বুঝলাম, ও জিতে গেছে। এখন ওর বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে—আমার শরীরের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ওর হাতে। আমি একেবারে অসহায়। আমি সব দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু অভিরামের কাজের ওপরে কোনও হাত আমার নেই।
নিনা এসে ঘরে ঢুকল। ওর উজ্জ্বল চোখে আত্মবিশ্বাস ঝিলিক মারছে।
‘কী হল, রাকেশ, কী করবে ঠিক করেছ?’ ও প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ, করেছি।’
অভিরামের কণ্ঠস্বর আমার চেয়েও গভীর, জোরালো, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। নিনাকে দেখে মনে হল, এ পরিবর্তনে ও চমকে গেছে।
কিন্তু তারপরই সামলে নিয়ে ও বলল, ‘চেকটা চটপট লিখে দাও। রাত হয়ে যাচ্ছে। ডিভোর্সটা আমি চুপিচুপি করে নেব। তোমার নামের সঙ্গে কেউ আমার নাম জড়াবে না।’
‘চেক অথবা ডিভোর্সের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।’ অভিরাম ওকে বলল।
‘তা হলে লোক জানাজানি হবে। রগরগে অপ্রীতিকর কেলেঙ্কারির খবরে সবাই মজা পাবে। এতে তোমার ক্ষতিই হবে।’
‘উঁহু, লোকে জানবে না। আর তা ছাড়া, আমি রাকেশ নই, আমি অভিরাম।’
‘অভিরাম?’ নিনার মুখে এই প্রথম অনিশ্চয়তার প্রতিবিম্ব: ‘কীসব আজেবাজে কথা বলছ?’
‘আমি রাকেশের যমজ ভাই। যেসব কাজ রাকেশ নিজে করতে ভয় পায়, সেসব কাজ ওর হয়ে আমিই করে দিই।’
‘এসব আবোলতাবোল কথার কোনও মানে হয় না। আমি চললাম। ওই চেকের ব্যাপারটা ভাবার জন্যে তোমাকে কাল সকাল ন’টা পর্যন্ত টাইম দিলাম।’
‘টাইমের দরকার নেই। তা ছাড়া, তুমি যে কথা দিয়ে কথা রাখবে না, তাও আমি জানি।’
অভিরাম এক পা এগিয়ে গেল।
নিনা ভয় পেল। ও ঘুরে দাঁড়াল। যেন দৌড়ে পালাবে।
অভিরাম ওর হাত চেপে ধরল, এক ঝটকায় ঘুরিয়ে নিল মুখোমুখি। তারপর ওর নরম গলায় দু-হাতের দশ আঙুল বসিয়ে দিল।
না দেখে আমার উপায় ছিল না। কিন্তু আমি অসহায়। দেখলাম, ওর হাত নিনার গলায় ক্রমশ জোরে চেপে বসতে লাগল। নিনার মুখ লালচে হল, চোখদুটো হয়ে উঠল বিশাল, বিস্ফারিত। সেকেন্ড-তিরিশ মতো ও ধস্তাধস্তি করল, হাত-পা ছুড়ল। তারপর নিস্তেজ হয়ে পড়ল। বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেল। ওর মুখের রং এখন আরও লাল। ঢিলে ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফেনা। চোখদুটো যেন কোটর ছেড়ে ছিটকে বেরিয়ে আসবে।
শান্তভাবে অভিরাম ওর হাতের চাপ বাড়িয়েই চলল। অবশেষে নিনার মৃত্যু সম্পর্কে আর কোনও সন্দেহ রইল না, তখন ও নিনার শরীরটা ছেড়ে দিল।
নিনার মৃতদেহ শব্দ করে এলিয়ে পড়ল ঘরের মেঝেতে।
‘ও. কে. রাকেশ,’ ও বলল ‘কিছু বলার থাকলে এখন বলতে পারো।’
‘তুমি ওকে খুন করেছ!’
আমার রুমাল দিয়ে অভিরাম ঠোঁট মুছল।
‘চিন্তার কথা। আমি ওকে খুন করেছি, নাকি করিনি? ও কি বেঁচে ছিল, নাকি সত্যিই মারা গিয়েছিল মোটর অ্যাক্সিডেন্টে?’
