বিলটু ওপার থেকে তাকাল আমার দিকে। ওর সারা গা ক্ষতবিক্ষত। কাঁধ আর গলার কাছ থেকে মাংস খুবলে নিয়েছে বুনো কুকুরের দল। শরীরের নানা জায়গায় লেপটে আছে রক্তের দাগ। ও জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে, ধুঁকছে।
ওই ক্লান্ত অবস্থাতেই আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে বিলটু ঘেউঘেউ করে উঠল। মনে হল, ও যেন বলছে, ‘দ্যাখো প্রভু, আমি ওদের হারিয়ে দিয়েছি।’
ওর দিকে তাকিয়ে আমার চোখে জল এসে গেল। আমি আকুল হয়ে ওকে এপারে আসার জন্যে ডাকতে লাগলাম।
আমার কথা বিলটু বোধহয় বুঝতে পারল। ও নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে চলে এল এপারে। কিন্তু তারপর আমার কাছে না এসে ও চলে গেল বউনির কিনারায় এক কাদার গর্তে। সেখানে থকথকে কাদার ওপরে শুয়ে পড়ে প্রাণভরে গড়াগাড়ি খেতে লাগল।
গ্রামের বয়স্ক মানুষদের মুখে বহুবার শুনেছি এই কাদার নাকি এক অদ্ভুত গুণ আছে। এই কাদা গায়ে মেখে নিলে কাটাছেঁড়া, ঘা, এসব নাকি চট করে সেরে যায়। জঙ্গলে যারা কাঠ কাটতে যায় বা নদীতে যেসব জেলেরা মাছ ধরে তারা কেটে-ছড়ে গেলে এই কাদা গায়ে লেপে নেয়। পোষা গরু-মোষ-ছাগলের জন্যেও তারা এই ‘ওষুধ’ ব্যবহার করে।
কিন্তু বিলটু কী করে এই কাদার গুণের কথা জেনেছিল তা বলতে পারব না। তবে কাদায় লুটোপুটি খেয়ে সর্বাঙ্গে কাদা মেখে যখন ও খোঁড়াতে-খোঁড়াতে আমার কাছে এসে দাঁড়াল, তখন ওর অদ্ভুত চেহারা দেখে আমি আঁতকে উঠলাম।
ওর কপাল থেকে গলা পর্যন্ত এক লম্বা গভীর ক্ষতচিহ্ন। বুনো কুকুরের নখের টানে বাঁ-দিনের চোখটা কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে। নাকের পাশে মাংস ফাঁক হয়ে গেছে। চোয়ালের নীচে নরম মাংস ফালা-ফালা হয়ে ঝুলছে।
আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। হাঁটুগেড়ে বসে কাদা-মাখা বিলটুকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর চিৎকার করে লোকজনকে ডাকতে লাগলাম।
বিলটু আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ‘কুঁইকুঁই’ করে চাপা আওয়াজ করতে লাগল।
তারপর আমার আর ভালো করে কিছু মনে নেই। পরে জেনেছি, আমার চিৎকার শুনে দু-চারজন চাষি ছুটে এসেছিল। ওরাই আমাকে আর বিলটুকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
না, ওই কাদা বিলটুকে বাঁচাতে পারেনি। আটদিন কষ্ট পাওয়ার পর বিলটু মারা যায়। ওর গায়ের কাটা জায়গাগুলো পেকে ঘা হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে পচা দুর্গন্ধ বেরোতে শুরু করেছিল।
আমি আর তোদের মা—মানে, তোর বড়মাসি—বিলটুকে ওই বউনি নদীর পাড়েই কবর দিয়ে এসেছিলাম।
তারপর থেকে বউনির তীরে মাছ ধরতে গেলে আমার মনে কষ্ট হয়। কিন্তু একইসঙ্গে মনে হয়, এই বুঝি বিলটুকে দেখতে পাব। আমার ধরা ছটফটে মাছ দেখে ও লেজ নাড়তে-নাড়তে খুশিতে ছুটোছুটি করবে। একবার মাছটার কাছে ছুটে আসবে, আর একবার দূরে ছুটে যাবে।
ওর কথা ভাবি বলেই বউনিতে মাছ ধরার অভ্যেসটা ছাড়তে পারিনি।
বড়মেসোর গল্পটা শুনেছিলাম। প্রথমবারে বড়কদমগাছিতে গিয়ে। শুনে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। রাহুল আর পিংকিও খুব দুঃখ পেয়েছিল গল্পটা শুনে। ওরা বড়মেসোর কাছে আবদার করল সেই জায়গাটা দেখতে যাবে—যেখানে বিলটু শেষ লড়াই করেছিল। আর একইসঙ্গে ওই কাদার গর্ত আর বিলটুর কবর দেখবে।
বড়মেসো উদাস গলায় বললেন, ‘চল, কালই চল। তবে সব কী আর আগের মতন আছে রে!’
