অমৃতা চোখ বুজে ফেলল। মায়ের কথা মনে পড়ল ওর। ও শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ভালোবাসার কাঙাল হয়ে কী ভুলটাই না ও করেছে!
সুকান্ত মাথা সোজা করে তাকাল। অমৃতার দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে পিছনের দেওয়ালটা ওর নজরে পড়ছে। ওর চোয়াল শক্ত হল। চোখে একটা প্রতিজ্ঞা নিয়ে ও হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল।
ঠিক তখনও তিলটা ওর চোখে পড়ল।
সুকান্ত পাথর হয়ে গেল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল তিলটার দিকে।
অমৃতার ডান উরুর ওপরের দিকে একটু ভিতর ঘেঁষে একটা কালো তিল। মাপে মসুরডালের মতো। কাজলের মতো কুচকুচে কালো। অমৃতার ময়লা রঙের ওপরেও তিলটা জ্বলজ্বল করছে।
কী সুন্দর! অপূর্ব!
সুকান্তর হাত থেকে ছুরি খসে পড়ল। অতি সাবধানে আঙুল বাড়িয়ে তিলটাকে ছুঁয়ে দেখল ও।
আসল।
পোশাকের আড়ালে কেউ কখনও নকল বিউটিস্পট তৈরি করে না।
সুকান্তর শরীরে কাঁটা দিল। আসল সৌন্দর্যকে ছোঁয়ার একটা আলাদা রোমাঞ্চ আছে।
এবারে মুখটা এগিয়ে নিয়ে গেল ও।
আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল অমৃতার তিলে। তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘এ কী সুধারস আনে/আজি মম মন প্রাণে…।’
অমৃতা থরথর করে কাঁপছিল। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সামনের দেওয়ালে ঝোলানো একটা ক্যালেন্ডারের দিকে।
ক্যালেন্ডার আড়াল করে ওর দৃষ্টিপথে এসে হাজির হল সুকান্তর মুখ। অদ্ভুত এক হাসি ওর মুখে আলো জ্বলে দিয়েছে।
‘আপনার সৌন্দর্যের কোনও জবাব নেই, ম্যাডাম। প্রিয়ার তিলের জন্যে কবি সমরখন্দ- বোখারা দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আর আমি আপনার প্রাণ দিতে পারব না! আর আপনি তো জানেন, কিছু দিলে তার বদলে আমি কিছু নিই না। আমি শাইলক নই…।’
এরপর ছুরি-টুরি চটপট সব নিজের ব্রিফকেসে গুছিয়ে নিল সুকান্ত। হাসিমুখে এগিয়ে গেল দরজার কাছে। শেষবারের মতো ফিরে তাকাল অমৃতার দিকে। বলল, ‘এবার ভেবে দেখুন, আমি নাইফম্যান, না লাইফম্যান…।’
তারপর বাইরে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিয়ে গেল।
একটা ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল অমৃতা। ওর মধ্যে তা হলে সৌন্দর্য আছে!
না, এই নাইফম্যানের কথা ও কাউকে বলবে না, ওর গোপন সৌন্দর্য আবিষ্কারের কথা গোপনই থাক।
সত্যি, জীবন কি আশ্চর্য! একতিলের জন্য ও আবার বেঁচে গেল।
এখানে একটা লাশ আছে
তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ, রাকেশ।
হ্যাঁ, ঘুমিয়ে পড়েছি।
তুমি একটু বিশ্রাম করে নাও। ততক্ষণ আমি তোমার ওয়াইফের সঙ্গে একটু কথা বলি।
ঠিক আছে, ডক্টর, আমি বিশ্রাম করছি।
আপনার স্বামী এখন হিপনোটাইজড অবস্থায় রয়েছে, মিসেস শর্মা। আমরা কথাবার্তা বললে ওর কোনও অসুবিধে হবে না।
ঠিক আছে, ডক্টর রাও। বলুন, কী জানতে চান?
