দরজা বন্ধ করে ফিরে আসতেই কথা ছিটকে বেরোল আমার ঠোঁট চিরে।
‘এখানে কী চাই? কেন তুমি ফিরে এসেছ? তুমি মরে গেছ!’
ও হাসিতে ফেটে পড়ল: ‘তুমি কি সত্যি সে-কথা বিশ্বাস করো, রাকেশ? আমি মরিনি গো। এই একটা বছর তোমার সঙ্গে একটু মজা করছিলাম।’
‘মজা করছিলে?’
আমার প্রশ্নে ওর হাসি আরও বেড়ে চলল। আকাশ-বাতাস কাঁপানো এক খিলখিল হাসি। যেন কোনওদিন থামবে না।
‘হ্যাঁ, রাকেশ।’ হাসির দমক থামিয়ে চোখের জল মুছে ও বলল, ‘বিপদের সময় অল্পেতেই তুমি ঘাবড়ে যাও। তাই ভাবলাম, ভূতের অভিনয় করে তোমাকে একটু ভয় পাইয়ে দিই।’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নিনা।
‘লায়ার! তুমি মিথ্যে কথা বলছ!’ আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘তুমি মরে গেছ। আমি তোমাকে—তোমার ডেডবডি—নিজের হাতে পুড়িয়েছি!’
‘আস্তে, রাকেশ।’ নিনা নির্বিকার। অল্প হেসে ও বলল, ‘আশপাশের লোক জেগে উঠবে। …সত্যি করে বলো তো, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে, আমি মরে গেছি?’
ছায়া-ছায়া অন্ধকার থেকে আলোর বৃত্তে এসে দাঁড়াল ও। ওর ফরসা গালে লালচে আভা, দু-চোখে দুষ্টু হাসি—আমার অনেক চেনা। ধীরে-ধীরে উচ্চারণ করল ও, ‘রাকেশ, গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে আমি মারা যাইনি। মারা গিয়েছিল আমার পাশে বসা অন্য একটা মেয়ে। অ্যাক্সিডেন্টের পরে যখন দেখলাম, মেয়েটা মারা গেছে, তখন কী খেয়াল হল, হাতের আংটিটা ওর আঙুলে পরিয়ে দিলাম। হাতব্যাগটা রেখে দিলাম ওর বডির নীচে। তারপর আমি গাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দিই। সুতরাং যে-ডেডবডি তোমরা শ্মশানে পুড়িয়েছ, সেটা আমার নয়।’
‘কিন্তু কেন? কেন ও কাজ তুমি করলে?’ কোনওরকমে একটা চেয়ারে বসলাম।
‘ইচ্ছে হল একটু মজা করতে, তাই। আমাকে সংসারে দেখে তুমি যতটা বিরক্ত হতে, তোমাকে দেখে আমি তার চেয়ে কম বিরক্ত হতাম না। সেইজন্যেই মনে হল, একটা অন্য পরিচয় নিয়ে নতুন জীবন শুরু করি। তা ছাড়া আমি জানতাম, যেদিন এই খেলার আকর্ষণ আমার কাছে কমে যাবে, সেদিন আমি সহজেই আবার তোমার কাছে ফিরে আসতে পারব। এখন আমার টাকাপয়সা সব ফুরিয়ে গেছে। তাই ফিরে এসেছি।’
‘কিন্তু কাল আমার বিয়ে। অনিতার সঙ্গে।’
‘জানি—খবরের কাগজেই বিজ্ঞাপন দেখেছি, ফেমাস ল’ইয়ার রাকেশ শর্মা নতুন করে বিয়ে করতে চলেছেন। এও জানতাম, আমার আসাটা তোমার পছন্দ হবে না। ঠিক আছে, রাকেশ, আমি চলেই যাব। আরও কিছুদিন ”মরে গেছি” এই অভিনয়ই না হয় করব। তুমি তোমার সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্টের মেয়ে অনিতাকে নির্বিবাদে বিয়ে করতে পারো। তবে আমার কিছু টাকার দরকার।’
‘না! তোমাকে টাকা আমি দেব না! তুমি মরে গেছ!’
