মাথা নামাল অমৃতা: ‘দিয়েছে—আবার অনেক কিছু দেয়নি।’ কথাটা বলতে গিয়ে অমৃতার গলা কেঁপে গেল।
সুকান্ত বুঝল। বলল, ‘মনখারাপ করবেন না। ভগবান লোকটা কৃপণ নয়। আপনাকে যা দিয়েছে তা-ই যথেষ্ট। ভাবুন তো, যদি এই জীবনটাই আপনাকে না দিত! তখন তো অনেক কিছুই আপনি হারাতেন। এই যে এখন এই রেস্তরাঁয় বসে আপনার সঙ্গে গল্প করছি, সেটাও হত না। তার মানে আমিও অনেক কিছু হারাতাম।’
অমৃতা সুকান্তর মুখের দিকে তাকাল। সুকান্তর কথাগুলো ওর ভালো লেগেছে বলেই তার মধ্যে তোয়াজ আছে কি না খুঁজল।
না, সেরকম কোনও ইশারা পেল না।
‘আপনাকে একটা মনের কথা বলি, ম্যাডাম। এই দেওয়া-নেওয়া ব্যাপারটাই ভারি মিস্টিরিয়াস। এক ধরনের মানুষ আছে যারা কিছু দিলে তার বদলে কিছু নেয়…।’
ঘাড় নেড়ে সায় দিল অমৃতা। হ্যাঁ, এইরকম মানুষ ও দেখেছে।
ফিশফ্রাই-এর টুকরো চিবোতে-চিবোতে সুকান্ত বলল, ‘…ম-ম-ম…আর-এক টাইপের মানুষ আছে যারা কিছু দিলে তার বদলে কিছু নিতে চায় না।’
‘আপনি কোন টাইপের?’ অমৃতা মজা করে জিগ্যেস করল।
‘সেটা বললে কি আপনি বিশ্বাস করবেন? বরং খানিকটা বন্ধুত্ব হোক, তা হলে টের পাবেন।’
তারপর অমৃতার গানের কথা জানতে চাইল সুকান্ত। অমৃতা বলতে লাগল, সুকান্ত মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনতে লাগল। সময় কাটতে লাগল একটু-একটু করে।
অনেক গল্পের পর ওরা উঠল।
সুকান্ত একরকম জোর করেই রেস্তরাঁর বিল মিটিয়ে দিল।
তারপর রাস্তায় পা দিয়ে বলল, ‘আপনি এখন বাড়ি ফিরবেন তো?’
‘হ্যাঁ—।’
‘আপনার বাড়িতে আর কে-কে আছে?’
‘কেউ না। আমি একা।’ একটা বড় শ্বাস ফেলল অমৃতা: ‘শুধু-আমি, আর গান। মা-বাবা আর ছোট ভাই দেশের বাড়িতে থাকে। আমার এই গানের ব্যাপারটা ওরা খুব একটা পছন্দ করে না। আমাকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে।’
‘সেটা আপনাকে দেখে বোঝা যায়।’
‘আপনার বাড়িতে আর কে-কে আছে?’
‘সবাই। তবে মনে-মনে আমি সবসময় একা-একা থাকি।’
‘কেন?’
‘দুঃখ পাওয়া আমার ছোটবেলাকার অভ্যেস। তাই সুখের হদিস পেলে খুব ভয় পাই। এই বুঝি সুখের খেলনাটা কেউ কেড়ে নিল। তাই মনে-মনে একা থাকাটাই ভালো।’
‘আমার ব্যাপারটাও অনেকটা তাই।’ মনখারাপ গলায় বলল অমৃতা।
‘মোটেই না। আপনার গান আছে। এখন বাড়ি গিয়ে আপনি গানের রেওয়াজ করতে বসবেন। আর আমি? হুঁঃ…চারপাশে আড়াল তুলে আকাশপাতাল ভাবব। তবে আজ হয়তো আপনার কথা ভাবব। কালও, পরশুও…। সেইজন্যেই আমার বাড়ি ফেরার তাড়া নেই।’
অমৃতা সুকান্তকে দেখল। রাস্তার ঠিকরে পড়া আলোয় ওর মুখে হাইলাইট তৈরি হয়েছে। সেখানে নুন-গোলমরিচের মতো দুঃখ ছিটিয়ে দিয়েছে কেউ।
জিগ্যেস করে জানল সুকান্তর বাড়ি টালিগঞ্জে। তাও ওর বাড়ি ফেরার তাড়া নেই! সেকি অমৃতার জন্য?
