তারপর এগিয়ে এল আমার কাছে।
আমি তখন কালো পোশাক পরা লোকটার হাতে বন্দি হয়ে যোবা চোখে ওদের দেখছি।
অনামিকা এবার হেসে জিগ্যেস করল, ইন্দ্রজিৎ, তুমি কি এখন সবকিছু ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছ?
আমি চারপাশে তাকালাম।
ভূত কেবিনটা এখন ভূত কেন হয়ে গেছে। আর গলা রাটা হয়ে গেছে গলা টা। এ ছাড়া সবকিছুই আমি অসম্পূর্ণভাবে একটু-একটু দেখতে পাচ্ছি।
আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। এ আবার কোনদেশি চোখের অসুখ!
আমি যে কিছু বলতে চাই সেটা বুঝতে পেরে অনামিকা লোকটাকে ইশারা করল। লোকটা আমাকে ছেড়ে দিল।
আমি গলায় হাত বুলিয়ে কয়েকবার কাশলাম। তারপর কোনওরকমে বললাম, আমার চোখে কোনও একটা গণ্ডগোল হয়েছে। আমি সবকিছুই কেমন খাপছাড়া দেখছি। তোমার ডানহাতের খানিকটা আমি দেখতে পাচ্ছি না। ওই চেয়ারটার মাত্র দুটো পায়া দেখতে পাচ্ছি। আর তার দিয়ে ঝোলানো ওই ল্যাম্পটার তারের মাঝখানটুকুই নেই।
আমার কেমন অসহায় লাগছিল। চারপাশটা কেন এমন খাপছাড়াভাবে মুছে যাচ্ছে?
অনামিকা আমার থুতনি ধরে আদর করে নেড়ে দিল, বলল, ইন্দ্রজিৎ, সেই তখন থেকেই তো তোমাকে বলছি যে, সময় হয়ে গেছে। তোমার মাথার ভেতরে গোলমাল হতে শুরু করেছে।
আমার বয়েস আটাশ, স্বাস্থ্য ভালো, শরীরে কোনও অসুখ নেই। তা হলে হঠাৎই আমার এসব কী শুরু হল!
অনামিকা এবার গলা নামিয়ে সমবেদনার সুরে বলল, আসলে পৃথিবীতে তোমার থাকার পালা শেষ। তাই তোমার ভেতরকার সফটওয়্যার ধীরে-ধীরে মুছে যাচ্ছে। কোনও প্রোগ্রামই আর ঠিকঠাক কাজ করছে না…তাই তুমি একটু-একটু দেখতে পাচ্ছ…।
আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। ওর কোনও কথাই আমি ঠিকমতো বুঝতে পারছিলাম না। নাকি বুঝতে চাইছিলাম না?
আমার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসল অনামিকা, বলল, তুমি আসলে একটা রোবট, ইন্দ্রজিৎ। রোবট নাম্বার থ্রি এক্স ওয়ান বি ওয়ান। হুবহু মানুষের মতো দেখতে রোবট যাকে অ্যানড্রয়েড বলে। অ্যানড্রয়েডদের শরীরে ছুরি বসালে রক্ত পড়ে–মানুষের মতো। ওদের সবকিছুই মানুষের মতো–শুধু ভেতরে ব্যাটারি থাকে, মাইক্রোচিপ থাকে, মোটর থাকে। তোমাকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল নিম্নমধ্যবিত্তদের জীবনযাপন সম্পর্কে ডেটা কালেক্ট করতে। দু-বছর ধরে তুমি সেসব জোগাড় করেছ। তোমার শরীরের ভেতরে সেগুলো অটোমেটিকভাবে স্টোন্ড হয়ে গেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনামিকা? কিন্তু গোলমাল হল, তুমি এখানকার লোয়ার মিডল ক্লাস লাইফটাকে ভালোবেসে ফেললে। ভুলে যেতে চাইলে যে, তুমি অন্য গ্রহ থেকে আসা একটা রোবট। তাই তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমাদের আসতে হয়েছে।
অনামিকার মুখটা আমার চোখের সামনে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছিল। কালো পোশাক পরা লোকটার বাঁ-হাত আর মাথার অর্ধেকটা নেই। চারপাশের মানুষজন, চেয়ার-টেবিল, সাইনবোর্ডের লেখা, সবই ধীরে-ধীরে অসম্পূর্ণ থেকে আরও অসম্পূর্ণ হচ্ছে। আমার চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে আমার নিম্নমধ্যবিত্ত নিঃসঙ্গ জীবন–যে-জীবনকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি।
স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম, এই নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন, এই নিম্নমধ্যবিত্ত রেস্তোরাঁ ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হচ্ছে।
অনামিকা ওর সঙ্গীকে বলল, ওকে ওই আয়নাটার কাছে নিয়ে চলো।
লোকটা আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল বেসিনের কাছে। সেখানে বড় মাপের একটা আয়না লাগানো আছে বয়েসের ভারে মলিন অথচ অভিজাত আয়না।
আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠলাম। আমার শরীরের অনেকটাই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন ছায়া দেখে আমার কান্না পেয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি অসহায়ভাবে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলাম।
আমি তা হলে শুধুই হার্ডওয়্যার আর সফ্টওয়্যার! নিছকই একটা রোবট!
কলকাতার নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্গে আমার কোনও যোগ নেই! যাকে আমি ভালোবাসি তার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই!
আমার কান্নার মাঝেই অনামিকার গলা পেলাম। কালো পোশাক পরা লোকটাকে ও বলল, ইন্দ্রজিতের ব্যাটারিটা শর্ট সার্কিট করে দাও। নইলে ফেরার সময় ঝামেলা হবে।
আয়নায় আমার ছায়া তখন অসম্পূর্ণ থেকে আরও অসম্পূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।
