুষ, খোকাবাবু। জানি না, আমার মতো আর কজন এখনও লুকিয়ে চুরিয়ে প্রাণে বেঁচে আছে। আর তোমরা হলে গিয়ে নতুন বিজ্ঞানের যুগের নতুন জাতের মানুষ। তোমাদের কাছে এই নোংরা বিষ-বাতাসই প্রিয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বুড়ো। তারপর ঝোলার ভেতরে হাতড়ে হাতড়ে কী যেন খুঁজতে লাগল। আপনমনেই নীচু গলায় বলল, বাতাস পরিষ্কার করতে আমরা বহু চেষ্টা করেছিলাম গো, খোকাবাবু। পরিষ্কারও হয়েছিল। ফলে মানুষের আয়ু গিয়েছিল বেড়ে।
চিকুর দিকে তাকাল সে ও এই আমাকেই দ্যাখো না। কত বুড়োটি হয়েও বেঁচে আছি। যাই হোক…তারপর যুদ্ধ বাধল। ভয়ানক যুদ্ধ। বাতাসে বিষ ছড়িয়ে পড়তে লাগল দিনের পর দিন। মানুষ বিষে মরতে লাগল। বাতাস পরিষ্কার করার চেষ্টাও গেল থেমে। কলকারখানা, গাড়িঘোড়ার ধোঁয়া আকাশে-বাতাসে জমতে লাগল। ওঃ, সে কি আজকের কথা! আমরা কিছু মানুষ গোপন জায়গায় অক্সিজেন সঞ্চয় করে বেঁচে রইলাম। দূষিত বাতাস পরিষ্কার করার জন্যে লড়াই করে চললাম গোপনে। কিন্তু পারলাম না। বাতাস আরও বিষিয়ে যেতে লাগল, আমরাও বুড়ো হয়ে গেলাম ধীরে-ধীরে, আর অক্সিজেনও এল ফুরিয়ে। তখন নিরুপায় হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম মাঠে-ঘাটে-পথে দূষিত পরিবেশে। একইসঙ্গে চালিয়ে যেতে লাগলাম বাঁচার লড়াই।
বুড়ো আবার কাশতে শুরু করল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় লাঠিটা আঁকড়ে ধরতে গেল। চিকুর কেমন ভয়-ভয় করছিল। কী করবে, কী করা উচিত, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। এমনসময় দূর থেকে ওর নাম ধরে কেউ ডাকল, চিকুউ!
ও চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বুড়োকে বলল, যাচ্ছি। মা ডাকছেন।
আমার কথা কাউকে বোলো না, খোকাবাবু। তুমি বরং কাল আবার এসো। তোমাকে পুরোনো দিনের অনেক গল্প শোনাব, কেমন! কী করে ফুল ফুটত, পাখি ডাকত, মৌমাছি মধু খেতসব।
আচ্ছা, আসব। বলে গোলাপ বাগানের মধ্যে দিয়ে বাড়ি লক্ষ করে ছুটে চলল চিকু। ওর নাকে ফুলের সুগন্ধ ভেসে আসছিল। শুনতে পাচ্ছিল গাছের ডালে বসে পাখি ডাকছে সুরেলা গলায়। চিকু ছুটতে ছুটতেই মনে-মনে বলল, নকল গন্ধ। নকল পাখি। বিচ্ছিরি।
বুড়োর দেখানো বিবর্ণ ফটোগ্রাফের ছবিগুলো ওর মনে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠছিল বারবার।
কম্পিউটার শিক্ষকের সামনে বসে লেখাপড়া করছিল চিকু। কিন্তু বারেবারেই ও আনমনা হয়ে পড়ছিল আর কম্পিউটার শিক্ষকের ধমক টেলিভিশন পরদায় ফুটে উঠছিল, তুমি অমনোযোগী হয়ে পড়ছ। তোমার নম্বর কাটা যাচ্ছে।
