আমি আবার কথা বললাম, ‘খুব পার্সোনাল কিছু হলে বলার দরকার নেই।’
রাস্তার বাঁকে ঝোপের গোড়ায় একটা কুকুর চোখে পড়ল। হেডলাইটের আলোয় জন্তুটার সবুজ চোখ ঝিকিয়ে উঠল। আমি মুখ ফেরালাম মেয়েটার দিকে: ‘যাকগে, আমার নাম রনিত। আপনি কোন দিকে যাবেন?’
‘আপনি যেদিকে যাচ্ছেন। আমি আসলে এখান থেকে পালাতে চাই—যতদূরে পারা যায়। আমার নাম সোনাল।’
‘বাঃ, বেশ অদ্ভুত নাম তো!’ তারিফ করে বললাম, ‘তা কার কাছ থেকে পালাতে চান? হাজব্যান্ডের কাছ থেকে?’
আবার চমকে উঠে আমার দিকে ফিরে তাকাল: ‘কী করে বুঝলেন?’
কেতার হাসি হাসলাম, বললাম, ‘আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারি। বছর দুয়েক হল এই গুণটা গজিয়ে উঠেছে। তবে কীভাবে হল সেটা এগজ্যাক্টলি বলতে পারব না।’
‘আমার হাজব্যান্ডটা একটা জানোয়ার—’ কথাটা বলার সময় ঠোঁটটা অদ্ভুতভাবে বেঁকাল সোনাল। ওর চোয়াল শক্ত হল: ‘ও পারে না এমন কোনও কাজ নেই। মানে, পারত না এমন কোনও কাজ নেই। আপনি অচেনা মানুষ—তাও বলছি। দিন-রাত নেশা করত, হাত তুলত, যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করত…।’
সোনালের দিকে তাকালাম।
এরকম ফুটফুটে কোমলতা মাখা মেয়ের গায়ে কী করে কেউ হাত তোলে!
‘…দিন আর রাতগুলো এত বিশ্রীভাবে কাটাত যে, মনে হত আমি আর বেঁচে নেই। প্রেতাত্মার মতো বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি…।’
‘আর এখন?’ কথার পিঠে কথা বলার ছলে প্রশ্নটা করলাম।
‘এখন তো মুক্ত। মানে টোটাল ফ্রিডম। এখন আমি যা খুশি তাই করতে পারি—।’
‘তাই? জানতে চাইলেন না তো আমি কোথায় যাচ্ছি।’
‘জেনে কী হবে? নতুন জীবন শুরু করার সময় এসব ফালতু প্রশ্নের কোনও দাম নেই…।’
আমি অবাক হয়ে সোনালকে দেখলাম। একটু আগে ও ভয়, সন্দেহ, উৎকণ্ঠায় ভাসছিল। আর এখন বেপরোয়া, নির্লিপ্ত, নিশ্চিন্ত। ও সত্যি, না মায়া? নাকি আমাকে ঘিরে ওর অন্য মতলব আছে? থাকলে থাক। কারণ, এখন আমার ভয়-ডর বলে আর কিছু নেই।
কিন্তু যেভাবে ও আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েছে তাতে মনে হয় না ব্যাপারটা সাজানো। তা ছাড়া এ-রাস্তা ধরে আমি প্রায়ই রাতের দিকে গাড়ি চালিয়ে যাই। আগে কখনও তো ওকে দেখিনি!
‘আপনার হাজব্যান্ড এখন কোথায়?’
‘নেই।’
‘নেই মানে?’
‘শেষ। দ্য এন্ড।’
মেয়েটা কি ওর স্বামীকে খুন করেছে নাকি?
আমার কোঁচকানো ভুরু দেখে কী যেন ভাবল সোনাল। হেসে বলল, ‘আমি নিজেই জানতাম না আমার মধ্যে এত শক্তি আছে। কী করে যে পারলাম কে জানে! বোধহয় আমি নয়—আমার ভেতরের আত্মা কিংবা প্রেতাত্মা আমাকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিয়েছে।’
‘কী কাজ?’
