নাঃ, শুধু গানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা যায় না। অমৃতা এখন একজন পুরুষকে আঁকড়ে ধরতে চায়—অন্তত একটিবারের মতো।
ওর গানের প্রশংসা অনেকে করে। পুরুষরাই বেশি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। গান ডিঙিয়ে ওরা আর এগোতে চায় না। অমৃতার চেহারা ওদের থামিয়ে দেয়। ওরা সৌজন্যের হাসি হেসে চলে যায়। ওদের আড়ো-আড়ো ছাড়ো-ছাড়ো ব্যবহার অমৃতাকে মনে পড়িয়ে দেয় ওকে দেখতে মোটেই ভালো নয়। ওর মুখটা অচল পয়সার মতো।
আচ্ছা, রূপই কি সব! মনটা কিছু নয়!
তিলতিল সাধনা করে গান শিখেছে অমৃতা। গানকে সুন্দর করে তুলেছে। তেমনি মনটাকেও সুন্দর করে তুলেছে। অথচ সেটার খবর কেউ জানতে চাইল না!
গান গেয়ে এখন যৎসামান্য নাম-ডাক হয়েছে ওর। সকলেই এগিয়ে আসে ওই গান পর্যন্ত—বাইরের কুরূপের আড়াল সরিয়ে মনের অন্দরে কেউ উঁকি দিতে চায় না।
‘আপনি খুব লাকি।’
ভরাট পুরুষালি কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল অমৃতা। মুখ ঘুরিয়েই দেখতে পেল সুন্দর চেহারার এক তরুণকে। কাটা-কাটা নাক, ঠোঁট, চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। ফরসা রং, একমাথা চুল, গায়ে ঢোলা জিনস-এর শার্ট, পায়ে বাদামি কটন প্যান্ট, কোমরে চওড়া বেল্ট, হাতে ছোট্ট একটা ব্রিফকেস।
আর গায়ে কেমন এক হালকা পুরুষ-পুরুষ গন্ধ।
এক নিশ্বাসে যুবকটিকে জরিপ করে নিল অমৃতা।
গানের ক্যাসেটে অমৃতার কোনও ছবি ছাপা হয় না। তাই ওর যারা ফ্যান তারা বেশিরভাগই ওকে চেনে না। বছরে দু-চারটে ফাংশান করে অমৃতা। তার দৌলতে কিছু লোক ওকে চেনে। এই পুরুষটি…।
‘আপনি যেভাবে বেঁচে গেলেন সেটাকে মিরাকল বলে।’ চওড়া হাসল ছেলেটি: ‘এখন কোথাও বসে একটু রেস্ট না-নিয়ে কিছুতেই যেন বাড়ির দিকে রওনা হবেন না! এরকম বিপদ থেকে বাঁচলে পর মনটাকে সেটল করার টাইম দিতে হয়।’
অমৃতা ফুটপাথের ওপর সরে এসেছিল। চারপাশে নজর বুলিয়ে দেখল, সবাই যে-যার কাজে ব্যস্ত—অমৃতার দিকে নজর দেওয়ার সময় কারও নেই। তবুও অমৃতা একটু অস্বস্তি পাচ্ছিল।
‘আপনি গান করেন?’
একটা ধাক্কা খেল অমৃতা। আবার সেই গানের প্রশংসা, ন্যাকা-ন্যাকা অভিনন্দন, তারপর পিঠ বাঁচিয়ে পিঠটান! এর চেয়ে মিনিবাসের ধাক্কা অনেক ভালো ছিল।
‘কী করে বুঝলেন? ভীষণ রুক্ষভাবে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল অমৃতা। তারপর আরও বিরক্ত হয়ে: ‘আপনি কি জ্যোতিষী না কি?’
