বলুন, ডক্টর?
যে-স্বপ্ন তোমাকে রোজ ট্রাবল দেয়, সেটা আমাকে খুলে বলো। তোমার তো ওটা মনে আছে, আছে না?
স্বপ্ন! হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে!
উত্তেজিত হোয়ো না। শান্তভাবে ধীরে-ধীরে আমাকে সব খুলে বলো।
আমি শান্ত হব। একেবারে শান্ত।
এই তো, লক্ষ্মীছেলের মতো কথা। এবার বলো, প্রথম কোনদিন তুমি স্বপ্নটা দেখলে—কী দেখলে?
প্রথম? প্রথম—ও, সেটা আমার আর অনিতার বিয়ের রাত ছিল। না, না, ভুল বললাম। ওটা ছিল বিয়ের আগের রাত।
ঠিক বলছ?
হ্যাঁ। কোর্ট থেকে কয়েকটা দিন ছুটি নেওয়ার জন্যে সারাটা দিন আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল। সন্ধেবেলা সবকিছু ঠিকমতো হয়েছে কিনা দেখার জন্যে আমি যোধপুর পার্কের এই নতুন বাড়িতে এলাম। বিকজ আমি চাইনি, অনিতার কোনও অসুবিধে হোক। সেখান থেকে শেয়ালদায় নিজের পুরোনো ফ্ল্যাটে ফিরে গেলাম রাত প্রায় এগারোটায়। একেবারে ডগ টায়ার্ড হয়ে। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম। কিন্তু ঘুম এল না। হয়তো ম্যাক্সিমাম টায়ার্ড ছিলাম বলেই। একটা সেকোনাল ট্যাবলেট খেলাম। ঘুম শুরু হয়েছে কি হয়নি, স্বপ্নটা শুরু হল।
কীভাবে শুরু হল, রাকেশ?
স্বপ্নে দেখলাম, টেলিফোন বাজছে। টেলিফোনটা আমার বিছানার পাশের টেবিলেই থাকে। স্বপ্নে আমি উঠে বসলাম, রিসিভার তুলে নিলাম। হঠাৎই মনে হল, এ স্বপ্ন নয়, সত্যি—সত্যিই হয়তো আমি ফোনে কথা বলছি। কিন্তু নেক্সট মোমেন্টেই বুঝলাম, না, আমি স্বপ্ন দেখছি।
কী করে বুঝলে যে, স্বপ্ন দেখছ?
কারণ, ফোনে আমার সঙ্গে কথা বলছে নিনা। আর ঘুমের মধ্যেও আমার স্পষ্ট মনে আছে, নিনা মারা গেছে।
কবে মারা গেছে, রাকেশ?
একবছর আগে। দার্জিলিঙের পাহাড়ি রাস্তায় ও গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল, একটা বাঁকের মুখে চাকা পিছলে ওর গাড়ি খাদে গিয়ে পড়ে। জ্যান্ত অবস্থায় ও পুড়ে মারা যায়।
ও, তা হলে নিনার গলা শুনেই তুমি বুঝলে যে, তুমি স্বপ্ন দেখছ?
হ্যাঁ। ও বলল, ‘রাকেশ, আমি নিনা…রাকেশ, তোমার কী হয়েছে? কথা বলছ না কেন?’
