রং-ওঠা নীলচে-সাদা দেওয়ালে ছবিটা টাঙানো রয়েছে। একদিন হয়তো ছবির সবকটা রং উজ্জ্বল ছিল। কারুকাজ করা ফ্রেমের রং ছিল ঝকঝকে সোনার মতো। কিন্তু আজ, সময়ের স্রোতে, কারুকাজ করা ফ্রেম মলিন হয়ে গেছে। ছবির রং হয়ে এসেছে ফ্যাকাসে। তা সত্ত্বেও সুমন যেন রোজ ছবিটাকে নতুনের মতোই দেখতে পায়। জ্ঞান হওয়া থেকেই ও একইরকম দেখে আসছে। স্বপ্নে ঠিক যেরকমটা দেখে।
ছবির কাচটা বাবা রোজ ঘষে ঘষে পরিষ্কার করেন। দুটো চন্দন-ধূপ জ্বেলে গুঁজে দেন ফ্রেমের কোণে। আর নয়নতারা ফুলের মালা গেঁথে পরিয়ে দেন। এই ফুল আসে ওদের সদর দরজার পাশে রাখা দুটো টবের নয়নতারা গাছ থেকে। বাবার মুখে সুমন শুনেছে, মা নাকি এই ফুল খুব পছন্দ করতেন। পছন্দের একটা কারণ সুমন বাবার কাছ থেকে জেনেছে ও মায়ের নামের সঙ্গে এই ফুলের নামের মিল আছে।
ছবির নীচেই লেখা মায়ের নাম : শ্ৰীমতী নয়নকণা রায়। এই নামটা রোজই মনে-মনে গুনগুন করে সুমন। কী সুন্দর নাম! নাম থেকে শুরু করে ছবির প্রতিটি অংশ ওর ভীষণ ভালো লাগে। ইশ, মা যদি বেঁচে থাকতেন। ভাবে সুমন। ওর দু-বছর বয়েসে মা মারা গেছেন। বাবাই বলেছেন। তা হলে মায়ের সত্যিকারের মুখটা কেন সুমনের মনে পড়ে না! ভাবতে গেলেই কেন এই ছবির মুখটা খালি ভেসে ওঠে! বাবাকে প্রশ্ন করলে বাবা হেসে বলেন, দু-বছর বয়েসের কথা কি কারও মনে থাকে রে! তবে তোর মা হুবহু এই ছবিটার মতো ছিল।
বাড়িতে মায়ের আর কোনও ছবি নেই। বাবার কাছেও না। এর কারণ বাবাকে জিগ্যেস করলে বাবা উত্তর দেন না। চুপ করে থাকেন।
ধূপের ভারী ধোঁয়ায় গভীর করে শ্বাস নিল সুমন। ছবির দিকে তাকিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এল। হাত জোড় করে চোখ বুজল ও। তারপর চোখ খুলে ধীরে-ধীরে তাকাল ছবির ঠিক নীচে একটা টুলের ওপরে রাখা জিনিসটার দিকে।
খুব সুন্দর কারুকাজ করা একাট ছোট্ট চন্দনকাঠের বাক্স।
বাক্সটা সেই ছোটবেলা থেকে এই একই জায়গায় দেখে আসছে সুমন। ডালা বন্ধ। তাতে ছোট্ট একটা তালা লাগানো। কৌতূহল ওর প্রথম দিনই হয়েছিল। ফলে বাবাকে সোজা গিয়ে জিগ্যেস করেছিল, বাবা, ওই ছোট্ট বাক্সটায় কী আছে?
তখন সুমন ক্লাস থ্রি-তে পড়ত। ওর বড়সড়ো চোখের দিকে তাকিয়ে বাবা বলেছিলেন, আগে বড় হও, তারপর জানতে পারবে।
অবাক হলেও আর কিছু বলেনি ও। তবে সুমন মাঝে-মাঝে মায়ের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেছে, মা, মা-মণি, এই বাক্সটায় কী আছে?
