তা হলে কী আছে ওই বাক্সে? সুমন আগ্রহের চোখে তাকাল বাবার মুখের দিকে।
আমি জানি না। সময় হলে চাবিটা তোকে দেব। তখন তুই নিজেই খুলে দেখিস।
সুমন তখন খুশির গলায় বলল, নিশ্চয়ই খুব প্রিয় আর দামি জিনিস আছে, না বাবা? তাই তো রাখার নিয়ম ছিল ওই বাক্সে?
উদাস স্বরে বাবা বললেন, হবে হয়তো।
এরপর আরও বড় হয়ে উঠতে লাগল সুমন। ক্লাসের পর ক্লাস ডিঙিয়ে উঠতে লাগল ওপরে। আর একইসঙ্গে মা-কে স্বপ্নে দেখতে শুরু করল–প্রায়ই। তখন একদিন রাতে খেতে বসে হঠাৎই স্বপ্নের কথাটা বাবাকে বলল ও।
বাবা খাওয়া থামিয়ে তাকালেন। বললেন তোর মা তোকে ভীষণ ভালোবাসত। তোকে ছেড়ে মোটেই যেতে চায়নি। কিন্তু কঠিন অসুখ..রাখা গেল না। সেইজন্যেই বোধহয় স্বপ্নে অমন ফিরে ফিরে আসে। তোকে নিয়ে অনেক আশা ছিল তো।
সুমনের মনটা ব্যথায় মুচড়ে উঠল। বাবা অনেকদিন রিটায়ার করেছেন স্কুলের চাকরি থেকে। চোখে ভালো দেখতে পান না, তাই সময়ের আগেই রিটায়ার করতে হয়েছে। সারাদিন বাড়িতে থেকে সব কাজ করেন আর সময় করে সুমনের পড়া দেখিয়ে দেন রোজ। সুমনের লেখাপড়া যে কত কষ্টে চলে তা ও খুব ভালোভাবেই জানে। মায়ের অভাব বাবা যে বুঝতে দিতে চান না।
এই বছর ক্লাস টেন-এ উঠে সুমন আর থাকতে পারেনি। বাবাকে গিয়ে বলেছে, বাবা, আমার বয়েস এখনও পনেরো হয়নি?
দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো ক্যালেন্ডারের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন বাবা। চোখ কুঁচকে তারিখ দেখে বলেছেন, এখনও প্রায় ছমাস বাকি রে।
ওর জন্মদিন কবে সুমন জানে না। বাড়িতে ওর জন্মদিনের উৎসব কিছু হয় না। হয়তো সেই উৎসব শুরু হবে ওর পনেরো বছর পূর্ণ হওয়ার পর–যেদিন খোলা হবে ওই চন্দনকাঠের বাক্স। সুমন সেদিন জিগ্যেস করেছে বাবাকে, আমার জন্মদিন কবে, বাবা?
সাতই জুলাই।
উত্তর শুনে সুমনের মনটা একটু দমে গেছে। তবু ভেবেছে, আর তো মাত্র ছটা মাস। দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
.
আজ সেই দিন এসেছে। ছয় জুলাই। সুমন যেন সুস্থির হয়ে কোনও কাজ করতে পারছে না। স্নান-পড়া-খাওয়া সবকিছুতেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। বাবা সবকিছু লক্ষ করলেও, নিজের কাজ নিয়মমতো করে গেছেন। মনের বিচলিত ভাব বুঝতে দেননি।
আনমনা হয়ে স্কুল থেকে ফিরে এল সুমন। চুপচাপ বসে রইল বাড়িতে। ইশ, আর একটা মাত্র দিন। তারপরই ওর পনেরো বছর পূর্ণ হবে! ও জানতে পারবে ওই চন্দনকাঠের বাক্সে মা ওর জন্য কী অমূল্য জিনিস রেখে গেছেন। আজকের রাতটা পেরোলেই।
রাতে স্বপ্নে মা আবার এলেন। যেন হাসিমুখে আশীর্বাদ করলেন সুমনকে, অনেক বড় হ, খোকা। তোর বাবা যে তোর মুখ চেয়ে আছে। তারপর ধূপের ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ও যেন দেখল, একটা ছোট্ট চাবি কোথা থেকে এসে গেছে ওর হাতে। সুমন ধীরে-ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বাক্সটার দিকে। ওটা খুলে এবার দেখবে ও। অপেক্ষা শেষ হবে।
এমন সময় ঘুমটা ভেঙে গেল সুমনের। বাবা ওকে ডাকছেন, সুমন, ওঠ, ভোর হয়ে গেছে।
ঘুম-চোখ মেলে তাকাল সুমন। পুবের আকাশ সবে ফরসা হয়ে এসেছে। কাকটা এখনও আসেনি ওর ঘুম ভাঙাতে। ও ধীরে-ধীরে উঠে পড়ল। বাবা বললেন, যা, স্নান করে আয়। নতুন জামা-প্যান্ট বের করে রাখছি, এসে পরবি। আজ যে তোর জন্মদিন!