‘তা হলে আগামীকালের কাগজের সেনসেশনাল হেডিং আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি। প্রখ্যাত আইনজীবীর মৃতা স্ত্রীর পুনর্জীবন। আপাতদৃষ্টিতে মৃতা স্ত্রীর হঠাৎ আবির্ভাবে আইনজীবীর নতুন বিয়েতে বাধা।’
‘না!’ আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘এ-কাজ তোমাকে আমি করতে দেব না!’
‘তাই বুঝি? কিন্তু আমারও যে হাজার-দশেক টাকার ভীষণ দরকার। টাকাটা দিলে চুপিচুপি আমরা ডিভোর্স করে নেব। কেউ টেরটি পর্যন্ত পাবে না। তুমিও তোমার এই নতুন বিয়েটাকে আবার নতুন করে রেজিস্ট্রি করে নিয়ো। দেখছ তো, কী সহজ!’
আমি উত্তর দিতে পারলাম না। আমার মন তখন ঘুরপাক খাচ্ছে। শরীর দুর্বল লাগছে। মনে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব। শুধু একটা গভীর বিশ্বাস আমাকে সচেতন রাখল। এসবই একটা দুঃস্বপ্ন।
নিনা উঠে দাঁড়াল: ‘আমার অফারটা ভেবে দ্যাখো। আমি মাথাটা একটু আঁচড়ে আসি। তোমাকে পাঁচমিনিট সময় দিলাম—তারপর একটা চেক আশা করাটা কি খুব একটা অন্যায় হবে?’
ও পাশের ঘরে গেল। দ্বিধার যন্ত্রণায় দু-হাতে মুখ ঢাকলাম। মনে-মনে ঘুম ভেঙে জেগে উঠতে চাইলাম। অবশেষে চোখ তুলে যখন তাকালাম, তখন অভিরাম, আমার যমজ ভাই, আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
‘এভাবে কি এর কোনও ফয়সালা করা যায়, রাকেশ? ওর ঠাট্টায় ভয় পেয়ে গিয়েই তুমি ওকে বুঝিয়ে দিয়েছ যে, তুমি হেরে গেছ।’
‘কিন্তু ও মরে গেছে!’ চিৎকার করে বললাম, ‘এসব স্বপ্ন।’
‘কোনটা স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব, কে বলতে পারে। আমার মত হল কোনও রিসক নিয়ো না। যদি ওকে টাকা দাও, তা হলে আবার ও ফিরে আসবে—আরও টাকার লোভে।’
‘কিন্তু আর তো কিছু করার নেই।’ হতাশায় আমি বললাম।
‘নেই কে বলল! আছে। নিনা একবার মারা গেছে। ওকে আর-একবার মরতে হবে।’
‘না! আমি তোমার কথা শুনব না!’
‘তা হলে দেখছি সমস্ত দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে—ছোটবেলায় যেমন নিতাম।…আমার দিকে তাকাও, রাকেশ।’
‘না!’ চেষ্টা করলাম চোখ ঘুরিয়ে নিতে, কিন্তু পারলাম না। ওর জ্বলজ্বলে নেশা-ধরানো দৃষ্টি আমাকে হিপনোটাইজ করে দিল।
‘আমার চোখে তাকাও, রাকেশ।’
‘না! না!’
কিন্তু পারলাম না। বহুবছর আগে, ছোটবেলায়, যেমন হত, সেরকম অবস্থা হল আমার। অভিরামের চোখদুটো ক্রমশ বড় হতে লাগল। যেন দুটো অন্ধকার হ্রদ, আমাকে গ্রাস করতে আসছে।
‘রাকেশ, এবার আমি তোমার শরীর-মন সব দখল করব—ছোটবেলায় যেমন করেছি। আর তোমাকে চলে যেতে হবে এতদিন আমি যেখানে ছিলাম, সেখানে—আমাদের ব্রেনের একেবারে ডিপে, গভীরে।’
আরও কিছুক্ষণ যুদ্ধ করলাম। কিন্তু বিশাল কালো হ্রদের মতো ওর দু-চোখ ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি তলিয়ে যেতে লাগলাম সেই হ্রদের গভীরে। তারপর একটা স্নায়ু-ছেঁড়া যন্ত্রণা অনুভবের সঙ্গে-সঙ্গে অদৃশ্য হল অভিরাম।
