দূরে একটা রোড সাইন চোখে পড়ল।: ‘কার্ভ অ্যাহেড’। তারপরই রাস্তাটা ডানদিকে বেঁকে গেছে।
এসে গেছি। আর কয়েকসেকেন্ড।
সোনালকে বললাম, ‘গাড়ি সাইড করছি। আপনি এখানটায় নেমে পড়ুন।’
‘কেন?’ কপালে ভাঁজ ফেলে আমার দিকে তাকাল ও।
গাড়ির গতি কমালাম: ‘এরপর আমার সঙ্গে গেলে আপনার বিপদ হবে—গাড়ি আর থামানো যাবে না—তাই।’
‘কীসের বিপদ?’
‘প্লিজ, আমার কথা শুনুন…নেমে পড়ুন।’
‘না।’ জেদি গলায় বলল মেয়েটা, ‘আগে বলুন—কীসের বিপদ—।’
আমি এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম: ‘সোনাল, বছরদুয়েক আগে…সেই যে আমি রাগ করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম…সেই রাতটা ছিল অমাবস্যার রাত। আজও তাই…।’
খেয়াল করলাম, স্টিয়ারিং-এর ওপরে আমার বাঁ-হাতের পাতাটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। ডান হাঁটু আর উরু দেখা যাচ্ছে না।
সোনাল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। এফ. এম. রেডিয়াতে ঝিনচ্যাক মিউজিকের সঙ্গে গান বাজছে।
‘…সেই শীতের রাতে এই রাস্তায় আমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়। ওই যে রোড সাইনটা দেখা যাচ্ছে—ওটা পেরিয়ে ডানদিকে টার্ন নিয়ে…তারপর…।’
আমার বাঁ-দিকের অনেকটা অংশ আচমকা অদৃশ্য হয়ে যেতেই ব্যাপারটা সোনালের চোখে পড়ল। না পড়ে উপায়ও ছিল না।
ও চোখ বড়-বড় করে ফেলল। ভয়ংকর এক চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই। গাড়ি আর থামানো যাবে না।
‘একটা লোডেড ট্রাকের সঙ্গে আমার গাড়ির মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। সঙ্গে-সঙ্গে সব শেষ। তারপর থেকে…।’
সোনাল এখনও চিৎকার করে চলেছে। এফ. এম. রেডিয়ো বাজছে। রোড সাইনটা কাছে এসে গেছে।
‘তারপর থেকে প্রত্যেক অমাবস্যার রাতে আমি এ-রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে যাই। ঝড়, বৃষ্টি, কুয়াশা, শীত পরোয়া না করে ছুটে যাই ওই অ্যাক্সিডেন্টের জায়গায়। মারা যাওয়ার পর থেকে এটাই আমার জীবন, সোনাল…।’
কী মনে হওয়ায় গাড়ির রিয়ার ভিউ মিরারটা আমার দিকে ঘোরালাম।
যা ভেবেছি তাই। আমার মুখের বাঁ-দিক, গলা—সব মিলিয়ে গেছে। শুধু ডানদিকের গাল, দুটো চোখ, কপাল আর চুল সাপের ফণার মতো শূন্যে ভেসে আছে।
সোনাল ছুটন্ত গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করছে, আর পাগলের মতো চিৎকার করছে।
ডানদিকে বাঁক নিয়ে এগোতেই ছুটে আসা ট্রাকের ঘোলাটে হেডলাইট চোখে পড়ল আমার।
সোনাল তখন হিস্টিরিয়ার রুগির মতো ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করছে। গাড়ির উইন্ডশিল্ডের কাচে হিংস্রভাবে ঘুসি মারছে।
আশ্চর্য! এই মেয়েটাই না একটু আগে বলছিল, …’আমি আর বেঁচে নেই। প্রেতাত্মার মতো বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি…।’