আঙুল দিয়ে চোখ ঘষে ও বলল, আমার বয়স আজ পনেরো পুরো হল, তাই না, বাবা?
হ্যাঁ। এখন যা, চটপট স্নান সেরে নে।
নতুন জামা-প্যান্ট বাবা কবে কখন কিনে এনেছেন সুমন টের পায়নি।
স্নান করে এসে দেখল ঘরের গোটা ছবিটাই পালটে গেছে। সারা ঘরময় ঘন ধূপের গন্ধ, মিষ্টি ধোঁয়া। এক ঝক নয়নতারা ফুলের মালা মায়ের গলায় পরানো। চন্দনের ফোঁটা আর সিঁদুরের টিপ দিয়ে কত দরদ দিয়ে বাবা সাজিয়েছেন মা-কে। আর একটা ছোট্ট পিতলের চাবি রাখা হয়েছে টুলের ওপর–চন্দনকাঠের বাক্সটার ঠিক সামনে।
নতুন পোশাকে বাবার হাত ধরে মায়ের ছবির সামনে এসে দাঁড়াল সুমন। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বাবা ভারী গলায় বললেন, তোমার চলে যাওয়ার দুঃখ সইতে না পেরে সব ছবি আমি নষ্ট করে ফেলেছিলাম। শুধু এইটা পারিনি খোকার মুখ চেয়ে। তা হলে ও যে আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করত না।
বাবার চোখে জল এসে গেছে। শীর্ণ গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুরেখা। সুমনের মাথায় হাত রেখে মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন, তোমার কথামতো আজ এই বাক্সের চাবি আমি তুলে দিচ্ছি খোকার হাতে। তোমার প্রিয় দামি জিনিস তুমি নিজের হাতে ওকে দাও। সুমনের দিকে ফিরে বাবা বললেন, বাক্স খোল। দ্যাখ, তোর মা তোর জন্যে কী রেখে গেছে।
সুমনের হাত-পা কাঁপছে। বুক দুরুদুরু। গায়ে যেন কাটা দিচ্ছে। ধীরে-ধীরে হাত বাড়িয়ে চাবিটা তুলে নিল ও। হাতজোড় করে নমস্কার করল–কে। তারপর গুপ্তধনের সিন্দুক খোলার মতো রোমাঞ্চ অনুভব করে বাক্সের তালা খুলে ফেলল।
ধূপের ঘন ধোঁয়া সরে গিয়ে দৃষ্টি পরিষ্কার হল। ও দেখল, সেই বাক্সের ভেতরে নীল মখমলের ওপর একটা বিবর্ণ হলুদ কাগজ। কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিল সুমন। তারপর ধীরে-ধীরে ভাঁজ খুলল। কিছু কাগজের টুকরো ভেঙে ঝরে গেল মেঝেতে। অতি সাবধানে কাগজটা মেলে ধরতে বিবর্ণ তামাটে লেখাগুলো নজরে পড়ল সুমনের। সুন্দর অক্ষরগুলো যেন কোনও শিল্পীর হাতে আঁকা। তেরো বছরেও ওদের সৌন্দর্য এতটুকু নষ্ট হয়নি। সুমনকে লেখা ওর মায়ের চিঠি! এক ও একমাত্র চিঠি! এটা নিঃসন্দেহে সুমনের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। সবচেয়ে দামি।