উত্তরে মিষ্টি করে হাসল: ‘না, জ্যোতিষী নয়…পরপর তিনদিন ওই রেকর্ডিং স্টুডিয়োটা থেকে আপনাকে বেরোতে দেখলাম…তাই। আমি গান ভালোবাসি, তবে ভালো বুঝতে পারি না বলে সবসময় কাঁচুমাচু হয়ে থাকি। যেমন এখন।’
অমৃতার হাসি পেয়ে গেল। ছেলেটিও হাসছে। ওর মুখটা মোটেই কাঁচুমাচু মনে হচ্ছে না। তবে সন্দেহ একটা তৈরি হচ্ছিল অমৃতার মনে। মেয়েদের সঙ্গে গায়ে পড়ে যারা আলাপ করতে চায় এই ছেলেটি কি সেই দলের? বোধহয় না। কারণ আজ পর্যন্ত অমৃতার সঙ্গে গায়ে পড়ে কেউ আলাপ করতে চায়নি। কোনও গীতিকার, সুরকার, কিংবা ক্যাসেট কোম্পানির মালিক কখনও ওকে উলটোপালটা প্রস্তাব দেয়নি। কেউ ডিনারে নিয়ে যেতে চায়নি। কেউ সন্ধের পর ওর এক-কামরার ফ্ল্যাটে আসতে চায়নি। পুরুষের হ্যাংলাপনা থেকে ও বরাবরই নিরাপদে থেকেছে—পঞ্চাশ কি ষাট পেরোনো কোনও মহিলা যেমন নিরাপদ।
‘আপনি কি রোজ এই স্টুডিয়োর ওপরে নজর রাখেন না কি?’
‘না। আসলে সেলসম্যানের চাকরি করি। রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোই আমার পেশা। তারই মাঝে ফাঁক পেলে মানুষ দেখি…ওটা আমার নেশা। এই যে, আমার কার্ড…।’ কথা শেষ হতে-না-হতেই জামার পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে নিয়ে অমৃতার হাতে তুলে দিয়েছে ছেলেটি।
রাস্তার সোডিয়াম-আলোয় কার্ডটা পড়তে পারল অমৃতা।
সুকান্ত চক্রবর্তী। বি.এ.এল.এল.বি। সেলস এক্সিকিউটিভ।
তার নীচে একটা সাহেবি ধরনের কোম্পানির নাম লেখা।
‘আপনার পারসোনালিটি আমাকে খুব স্ট্রাইক করেছে। মিনিবাসের ওরকম ডেঞ্জারাস অ্যাক্সিডেন্ট থেকে বেঁচে যাওয়ার পর আপনাকে যেরকম স্টেডি দেখলাম…রিয়েলি…খুব রেয়ার কোয়ালিটি। যাদের মনের জোর খুব বেশি তাদের সঙ্গে আলাপ করতে আমার ভালো লাগে—।’
‘কেন?’
‘আমার মনের জোর কম—তাই।’
অমৃতা ছোট্ট করে হাসল। মনে-মনে ভাবল, দেখাই যাক না, আলাপটা কতদূর গড়ায়। সুকান্তকে দেখে মনে হচ্ছে না ও সুযোগ-খোঁজা পুরুষের দলে। সেরকম হলে ও অনায়াসে কোনও সুন্দরী মেয়েকে বেছে নিত। সুন্দরী না-হোক, অন্তত অমৃতার মতো বত্রিশ-তেত্রিশের কোনও অসুন্দরী মেয়েকে বেছে নিত না।
আচ্ছা, প্রেম কি এভাবেই শুরু হয়?
ধুৎ, কীসব যা-খুশি ভাবছে অমৃতা। মনে হয়, সুকান্ত…।
‘আমরা কি এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়েই কথা বলব?’ সুকান্ত জিগ্যেস করল, ‘যদি আপনার অমত না থাকে আমরা কোনও একটা দোকান-টোকানে বসতে পারি। অবশ্য আপনার তাড়া থাকলে অন্য কথা।’
তাড়া? আগামী একশো বছরে অমৃতার কোনও তাড়া নেই।
সুতরাং কথা বলতে-বলতে একটা ছোটখাটো রেস্তরাঁয় পৌঁছে গেল ওরা।
ধোঁয়া ওঠা ফিশফ্রাই সামনে রেখে মুখোমুখি বসে চলল কথার-পর-কথা।
‘জানেন, একসময় আমার গায়ক হওয়ার শখ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল না।’
‘কেন? আপনার গলার স্বর তো বেশ…।’
‘দোয়াত আছে, কালি নেই। স্বর আছে, সুর নেই।’ হাসল সুকান্ত। তারপর আলতো করে বলল, ‘আপনার দুটোই আছে। ভগবান আপনাকে অনেক কিছু দিয়েছেন।’
