বেড়ালটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে জ্বলন্ত উনুনের দিকে তাকালাম।
বেড়ালটাকে মেরে ফেলতে কোনও কষ্ট হয়নি।
ওটাকে তুলে নিয়ে গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে উনুনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। তার পর–একদম আলতো করে ওটাকে বসিয়ে দিলাম উনুনের গনগনে আঁচে। সঙ্গে-সঙ্গে বেড়ালটা লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল, কিন্তু ভারী সাঁড়াশিটা দিয়ে ওটাকে চেপে ধরলাম গরম কয়লার সঙ্গে। পোড়া লোমের কটু গন্ধে ঘর ভরে গেল। মাঝে-মাঝে গরম কয়লাগুলো ফটফট শব্দে ফাটতে লাগল।
আরও কিছু কয়লা এনে উনুনে চাপিয়ে দিলাম, বেড়ালটার দগ্ধ হাড়-মাংসের ওপরে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘরে নাচতে শুরু করল।
কুকুরটা আর কখনও কাউকে বিরক্ত করবে না। ওটা দিনভর উঠোনে-বাড়িতে বেড়ালটাকে তাড়া করে বেড়াত, ঘেউঘেউ করত বিচিত্র সুরে। অবশেষে বেড়ালটা গাছ বেয়ে উঠে পড়ত, হয়তো লাফিয়ে পড়ত পাশের বাড়ির ছাদে বাঁচার জন্যে।
কুকুরটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে রঙের টিনটার দিকে তাকালাম।
কুকুরটাকে মেরে ফেলতে কোনও কষ্ট হয়নি।
তবে কুকুরটা বেড়ালটার চেয়েও বেশি ধস্তাধস্তি করেছিল। কারণ, ওটার কখনও কোলে চড়া অভ্যেস ছিল না। ওটাকে কোলে তুলে এক হাতে চেপে ধরে অন্য হাতে রঙের টিনটা তুলে নিতেই বড়-বড় আকুতি ভরা চোখে সে আমার দিকে তাকাল। আধ টিন ঘন নীল রং ঢেলে দিলাম কুকুরটার চোখে-মুখে। ওটা বিচিত্র শব্দ করে বমি করল, পা ছুঁড়তে লাগল বীভৎসভাবে। ওটাকে চেপে ধরে রাখতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু উপায় কী! বাকি আধ টিন রং তো ঢালতে হবে!
বমি মেশানো আঠালো নীল রং গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে, আমার গায়ে। অবশেষে ওটা মারা গেল। ওকে ছেড়ে দিতেই নীল রং মাখা ছোট্ট দেহটা শব্দ করে পড়ে গেল মেঝেতে।
কুকুরটার জন্যে আমার বউ খুব দুঃখ পাবে–সেইসঙ্গে বেড়ালটার জন্যেও, মাছটার জন্যেও, কাকাতুয়াটার জন্যেও। সবাইকে ও ভালোবাসত। ওদের জন্যে আমার বউটার বড় কষ্ট হবে। আমি আত্মহত্যা করলে ও দুঃখ পেত। আমি মরে গেলে আর কাকে ও দিন-রাত অপমান করবে, যন্ত্রণা দেবে? শাসন করার, বিরক্ত করার আর তো কেউ থাকবে না।
মাছটা, কুকুরটা, কাকাতুয়াটা, বেড়ালটার মতো আমাকেও যদি আমার বউ ভালোবাসত, তা হলে কত ভালো হত! অনেক ভালো হত।
এই তো, দরজায় কে কড়া নাড়ছে। আমার বউ এসে গেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিই।
আমার বউয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনের রাস্তায় দাঁড় করানো সিমেন্ট মেশানোর যন্ত্রটার দিকে তাকালাম।
আমার বউটাকে মেরে ফেলতে কোনও কষ্ট হবে না।
চন্দনকাঠের বাক্স
কাল রাতে মা-কে আবার স্বপ্নে দেখল সুমন।
