অভিরাম ইতস্তত করল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, তা হলে যোধপুর পার্কেই চলুন।’
ড্রাইভার গজগজ করতে-করতে গাড়ি চালাল।
নির্জন পথে ট্যাক্সি ছুটে চলল। অভিরাম নিনার ডেডবডি কোলে নিয়ে তখন গুনগুন করে গান গাইছে। আর আমি একইসঙ্গে বিস্ময় আর ভয়ের দোলায় দুলছি।
অবশেষে একটা বাড়ির সামনে পৌঁছলাম। যে-বাড়িটা আমি আমার আর অনিতার জন্যে কিনেছি।
ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে খুব সাবধানে নিনাকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল অভিরাম।
অন্ধকার রাত। শীত আর রাতের নির্জনতা। সদর দরজায় নিনার বডিটা নামিয়ে তালা খুলল অভিরাম। কেউ ওকে লক্ষ করল না।
নিনাকে নিয়ে ও বাড়িতে ঢুকল।
বাড়ি অন্ধকার। কিন্তু অভিরাম আলো জ্বালল না। নিনাকে বসবার ঘরে একটা লম্বা সোফায় শুইয়ে দিয়ে ওর মুখোমুখি একটা সিঙ্গল সোফায় বসল। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘রাকেশ, এবার বলো, কী বলবার আছে।’
‘অভিরাম!’ আমি রাগে চিৎকার করে উঠলাম, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? নিনাকে এখানে নিয়ে আসার চেয়ে আমার ফ্ল্যাটে রাখলেই বা কী ক্ষতি ছিল কি? এখন কী করবে এই বডি নিয়ে?’
‘সে-কথাই তো ভাবছি;’ খিটখিটে সুরে বলে উঠল অভিরাম। পরিকল্পনায় বাধা পড়লে ও খুব অধৈর্য আর রুক্ষ হয়ে পড়ে: ‘ড্রাইভারটা গঙ্গায় যেতে রাজি হল না বলেই তো যত ঝামেলা—।’
এমন সময় নিনা উঠে বসল।
জ্বরগ্রস্ত মানুষের মতো টলোমলো ভঙ্গিতে ও উঠে বসল। নিজের গলায় হাত বোলাতে লাগল। তারপর শোনা গেল ওর ভারি কর্কশ কণ্ঠস্বর।
‘রাকেশ,’ ও বলল, ‘তুমি—তুমি আমাকে খুন করতে চেয়েছ?’
নিনাকে দেখার জন্যে অভিরাম ঘুরে তাকাল। অন্ধকারে নিনা শুধু যেন একটা আবছায়া প্রেত, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
‘ও, কাজটা তা হলে ভালোভাবে শেষ করতে পারিনি দেখছি!’ বিরক্তির সুরে মন্তব্য করল অভিরাম।
‘তুমি আমাকে খুন করতে চেয়েছ।’ নিনা আবার বলল। যেন ঘটনাটা ও বিশ্বাস করতে পারছে না: ‘তোমাকে এর জন্যে জেলে যেতে হবে। সে ব্যবস্থা আমি করছি।’
‘উঁহু, ওসব কিছুই হবে না।’ উঠে দাঁড়াল অভিরাম। ওর বিশাল শরীর নিনার ওপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে: ‘শুধু আমাকে একই কাজ আবার প্রথম থেকে করতে হবে।’
নিনা পলকে ওর কাছ থেকে কুঁকড়ে সরে গেল।
‘না! না!’ ও চিৎকার করে উঠল, ‘আমাকে ক্ষমা করো, রাকেশ। আমি আর কোনওদিন ফিরে আসব না। আমি চলে যাব। চিরকালের মতো চলে যাব। আর কোনওদিন তোমাকে বিরক্ত করব না।’
‘আমি অভিরাম, রাকেশ নই।’ অভিরামের স্বর গম্ভীর, ‘তোমার দেখছি কইমাছের জান, নিনা। দু-দুবার তুমি মারা গেছ, কিন্তু তবুও তুমি মরোনি। হয়তো এই তৃতীয়বারই শেষবার হবে।’