‘আমার কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। নিনা তো মরেই গেছে। এটা শুধু একটা স্বপ্ন। কিন্তু—।’
‘স্বপ্ন হলেও আমরা তো একটা ডেডবডি তোমার ঘরের মধ্যে ফেলে রাখতে পারি না। তার একটা ব্যবস্থা করতে হয়। এটাকে বরং গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া যাক।’
‘কিন্তু এত রাতে—’ আমি চিন্তিত গলায় বললাম। টের পেলাম, আমার ভয় করছে।
‘ওসব চিন্তা তোমার জন্যে, আমার জন্যে নয়। আমি একটা ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে আসি। তারপর নিনাকে নিয়ে ট্যাক্সি করে চলে যাব সোজা গঙ্গার ধারে। তুমি এখন চুপ করে থাকো। আমি না বলা পর্যন্ত কোনও কথা বলবে না।’
শান্তভাবে ওর উন্মাদ-পরিকল্পনাকে কাজে লাগাল অভিরাম।
প্রথমে ও আমার একটা কোট আর একজোড়া দস্তানা পরে নিল। একটা হালকা চাদর নিয়ে নিনার বীভৎস মুখের ওপরে জড়িয়ে দিল। ওর মাথার চুল আর শাড়ি হাত দিয়ে ঠিকঠাক করে দিল। তারপর ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল দু-হাতে। যেন একটা ঘুমন্ত শিশু।
ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল অভিরাম। একতলায় পৌঁছে ও দারোয়ানের মুখোমুখি হল।
লোকটা ঝিমোচ্ছিল। অভিরাম এবং ওর কোলে নিনাকে দেখে সোজা হয়ে বসল।
‘দারোয়ানজি, ভদ্রমহিলা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছেন। একটা ট্যাক্সি ডেকে দিতে পারো?’
অভিরাম এ-কথা বলতে-বলতে নিনার ব্যাগটা ওর কোল থেকে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। দারোয়ানজি সেটা তুলে দিল ওর হাতে। তারপর বেরিয়ে গেল ট্যাক্সি ডাকতে।
আমি ভেবেছিলাম, এই বোধহয় ধরা পড়ে যাব, পুলিশ আসবে। কিন্তু না। মিনিট-কুড়ির মধ্যেই একটা ট্যাক্সি নিয়ে দারোয়ান ফিরে এল। অভিরাম নিনাকে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠল। তারপর টাকা বের করে দারোয়ানজির হাতে দিল। আমরা রওনা হলাম। অভিরামকে দেখে মনে হল যেন মাঝরাতে কোনও মহিলার ডেডবডি নিয়ে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ানোটা ওর কাছে নেহাতই রোজকার স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু অভিরাম যতই চালাক হোক না কেন, এ উদ্ভট পরিকল্পনায় একটা না একটা গন্ডগোল হবেই। হলও তাই। কিছুটা পথ গিয়ে পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ট্যাক্সি ড্রাইভার।
‘কোথায় যাবেন?’
‘গঙ্গার ধারে।’ অভিরামের গলা এতটুকু কাঁপল না।
‘গঙ্গার ধারে?’ ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, ‘এত রাতে? কি মজাক করছেন?’
‘না।’ কেউ ওর কথাকে ঠাট্টা ভাবলে অভিরাম বিরক্ত হয়: ‘ভদ্রমহিলা নেশার ঝোঁকে আছেন। তাই এঁকে গঙ্গার হাওয়া খাইয়ে চাঙ্গা করে তুলব।’
‘শুনুন স্যার!’ ড্রাইভার গাড়ি থামাল। ঘুরে তাকাল অভিরামের মুখোমুখি। রাগে তার মুখ লাল: ‘নেশার ঝোঁকে কে আছে? উনি, না আপনি? রাস্তার কল থেকে মাথায় জল দিন, সব নেশা ছুটে যাবে। এবার নামুন গাড়ি থেকে।’