ধূপের ধোঁয়ায় সব আবছা হয়ে গেছে। সাদা চন্দনের গন্ধে ভরে গেছে চারদিক। তারই ভেতর দিয়ে ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল মায়ের সুন্দর মুখটা। কপালে সিঁদুরের বড় টিপ, ফরসা মুখে গোলাপি আভা। নাকে নাকছাবি। চোখ আর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি। কালো, সবুজ আর সাদায় কাজ করা চওড়াপাড় একটা শাড়িতে ঘোমটা দিয়ে রয়েছেন মা। সুমনকে যেন বলছেন, দুষ্টুমি কোরো না, বাবা। মন দিয়ে লেখাপড়া কোরো। অনেক বড় হতে হবে তোমাকে।
ভোরবেলা কাকের ডাকে ঘুম ভাঙল সুমনের। মাথার কাছে ছোট্ট জানলা দিয়ে ভোরের নরম রোদ এসে পড়েছে বিছানায়। জানলার পাল্লায় বসে একটা কাক থেকে-থেকে ডাকছে। রোজই এই কাকটা এসে ওর ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। আর সুমন জেগে উঠলেই ওটা উড়ে যায়–হয়তো অন্য কারও ঘুম ভাঙাতে।
বিছানায় কিছুক্ষণ চোখ মেলে শুয়ে রইল সুমন। স্বপ্নের ছবিটা ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এখনও। এতটুকু ঝাপসা হয়নি। এই একই স্বপ্ন ও যে কতদিন ধরে দেখে আসছে মনে নেই। স্কুলের বন্ধুদের স্বপ্নের কথাটা শোনালে অলক বলেছিল, তোর কথা এতটুকু বিশ্বাস করি না। আমার ছোটকাকু বলে, স্বপ্নে কখনও রং দেখা যায় না। আর তুই কী করে ধূপের গন্ধ পেলি? চন্দনের গন্ধ পেলি? শাড়ির রং দেখলি?
অন্যান্য বন্ধুও একইসঙ্গে অলকের দলে হয়ে সুমনকে কোণঠাসা করতে চেয়েছে। কিছুক্ষণ প্রতিবাদ করেছে সুমন। তারপর অত বড় দলের সঙ্গে আর পেরে ওঠেনি। ভীষণ কান্না পেয়েছে। ওর। মনে-মনে মা-কে ডেকে বলেছে, মা, মাগো, তুমি তো একবার এসে ওদের বলতে পারতে আমি সত্যি কথা বলছি! তারপর থেকে আর কোনওদিন ও স্বপ্নের কথা কাউকে বলেনি।
সেদিন থেকে চুপচাপ হয়ে গেছে সুমন। ক্লাসে বন্ধুদের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা আর বলে না। পড়ার সময় পড়া করে, অন্য সময় মায়ের কথা ভাবে। বুকটা কেমন আনন্দে ভরে যায় ওর।
বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল সুমন। বাবা আগেই উঠে পড়েছেন। সাড়ে সাতটার মধ্যে বাবা তৈরি হয়ে মেঝেতে মাদুর পেতে বসে পড়েন। অপেক্ষা করেন ছাত্রদের জন্য। সকালে অরূপ, বিকাশ আর দেবাশিস–এই তিনজন পড়তে আসে বাবার কাছে। ওদের বাড়ি খুব দূরে নয়। বাবার কাছে ওরা পড়ছে আজ প্রায় তিন বছর ধরে। অরূপ আর দেবাশিস অন্য স্কুলে ক্লাস টেন-এ পড়ে। বিকাশ সুমনের স্কুলেই পড়ে। ক্লাস নাইন-এ। সুমনের চেয়ে এক ক্লাস নীচুতে।
হাত-মুখ ধুয়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল সুমন। বাবা পুরু কাচের চশমা চোখে দিয়ে ঝুঁকে বসে একটা বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছেন। বাবা চোখে ভীষণ কম দেখেন। তবে এদিকে চোখ না ফেরালেও বাবা জানেন সুমন এখন কী করবে। সেটা সুমনের রোজকার কাজ।