একমুহূর্ত আমি কোনও উত্তর দিতে পারিনি। তারপর স্বপ্নের মধ্যে আমি উত্তর দিলাম, ‘না, তুমি নিনা নও। নিনা মারা গেছে।’
‘জানি, রাকেশ,’ ওর গলায় আমার খুব চেনা ঠাট্টার সুর—বেঁচে থাকতে যেরকম সুরে কথা বলত: ‘জানি, আমি মরে গেছি।’
‘এ শুধু স্বপ্ন—আমার মনের ভুল।’ নিনাকে বললাম, ‘এক্ষুনি আমার ঘুম ভেঙে যাবে—স্বপ্নও মিলিয়ে যাবে।’
উত্তরে মিষ্টি করে হাসল নিনা। বলল, ‘তাই তো আমি চাই। নইলে আমি যখন তোমার কাছে যাব, তখন তো তুমি ঘুমিয়ে থাকবে। আমি এক্ষুনি তোমার কাছে চলে আসছি। জেগে থেকো, লক্ষ্মীসোনা।’
তারপরই মনে হয় ও ফোন নামিয়ে রাখল, ঠিক জানি না। হঠাৎ স্বপ্ন যেরকম বদলে যায়, সেরকম সব বদলে গেল। দেখলাম, আমি জামা-প্যান্ট পরে বিছানায় বসে আছি, হাতে সিগারেট জ্বলছে, অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করছি নিনার আসার জন্য। জানি, ও আসবে না। কিন্তু স্বপ্নে যেরকম অসম্ভবকে সম্ভব বলে মেনে নেওয়া হয়, সেরকম মেনে নিয়ে আমি নিনার জন্যে অপেক্ষা করছি।
দরজার কলিংবেল যখন বেজে উঠল, তখন দুটো সিগারেট শেষ করে ফেলেছি। যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে গেলাম দরজার কাছে। দরজা খুললাম।
কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে নিনা নয়। অভিরাম।
তোমার যমজ ভাই, অভিরাম?
হ্যাঁ, আমার যমজ ভাই। তবে আমার চেয়ে আরও লম্বা, গায়ে অনেক জোর, আর খুব সুন্দর দেখতে। অভিরাম আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কনফিডেন্ট হাসি, চোখে সেই চেনা ছটফটে ভাব।
‘কী ব্যাপার, রাকেশ?’ সে প্রশ্ন করল, ‘ভেতরে ঢুকতে দেবে না নাকি? পনেরোবছর বাদে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম, তবুও?’
‘না, অভিরাম!’ আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘তুমি ফিরে আসতে পারো না!’
‘কিন্তু আমি যে ফিরে এসেছি।’ এ-কথা বলে ও আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল ‘বহুদিন ধরেই ভাবছি তোমার সঙ্গে দেখা করব। তাই আজ রাতের প্রোগ্রাম দেখে আর স্থির থাকতে পারলাম না। চলে এলাম।’
‘তুমি কী জন্যে এসেছ?’ আমি জানতে চাইলাম, ‘তুমি মরে গেছ। ডক্টর রাও আর আমি মিলে তোমাকে খুন করেছি।’
‘নিনাও মারা গেছে,’ অভিরাম বলল, ‘কিন্তু আজ রাতে ও ফিরে আসছে। তা হলে আমি কী দোষ করলাম?’
‘কী চাও তুমি?’
‘শুধু তোমাকে সাহায্যে করতে চাই, রাকেশ। আজ রাতে কেউ একজন তোমার পাশে থাকা দরকার। কারণ, তোমার মরা ওয়াইফের সঙ্গে একা-একা দেখা করতে তুমি রীতিমতো ভয় পাচ্ছ।’
‘চলে যাও, অভিরাম। চলে যাও—’ আমি ওকে রিকোয়েস্ট করে বললাম।
‘দ্যাখো, আবার কে এল।’ দরজার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল অভিরাম, ‘নিশ্চয়ই নিনা। তুমি ওর সঙ্গে একা কথা বলো। তবে মনে রেখো, আমি পাশের ঘরেই আছি। দরকার হলে ডাকবে।’
ও পাশের ঘরে চলে গেল। কলিংবেল অধৈর্যভাবে দ্বিতীয়বার বেজে উঠল। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললাম।
নিনা দাঁড়িয়ে। গায়ে সাদা শিফনের শাড়ি, সাদা ব্লাউজ। মারা যাওয়ার সময়ে যে-পোশাক ওর গায়ে ছিল। ওর পোড়া মুখ বীভৎস। আমাকে পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে ও ঘরে ঢুকল। বাতাসের ঝাপটায় ঢেউ খেলে গেল ওর শাড়িতে। খুব ধীরে অলস ভঙ্গিতে ঘরের ছায়া-ছায়া অংশে গিয়ে দাঁড়াল ও। একটা চেয়ারে বসল।
এক দীর্ঘ মুহূর্ত নিনা নীরব রইল। তারপর বলল, ‘রাকেশ, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, যেন ভীষণ অবাক হয়ে গেছ। যাও, দরজাটা বন্ধ করে দাও। ঠান্ডা হাওয়া আসছে। ঠান্ডা হাওয়া আমার ভালো লাগে না।’