এখন ওর সামনে সত্যি-সত্যি সেই সুযোগ এসে গেছে। এখন থেকে ও আর আমি একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব।
আমার শরীরের বাকি অংশগুলো একে-একে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল।
ট্রাকটা ক্ষিপ্ত গন্ডারের মতো ছুটে আসছে।
আমি অদৃশ্য আঙুলের চাপে গাড়ির হর্নটা বাজাতে শুরু করলাম।
শেষ মুহূর্তটার জন্যে আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
খুন করা সহজ
গোল্ডফিশটাকে মেরে ফেলতে কোনও কষ্ট হয়নি।
কাচের জারের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মাছটার ছন্দময় অলস সাঁতার দেখছিলাম, তারপর জলের মধ্যে ঢেলে দিলাম ঘন সালফিউরিক অ্যাসিড। প্রথমে কয়েক ফোঁটা–তাতে মাছটার সাঁতারের গতি অনেক দ্রুত হল–আর তারপর একেবারে গোটা বোতলটা উপুড় করে দিলাম। আমার হাত দস্তানায় ঢাকা। যদি অ্যাসিড লেগে যায়! চুপচাপ দাঁড়িয়ে লক্ষ করতে লাগলাম, কীভাবে অ্যাসিড ধীরে-ধীরে মিশে যাচ্ছে জলে, উদ্গত ফেনা ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে জারের কিনারা থেকে।
মাছটা চঞ্চল হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। বৃত্ত রচনা করল ওপরে-নীচে। আমার মনে পড়ে গেল মেলায় দেখা নাগরদোলার ঘূর্ণি-খাওয়া কাঠের ঘোড়ার কথা। অ্যাসিড চারপাশ থেকে ঘিরে ধরতেই মাছটা যেন পাগল হয়ে উঠল। অ্যাসিড ওটাকে কুরেকুরে খেতে লাগল, ক্রমশ ঢুকে পড়ল ওটার শরীরের ভেতরে।
কাকাতুয়াটা আর কখনও কাউকে বিরক্ত করবে না। ওটা জারের কাছে এসে দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াত, মাথা কাত করে দেখত গোল্ডফিশটাকে, যেন এখুনি জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করবে।
কাকাতুয়াটার দিক থেকে চোখ সরিয়ে খাওয়ার ঘরের টেবিলে রাখা ফলের রস তৈরির যন্ত্রটার দিকে তাকালাম। একদিকে ফল ঢুকিয়ে হাতল ঘোরালেই অন্যদিক দিয়ে রস বেরিয়ে আসে।
কাকাতুয়াটাকে মেরে ফেলতে কোনও কষ্ট হয়নি। খাঁচায় হাত ঢোকাতেই ওটা কঁকিয়ে উঠেছিল। আমি ওটাকে চেপে ধরলাম দস্তানা পরা হাতে। যদি কামড়ে দেয়! রস তৈরির যন্ত্রের মুখে ওটার মাথাটা ঢুকিয়ে যখন চেপে ধরলাম, তখনও ওটা চেঁচাচ্ছে। ধীরে-ধীরে হাতল ঘোরাতে শুরু করলাম। কুড়মুড় কুড়মুড় শব্দ হল। ওর শরীরের থকথকে লাল অবশেষ টেবিলে গড়িয়ে পড়তেই কাকাতুয়াটা চুপ করে গেল। ওটার ছোট্ট কচি হাড়গুলো মড়মড় করে ভাঙতে লাগল। আমি হাতল ঘুরিয়ে চললাম।
কাকাতুয়াটার পালক আর রক্তমাখা থকথকে ঘন অবশেষ হাতে করে চেঁছে তুলে নিলাম। একটা ঠোঙায় ওগুলো ভরে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিলাম।
বেড়ালটা আর কখনও কাউকে বিরক্ত করবে না। ওটা কেবলই খাঁচার পাশে রাখা চেয়ারে লাফিয়ে উঠত আর একটা থাবা কাকাতুয়াটার খাঁচায় ঢুকিয়ে দেওয়ার নিষ্ফল চেষ্টা করত।