আপনার স্বামী যেসব দুঃস্বপ্ন দেখেন, সেগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনি বলেছেন, আপনাদের বিয়ের রাত থেকে ওইসব দুঃস্বপ্নের শুরু, তাই তো?
হ্যাঁ, একসপ্তাহ আগে। বিয়ের অনুষ্ঠানের পর আমরা এখানে আমাদের নতুন বাড়িতে চলে আসি। খাওয়া-দাওয়া করে শুতে যাই প্রায় মাঝরাতে। ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে রাকেশ আমার ঘুম ভাঙায়। তখন সবে ভোর হচ্ছে। ও বিছানায় ভীষণ ছটফট করছিল, আর বিড়বিড় করে কীসব বলছিল। ওকে জাগিয়ে দিলাম। ভয়ে ওর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কাঁপতে-কাঁপতে কোনওরকমে ও বলল, ও একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখছিল।
কিন্তু স্বপ্নের ডিটেইলস কিছুই ওর মনে ছিল না?
না, কিচ্ছু না। ও তারপর ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু পরদিন রাতেও সেই একই ব্যাপার—তার পরদিন রাতেও। প্রত্যেক রাতেই এই একই ব্যাপার চলছে।
রোজ একই নাইটমেয়ার। হুঁ। কিন্তু আপনি ভয় পাবেন না। রাকেশকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। ওকে আমি ঠিক সারিয়ে তুলব।
সেই আশাতেই তো আছি, ডক্টর।
সম্ভবত অভিরাম আবার ওর মনের মধ্যে জেগে উঠতে চাইছে।
অভিরাম? কে অভিরাম?
রাকেশের মনের সেকেন্ড পার্ট। ওর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব।
কী জানি—কিছু বুঝতে পারছি না।
রাকেশের বয়েস যখন বারোবছর, তখন ও একটা মোটর অ্যাক্সিডেন্টে পড়ে। এতে ও ভীষণ শক পায়। তারপর দেখা দেয় স্কিটসোফ্রিনিয়্যা—যার ফলে ওর মধ্যে তৈরি হয়ে যায় দুটো ভিন্ন-ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। একজন হল স্বাভাবিক রাকেশ শর্মা। আর দ্বিতীয়জন, চঞ্চল, ধূর্ত, ইভল। রাকেশ তার নাম দিয়েছিল অভিরাম। বলত, সে ওর যমজ ভাই, ওর মনের অনেক ভেতরে বাসা বেঁধে থাকে।
কী অদ্ভুত!
এ ধরনের ঘটনা সাইকিয়াট্রির হিস্ট্রিতে প্রচুর আছে। রাকেশ যখন চিন্তাগ্রস্ত কিংবা টায়ার্ড হয়ে পড়ে, তখন অভিরাম ধীরে-ধীরে ওর ওপর চেপে বসে—ওকে দখল করে, কন্ট্রোল করে। তারপর ওকে দিয়ে ঘুমিয়ে চলা, বিছানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া—এসব ধরনের বাজে কাজ করায়। অভিরাম যখন ওকে চালায়, তখন রাকেশের কিছুই করার ক্ষমতা থাকে না। কখনও-কখনও তো ওর মনেই পড়ে না, কী হয়েছে। অন্যসময় ভাবে, সবই একটা দুঃস্বপ্ন।
কী বিশ্রী ব্যাপার বলুন তো!
তখন রাকেশ আমার ট্রিটমেন্টে ছিল। আমি ভেবেছিলাম, রাকেশ পুরো সেরে গেছে। অভিরামকে আমরা তাড়িয়ে দিতে পেরেছি। কিন্তু এখন দেখছি…ঠিক আছে, রাকেশকে ওর রোজকার এই দুঃস্বপ্নের ব্যাপারে কোয়েশ্চেন করলেই সব জানা যাবে। ওর স্বপ্নের খুঁটিনাটি জানলেই আমরা আমাদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাব।…রাকেশ!