মায়ের ছবি কোনও উত্তর দেয়নি। শুধু হেসেছে।
বুকের ভেতর কৌতূহল নিয়ে আরও তিন বছর কাটিয়ে দিয়েছে সুমন। তারপর আর থাকতে পারেনি। একদিন তালাটা ধরে চুপিচুপি টেনে দেখেছে। না, খোলেনি ছোট্ট তালাটা। তখন বাবাকে গিয়ে বলেছে, বাবা, এবার বলো। এখন আমি তো বড় হয়েছি।
বাবা বিছানায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ঘুরে তাকিয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে ভালো করে দেখলেন সুমনকে। ক্লাস সিক্সের ছেলেটা ঘাড় বাঁকিয়ে সামান্য জেদি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। হাতের কাগজটা নামিয়ে রেখে বাবা ওকে ডাকলেন কাছে। বললেন, আয়, এখানে আয়।
সুমন ধীরে-ধীরে কাছে গেল। বসল বাবার পাশে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বাবা বললেন, খোকা, তুই তো আমার সব। এ-সংসারে আমার আর কেউ নেই।
বাবা কেমন যেন উদাস হয়ে গেলেন। শীর্ণ হাতে ওকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে রূপকথার মতো করে শোনালেন ওই বাক্সের গল্প।
তোর মা বিয়ের সময় পেয়েছিল ওই চন্দনকাঠের বাক্সটা–তোর দিদিমার কাছ থেকে। ওঁদের পরিবারের রীতি ছিল, সবচেয়ে প্রিয় আর দামি জিনিসই ওই বাক্সে রাখা হবে। বিয়ের পর তোর মা সমস্ত গয়নাগাটি রেখেছিল ওই বাক্সে। আমি তখন ইস্কুলে মাস্টারি করি। এরপর তোর জন্ম হল। বেশ কিছুদিন হইহই করে খুশিতে কাটল। তারপরই এক ভয়ংকর ঘটনা বোবা করে দিল আমাকে। তোর মা পেটে ব্যথা নিয়ে ভরতি হল হাসপাতালে। পরীক্ষা করে ডাক্তার বলল, অপারেশান করা দরকার। অপারেশান করতে গিয়ে দেখা গেল পেটের ভেতরটা ক্যানসারে শেষ হয়ে গেছে। ডাক্তার বলল, কোনও আশা নেই। এভাবেই যতদিন বাঁচে। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম রে তোর মা-কে বাঁচাতে, কিন্তু পারিনি। তোর মা বুঝতে পেরেছিল যে, তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। তাই একদিন তোকে দেখতে চেয়েছে, বলেছে, সুমনকে নিয়ে এসো। আর চন্দনকাঠের বাক্সটাও নিয়ে আসবে, দরকার আছে…।
বাবা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। হয়তো বৃষ্টি হবে। সুমনের পিঠে হাত রেখে বাবা বললেন, অবাক হলেও তোর মায়ের অনুরোধ আমি রেখেছিলাম। তোকে কোলে নিয়ে শেষ দেখা দেখতে গেলাম তাকে। আমাকে লুকিয়ে বাক্সটা নিয়ে কী যেন করল তোর মা। তারপর সেটা নিয়ে আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, এটা রেখে দাও। আর, এই নাও চাবি। সুমনের যেদিন পনেরো বছর পূর্ণ হবে, সেদিন চাবিটা দেবে ওর হাতে। তার আগে নয়। তুমি কথা দাও আমাকে।
মন্ত্রমুগ্ধ সুমনের মাথায় হাত বুলিয়ে সুমনের বাবা বললেন, আমি কথা দিয়েছিলাম রে…
সুমন আন্দাজ করে বলল, বাক্সে কি তা হলে গয়না আছে?
দুঃখের হাসি হেসে বাবা বললেন, না রে, বোকা। সেগুলো তোর মা আলাদা করে আমার কাছে দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, তোর লেখাপড়ার জন্যে,তোকে মানুষ করার জন্যে সেগুলো যেন আমি কাজে লাগাই।