‘বুঝে নিন। এর বেশি বলব না।’
আমার হঠাৎ কেমন সন্দেহ হল। আড়চোখে সোনালকে বেশ ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলাম। ওর কথার মধ্যে কতকগুলো শব্দ আমার কানে বাজছিল।
একা মেয়ে। এই শীতের রাতে কুয়াশার মধ্যে হঠাৎ করে কোথা থেকে এল ও? আর ঠারে ঠারে যা বলতে চাইছে তাতে একটা মারাত্মক কাণ্ড করে এসে এইরকম নির্লিপ্ত আর উদাসী থাকছে কেমন করে?
আমার ভীষণ অবাক লাগল। মনের ভেতরের কাঁটাটা খচখচ করতে লাগল।
‘আপনি থাকেন কোথায়?’ ওকে জিগ্যেস করলাম।
‘প্রশ্নটা অনেকটা পুলিশের মতো শোনাচ্ছে।’
‘আগেই তো বলেছি—আমি পুলিশ নই।’
আমার দিকে পূর্ণ চোখে তাকাল। তাকিয়ে কী খুঁজল জানি না। তারপর: ‘যেখানে আপনার গাড়িতে প্রায় চাপা পড়ছিলাম, সেখান থেকে বড়জোর দু-আড়াই কিলোমিটার। সেখানে আমাদের সাজানো দোতলা বাড়ি। পুরোটা ছবির মতন। শুধু ওই লোকটাই ছিল কলঙ্ক।’ একটু চুপ করে রইল। ওড়নার কাপড়ে হিজিবিজি কাটল। তারপর: ‘ওই বাড়িতে আমি আর থাকতে পারব না…।’
আমি হঠাৎই রেডিয়োটা অন করে দিলাম।
শুরু হয়ে গেল গান আর কথার কচকচি। তৃতীয় কারও গলা আমাকে যেন ভরসা দিল।
‘এবারে আপনার গল্পটা শুনতে পারি?’ সোনাল জিগ্যেস করল।
আমি চুপ করে রইলাম। চোখ রাস্তার দিকে।
বৃষ্টি এখন আর নেই—তবে রাস্তায় ভিজে দাগ রয়েছে। ভিজে দাগ থাক বা না থাক, এখন রাস্তাই আমার জীবন।
‘কী, বলবেন না? আমারটা তো হাঁ করে শুনলেন—।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। পুরোনো স্মৃতি ঝিলিক মেরে গেল মাথার ভেতরে।
‘সেই চেনা গল্প।’ ওর দিকে না তাকিয়েই বললাম, ‘বড়লোক বউ। স্বামী গরিব, তবে সৎ পরিশ্রমী মানুষ। দিন-রাত শুধু অভিযোগ আর অভিযোগ। আমি নাকি অপদার্থ। শিক্ষিত হলেও গণ্ডমূর্খ। ফুটোপয়সার মুরোদ নেই।
‘একদিন রাতে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল আমাকে। ওর বাবার দেওয়া বাড়ি—তাই আমাকে ”গেট আউট” বলার অধিকারও ছিল। আমারও যে কী হল! দুঃখ অভিমানে বোকার মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। এই গাড়িটা নিয়ে—ওর বাবার দেওয়া গাড়ি।’ আক্ষেপে স্টিয়ারিং-এ চাপড় মারলাম: ‘আমার লাইফটা একেবারে ইউজলেস ছিল…আর একইসঙ্গে হোপলেস…।’
হঠাৎই হেসে উঠল সোনাল।
‘হাসছেন কেন?’
‘না, একটা কথা মনে হল—তাই।’
‘কী কথা?’
‘মানে…দুজন হোপলেস একজায়গায় হলে একটু-আধটু হোপ তৈরি হতে পারে কি না…।’
‘বেশ বলেছেন। এরকম কথা শুনলে ভালো লাগে—নতুন করে আবার বেঁচে উঠতে ইচ্ছে করে। জীবনের জন্যে মায়া জাগে।’
সোনাল মাথা নীচু করল। আস্তে-আস্তে বলল, ‘আপনি হয়তো ভাবছেন, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। একটা সিরিয়াস ক্রাইম করে এসে এত কুললি কী করে কথা বলছি।’ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘আসলে আমার হাজব্যান্ড আমার চোখে বহুদিন আগেই ”নেই” হয়ে গিয়েছিল। ওর থাকা না থাকায় আমার লাইফের কোনও ডিফারেন্স নেই। তা ছাড়া আমার এখনকার লাইফটাও তো ঠান্ডা বরফ আর পাথরের মতো। মানে, মৃত্যু যেমন হয়…।’