পরদিন দুপুরে আমরা তিনজনে বড়মেসোর সঙ্গী হলাম নদীর পাড় ধরে হেঁটে-হেঁটে মেসো জায়গাগুলো আমাদের দেখতে লাগলেন। বিলটুর কবরের কাছে দাঁড়িয়ে আমি কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার জানালাম। যদিও মনে হল, এরকম একজন ‘বীর’কে সেলাম জানালেই বোধহয় বেশি মানানসই হত।
কাদার গর্তটাও দেখলাম আমরা। মেসোর কাছেই শুনলাম, জোয়ারের সময় জল জমে গিয়ে এই গর্তটায় কাদা হয়। শীতকালে সেখানে নেমে গাঁয়ের বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েরা কাদা ঘেঁটে ল্যাটা মাছ, গেঁড়ি, গুগলি, শামুক—এসব খুঁজে বেড়ায়। এখনও নজরে পড়ল তিনটে ছেলে কাদা হাতড়ে-হাতড়ে সেই কাজ চালাচ্ছে। একজনের গায়ে তো বুক পর্যন্ত কাদার ছোপ। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয়, কাদা রঙের জামা-প্যান্ট পরেছে।
মেসোর সঙ্গে বেশ ক’দিন মাছ ধরতে গিয়ে আমার মধ্যে মাছ ধরার নেশাটা চারিয়ে গেল। মাছ ধরার প্রথমদিন ওরকম একটা বীভৎস দৃশ্যের সাক্ষী হলেও বিলটুর ব্যাপারটা আমাকে কী করে যেন বউনি নদীর দিকে টেনেছিল। তা ছাড়া মেসোর বলা কথাগুলো ‘দারুণ পজিটিভ নেশা’, ‘কনসেনট্রেশান বৃদ্ধি পায়’ আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল।
অনেকসময় মেসো না গেলেও আমি রাহুল কিংবা পিংকি—অথবা দুজনকেই সঙ্গী করে ছিপ-বঁড়শি নিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে বসতাম।
মাছ ধরতে বসে ফাতনার দিকে নজর থাকলেও আমার চোখ মাঝে-মাঝেই ছিটকে যেত জঙ্গলের দিকে। যদি কখনও একটা বুনো কুকুরের ছায়াও দেখি তা হলে সঙ্গে-সঙ্গে ছিপ-টিপ নিয়ে ছুট লাগাব বাড়ির দিকে।
পিংকিটা ছিল রামভিতু। সবসময় রাহুল কিংবা আমার জামা খামচে ধরে বসে থাকত। তবে মাছ ধরার ব্যাপারটা দেখার লোভ ও কিছুতেই ছাড়তে পারত না।
রাহুল তুলনায় বেশ সাহসী। ও আত্মরক্ষার জন্যে একটা পেয়ারা কাঠের গুলতি আর পোড়ামাটির গুলি সবসময় পকেটে রাখত। আমি ছিপ নিয়ে বসলে ও গুলতি বাগিয়ে বসত। আর কখনও যদি ও ছিপ হাতে নিত তা হলে আমাকে পাহারাদারের ভূমিকায় বসাত।