অসম্ভব। মনে-মনে নিজেকে এক বকুনি লাগাল অমৃতা। একটু আলাপ হতে-না-হতেই বুকের ভেতরে সারস পাখি ডানা মেলে দিয়েছে!
‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ সুকান্ত জানতে চাইল।
‘কলেজ স্ট্রিটের কাছে…সূর্য সেন স্ট্রিটে…।’
‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগছিল। আপনার বাড়ি গেলে আপনাকে ব্রিফকেসটা খুলে দেখাতে পারতাম। রাস্তায় তো আর দেখানো যায় না!’
‘কী আছে আপনার ওই ব্রিফকেসে?’ হেসে জিগ্যেস করল অমৃতা।
‘আমার সবকিছু! আমার জীবনদর্শন। মানে…ঠিক বোঝাতে পারছি না। থাকগে, পরে কখনও দেখানো যাবে।’
ব্রিফকেসটা কি অজুহাত? এই ছুতোয় অমৃতার ফ্ল্যাটে গিয়ে ওর সঙ্গ চাইছে সুকান্ত? না, না, প্রথম আলাপেই এতটা দুঃসাহসী কেউ হবে না। তা ছাড়া, ও যদি আজ চলে যায়, আবার কবে ওর সঙ্গে অমৃতার দেখা হবে…।
‘চলুন, আপনাকে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত এগিয়ে দিই।’ নিচু গলায় সুকান্ত বলল।
ওর কি অভিমান হল? নিশ্চয়ই ও অমৃতাকে ভিতু ভাবছে।
‘আপনার ব্রিফকেসে কী আছে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।’ কিশোরী গলায় আবদার করল অমৃতা।
‘খুব দেখতে ইচ্ছে করছে?’
‘ইয়েস, খুব।’
‘ও.কে.। তা হলে দুটো অপশন দিচ্ছি। এ—আপনার বাড়ি যাব না। বি—আপনার বাড়ি যাব। বলুন, আপনার চয়েস কোনটা?’
‘বি।’
‘শিয়োর?’
‘হ্যাঁ—।’
‘কনফিডেন্ট?’
‘ইয়েস।’
‘ফাইনাল জবাব? কম্পিউটার লক কর দিয়া যায়ে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ও.কে. ডান।’ বলে হেসে অমৃতার দিকে ডানহাত বাড়াল সুকান্ত।
অমৃতাও হাত বাড়াল।
ওরা হ্যান্ডশেক করল।
ঠিক তখনই অচেনা এক উত্তেজনার তরঙ্গ অসংখ্য ডালপালা মেলে ছাড়িয়ে গেল অমৃতার শরীরে। অমৃতার ভালো লাগল। এরকম নতুন ভালো-লাগা আগে কখনও ও টের পায়নি।
হাত নেড়ে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করাল সুকান্ত। তারপর দুজনে উঠে পড়ল তাতে। অমৃতা লক্ষ করল, সুকান্ত ভদ্রমাপের দূরত্ব রেখেই পাশে বসল।
মিনিটকুড়ির মধ্যেই অমৃতার বাড়ির কাছে পৌঁছে গেল ট্যাক্সি। অমৃতা কিছু বলে ওঠার আগেই সুকান্ত ভাড়া মিটিয়ে দিল। তারপর ঢুকে পড়ল সদর দরজা পেরিয়ে।
বাড়িটা বেশ পুরোনো। দু-পাশের দুটো বাড়ির সঙ্গে দেওয়ালে দেওয়াল ঠেকিয়ে তৈরি। দু-পাশের বাড়ি দুটো রং-চং করে ভোল ফেরানো হয়েছে। তাদের তুলনায় মাঝেরটা বয়েসের ভারে এতই নুয়ে পড়েছে যে, পাশের বাড়ি দুটো যেন দু-পাশ থেকে বাড়িটাকে সযত্নে সামলে রেখেছে। গান্ধীজির কথা মনে পড়ে গেল সুকান্তর—দুই সঙ্গিনীর কাঁধে ভর দিয়ে তাঁর পথ চলা।
