আপনি ঠিক জানেন, ও আর কোনওদিনও এসব স্বপ্ন দেখবে না?
কোনওদিনও না। ওর মনের সাপ্রেসড অপরাধবোধ ভেন্টিলেটেড হয়ে গেছে। চিরদিনের জন্যে মুক্তি পেয়ে গেছে। এখন ওটার আর কোনও অস্তিত্ব নেই।
দারুণ, ডক্টর দারুণ! আই ফিল গ্রেট। নইলে রাকেশ যেভাবে দিনের পর দিন ভেঙে পড়ছিল। ওহ, একমিনিট, দরজায় কে যেন কলিংবেল বাজাচ্ছে।
দেখুন আবার কে এল।
…আমার মা লোক দিয়ে বিছানার চাদর, বেডকাভার সব পাঠিয়ে দিয়েছে। এগুলো বিয়েতে পেয়েছি। মা সবাইকে নিয়ে কাল সকালে আসবে বলেছে। দেখুন, কী সুন্দর, না?
হ্যাঁ, দারুণ দেখতে।
দাঁড়ান, এগুলো জানলার পাশের এই কাঠের পোর্টম্যানটায় রাখি। এটা রাকেশের খুব শখের জিনিস। এটা বন্ধ করলে পোকামাকড়, হাওয়া, কিছুই ভেতরে ঢুকতে পারে না। তাই কাপড়চোপড়ও নষ্ট হওয়ার ভয় নেই।
রাকেশ, তুমি এখন জেগে উঠতে পারো…এই তো, কেমন লাগছে?
ভালো। তবে আমি অভিরাম, রাকেশ নই। ভেবে অবাক লাগছে, কী করে আপনি রাকেশের স্বপ্নটাকে স্বপ্ন বলে বিশ্বাস করলেন! এটা যে রাকেশের একটা ছল, সেটা আপনার অন্তত বোঝা উচিত ছিল, ডক্টর। প্রথম যেদিন ও স্বপ্নটা দ্যাখে, সেদিন সত্যি-সত্যিই একটা ফোন এসেছিল…অনিতা! পোর্টম্যানটা খুলো না! খুলো না বলছি…ঠিক আছে, আমার কথা তো শুনলে না! সেই খুলতে গেলে। তা হলে এখন ওখানে দাঁড়িয়ে চোখ বড়-বড় করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কোনও লাভ আছে? আপনিই বলুন, ডক্টর!
কুয়াশা, অন্ধকার এবং…
বৃষ্টি। তবে কুয়াশা আর অন্ধকার যতটা ঘন বৃষ্টি ততটা নয়। ঝিরঝিরে মতন। গাড়ির উইন্ডশিল্ডে বৃষ্টির বাচ্চা-বাচ্চা ফোঁটাগুলো যেন খেলার ছলে দস্যিপনা করে ছিটকে পড়ছিল।
শীতের রাতে কুয়াশা আর অন্ধকার থাকাটা স্বাভাবিক। শুধু বৃষ্টিটাই হিসেবের বাইরে।
সামনের কাচের ওপরে ওয়াইপার চলছিল। একইসঙ্গে হেডলাইটের আলো ছিটকে যাচ্ছিল অন্ধকার আর কুয়াশার দিকে।
আমার একহাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে সিগারেট। জানি, সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা বেশ কিছুদিন হল ছেড়ে দিয়েছি।
সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
অন্ধকার রাত। গাঢ় কুয়াশা। জমাট শীত। হালকা বৃষ্টি। কালো ফিতের মতো রাস্তা। হেডলাইটের হলদে আলো।
সবমিলিয়ে বেশ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা ধরে আজীবন গাড়ি চালাই। এমনকী জীবনের পরেও।
ভাবের ঘোরে বোধহয় একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলাম। সেইজন্যেই মেয়েটাকে প্রথমে দেখতে পাইনি। পাশের গাছপালার ফাঁক থেকে কোন মুহূর্তে যেন আচমকা ছিটকে চলে এসেছে গাড়ির সামনে।
আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে দু-হাত সামনে বাড়ানো। বড়-বড় আয়ত চোখে নিছক ভয়।
কী করে যেন শেষ মুহূর্তে ব্রেক কষতে পারলাম।
বিশ্রী শব্দ হল। ভেজা রাস্তায় গাড়ির চাকা পিছলে গেল। কপাল ভালো যে, আমার পেছনে কোনও গাড়ি ছিল না। থাকলে সে নির্ঘাত আমার গাড়িতে ধাক্কা মেরে বসত।
মেয়েটি টাল সামলাতে গিয়ে গাড়ির বনেটের ওপরে ঝুঁকে পড়েছিল। হেডলাইটের আলো ওর কোমরের কাছটা ভাসিয়ে দিচ্ছিল। থুতনির নীচে আর গালে আলো পড়ে চোখের কোটর দুটো অন্ধকার গর্তের মতো লাগছিল।
হঠাৎ করেই যেন একটা ঠান্ডা শিরশিরে ভাব আমাকে ছুঁয়ে গেল।
মেয়েটা আশ্চর্যভাবে নিজেকে সামলে নিল। প্রায় ছুটে চলে এল গাড়ির জানলার কাছে। কাচের ওপর শব্দ করে টোকা দিল কয়েকবার।
একমুহূর্ত কী ভেবে আমি ঝুঁকে পড়ে জানলার কাচ সামান্য নামালাম।
মেয়েটি হাত দিয়ে বৃষ্টি আড়াল করার চেষ্টা করতে-করতে বলল, ‘দরজাটা একটু খুলুন না—প্লিজ…।’
ওর মুখের একপাশে হেডলাইটের আলোর ঠিকরে আসা আভা। বাকিটা ছায়া-ছায়া, অন্ধকার। তারই মধ্যে কয়েকটা জলের ফোঁটা চিকচিক করছে।
কী ভেবে দরজাটা খুলে দিলাম। আমার দিকে জানলার কাচ নামিয়ে হাতের সিগারেটটা ফেলে দিলাম।
ও চট করে উঠে বসল আমার পাশে। দরজা বন্ধ করে ওড়না দিয়ে মুখটা মুছে নিল। তারপর জানলার কাচটা তুলে দিল।
লক্ষ করলাম, মেয়েটা হাঁপাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন অনেকটা পথ ছুটে এসেছে। ওড়নার আঁচল দিয়ে নাকের কাছে বাতাস করল। বোধহয় সিগারেটের গন্ধে অস্বস্তি হচ্ছে।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
আড়চোখে মেয়েটাকে দেখলাম।
হলদে আর লাল চুড়িদার। সেইরকম একটা ওড়না। জামার ওপরে কালচে রঙের একটা স্লিভলেস সোয়েটার। বয়েস আটাশ কি তিরিশ। বেশ সুন্দর দেখতে। প্রসাধন তেমন না থাকলেও শরীর থেকে একটা হালকা গন্ধ বেরোচ্ছে।
হঠাৎই মনে হল, আমি যেন সিনেমার ভেতরে ঢুকে পড়েছি। কারণ, সিনেমা-টিনেমায় এরকম হয়।
চুপচাপ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর জিগ্যেস করলাম, ‘এই রাতে হঠাৎ এভাবে কোথা থেকে এলেন?’
মাথা ঝাঁকিয়ে ঘুরে তাকাল আমার দিকে: ‘কেন? জিগ্যেস করছেন কেন?’
ওর কথার সুরে একটা চাপা ভয় টের পেলাম। সেইসঙ্গে চোখের নজরে দু-চারফোঁটা সন্দেহ।
আমি হাসলাম: ‘ভয় নেই—আমি পুলিশের লোক নই। যেভাবে এই রাতে কুয়াশা আর বৃষ্টির মধ্যে আপনি হঠাৎ করে আমার গাড়ির সামনে এসে পড়লেন—তাতে প্রশ্নটা করে খুব একটা অন্যায় করেছি বলে তো মনে হয় না।’
কয়েক মুহূর্ত ঠোঁট টিপে বসে রইল। তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। এখনও বড়-বড় শ্বাস পড়ছে। বুক ওঠা-নামা করছে।