প্রতিদিন লেখাপড়ার জন্যে আলাদা নম্বর আছে। সারাদিন পড়াশোনার শেষে বাবা কিংবা মা কম্পিউটারের বোতাম টিপলেই নম্বর ফুটে ওঠে পরদায়, তাতে অন্যমনস্কতার জন্য কত নম্বর কাটা গেছে তাও লেখা থাকে। সেটা দেখলেই মা-বাবা বকাবকি করবেন।
চিকুর একটুও ভালো লাগছিল না। তবুও কোনওরকমে পড়া শেষ করে মা-র কাছে গেল। বলল, মা, মা, জানো, আমাদের বাগানের পাখিগুলো সব নকল বিজ্ঞানীদের তৈরি।
মা মাইক্রো-টিভি হাতে নিয়ে খবর শুনছিলেন, হাত থেকে টিভি পড়ে গেল। অবাক চোখে ছেলের দিকে তাকালেন।
চিকু এক নিশ্বাসে বলে গেল পুরোনো দিনের কথা। আসল ফুলের কথা, আসল পাখির কথা, আসল মৌমাছির কথা। একদিন সূর্য ছিল আকাশে। দিনে থাকত উজ্জ্বল আলো, আর রাতে গাঢ় অন্ধকার।
মা কাছে এগিয়ে এলেন। হাঁটুগেড়ে বসে পড়লেন ছেলের সামনে। ওর দুধে হাত রাখলেন, তুই এসব কার কাছে শুনেছিস?
চিকু হঠাৎ যেন একটা ধাক্কা খেল। মনে পড়ল, বুড়ো লোকটা ওকে বারবার করে বারণ করেছিল, তার কথা কাউকে না বলতে। বললে সাঙ্ঘাতিক বিপদ হবে।
সুতরাং মা-র কথার জবাব না দিয়ে চিকু বলল, বলো না মা, এসব সত্যি?
মা-র কপালে ভাঁজ পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর বললেন, সব সত্যি। কিন্তু কে তোকে এসব কথা বলল! তোর বাবা জানতে পারলে…।
বাবা ঘরে ছিলেন না। অফিসে গেছেন। অফিস বলতে বাড়ির লাগোয়া একটা ছোট ঘর। সেখানে নানারকম সব কম্পিউটার বসানো আছে। আর আছে চার-চারটে রঙিন টিভি। বাবা রোজ সেই ঘরে যান। সারাদিন বসে-বসে শুধু ছোট-বড় বোতাম টেপেন। টিভির পরদা খুঁটিয়ে লক্ষ করেন। কম্পিউটার থেকে যেসব ছাপা কাগজ বেরিয়ে আসে সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েন। বাবা বলেন, সারা দেশ জুড়েই নাকি এরকম শক্তিশালী কম্পিউটার যোগাযোগ রয়েছে। দেশের প্রতিটি কোণের গোপন খবরাখবর আদানপ্রদান হয় হাজার-হাজার কম্পিউটারের মাধ্যমে।
তোর বাবা জানতে পারলে ভীষণ রাগ করবেন। এসব কথা তোর বাবাকে বলিস না যেন। মা অবাক চোখে ছেলেকে দেখছিলেন। চিকু যেন কোনও স্বপ্নের দেশে মগ্ন হয়ে গেছে। ওকে বুকে টেনে নিয়ে মা বললেন, তুই খুব সাবধানে থাকিস। তোর জন্যে আমার ভয় করছে।
চিকু মা-র ভয়ের কারণ বুঝতে পারল না। ও শুধু বিস্ময়ে ভাবছিল, সমস্ত নকল জিনিসের মধ্যে থেকেও মা-বাবা কেমন নিশ্চিন্ত হাসিখুশি রয়েছেন। অথচ এই ভয়ংকর রহস্যটা ফাঁস হয়ে যেতেই চিকুর বুকের ভেতরে কষ্ট হচ্ছে।
সেদিন রাতে নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে চিকু শুনতে পেল বাবা-মা চাপা গলায় কথা বলছেন। কী কথা তা স্পষ্ট না বুঝতে পারলেও চিকুর আন্দাজে মনে হল আলোচনাটা ওকে নিয়েই।