‘অভিরাম, থামো!’ আমি চিৎকার করে বললাম, ‘ওকে ছেড়ে দাও। ও সত্যি কথাই বলছে। ও আর কোনওদিন ফিরে—।’
‘নিনার মতো মেয়েদের তোমার চিনতে এখনও দেরি আছে।’ অভিরাম ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘তা ছাড়া, এ হল ও আর আমার ব্যাপার। তোমাকে এখানে নাক গলাতে হবে না। তুমি ঘুমোও, রাকেশ…তুমি ঘুমিয়ে পড়ো…ঘুমোও…।’
মনে হল যেন অজ্ঞান হয়ে যাব। অন্ধকার আমাকে গ্রাস করল। ছোটবেলায় যেমনটা হত, স্বপ্নেও তাই হল—আমাকে সম্পূর্ণ উধাও করে দিল অভিরাম। এখন ও যা খুশি তাই করতে পারে।
এরপর যখন চেতনা ফিরে পেলাম, তখন আমি পাজামা পরে নিজের বিছানায় শুয়ে আছি। ঘরের মাঝখানে অভিরাম দাঁড়িয়ে—আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
‘রাকেশ, আর তোমার কোনও ভয় নেই।’ ও বলল, ‘আমি চললাম। অবশ্য আবার ফিরে আসব। দরকার হলেই।’
‘নিনা!’ চিৎকার করে উঠলাম আমি, ‘ওকে তুমি কী করেছ?’
অভিরাম হাই তুলল: ‘নিনার কথা ভুলে যাও। ও তোমাকে আর কখনও বিরক্ত করবে না। তোমার তরফ থেকে পুরো ব্যাপারটা আমি ওকে বুঝিয়ে দিয়েছি, রাকেশ।’
‘কী করে? কী করেছ তুমি ওকে নিয়ে?’
অভিরাম শুধু হাসল। ‘বিদায়, রাকেশ।’ ও বলল, ‘ও, ভালো কথা—আমি চাই না ভোরবেলা এসব কথা ভেবে তোমার দুশ্চিন্তা হোক। অতএব মনে রেখো, এসবই একটা স্বপ্ন। নিছকই একটা অদ্ভুত স্বপ্ন—আর কিছু নয়।’
ও চলে গেল। পরমুহূর্তেই চোখ খুলে দেখি, সকাল ন’টা বাজে। ঘড়ির অ্যালার্ম বাজছে।…এই আমার স্বপ্ন, ডক্টর।
এবারে ব্যাপারটা বুঝতে পারছি, রাকেশ। তোমার স্বপ্নের কারণটা তোমাকে এবার বুঝিয়ে দিই, তা হলে এ-স্বপ্ন দ্বিতীয়বার আর তুমি দেখবে না।
বলুন, ডক্টর।
তোমার ফার্স্ট ওয়াইফ, নিনা, মারা যাওয়ার আগেই তুমি ওর মৃত্যু কামনা করেছিলে, তাই না?
হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম, ও মরে যাক।
ঠিক তাই। তারপর যখন ও মারা গেল, তুমি মনে-মনে একটা অপরাধবোধ, মানে, একটা গিল্ট কমপ্লেক্স—মানে, তোমার মনে হত যে, তুমিই ওকে খুন করেছ। তাই অনিতাকে বিয়ে করার ঠিক আগের রাতে সেই অপরাধবোধ একটা দুঃস্বপ্নে বদলে যায়—যে-দুঃস্বপ্নে নিনা আবার বেঁচে উঠেছে। পসিবলি ওই ঘড়ির অ্যালার্মকেই তুমি টেলিফোনের শব্দ ভেবেছ এবং ওইভাবেই শুরু হয়েছে গোটা স্বপ্নটা—নিনা, অভিরাম, সব। এবার বুঝেছ?
হ্যাঁ, বুঝেছি।
এখন তুমি একটু বিশ্রাম নাও। এরপর আমি যখন বলব জেগে উঠতে, তুমি জেগে উঠবে। সব স্বপ্ন তুমি ভুলে যাবে। ওই স্বপ্ন আর কোনওদিন তোমাকে ভয় দেখাবে না। এবার বিশ্রাম করো, রাকেশ।
হ্যাঁ, ডক্টর।
ওহ। ডক্টর রাও—।
বলুন, মিসেস শর্মা?
