ওর আপনি থেকে তুমি-তে যাওয়া ওর শরীরের বাঁকগুলোর মতোই কী স্বাভাবিক!
আমি পালটা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমাকে চমকে দিল।
বিভূতি কেবিন-এর জীর্ণ মলিন রান্নাঘরে একটিমাত্র দরজা ও একটি বড় মাপের গরাদহীন জানলা। কিচেন থেকে চপ-কাটলেট ইত্যাদি জানলা দিয়েই বেয়ারাদের হাতে আসে। সেই জানলা এবং দরজার মাথায় বড় বড় দুটো কাচের সাইনবোর্ড। তাতে প্রকাণ্ড মাপের লাল হরফে লেখা বিভূতি কেবিন এবং মোগলাই পরোটা। আমি যখনই এখানে আসি তখন এই লেখাগুলোর দিকে মুখ করে বসি। আজও তাই।
হঠাৎই দেখি বিভূতি কেবিন লেখাটার কিছু কিছু জায়গা অদৃশ্য হয়ে গিয়ে শুধু পড়া যাচ্ছে ভূত কেবিন। আর দ্বিতীয় সাইনবোর্ডের মোগলাই পরোটা হয়ে গেছে গলা রাটা।
আমার অবাক ভাবটা অনামিকার নজরে পড়েছিল। ও পেছন ফিরে তাকাল একবার। তারপর জিগ্যেস করল, কী হল! কী দেখে অমন চমকে উঠলে?
আমি ওকে ব্যাপারটা বললাম।
তাতে ও ঝরনার জলে ভাসিয়ে দেওয়া একরাশ রঙিন কাচের চুড়ির মতো রিনরিন করে হেসে উঠল। সে-হাসি আর থামতেই চায় না।
রেস্তোরাঁয় অন্যান্য আড্ডাবাজ পরচর্চা-ভক্ত লোকগুলো ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখতে লাগল।
আমি চাপা গলায় বললাম, কী হচ্ছে! সবাই দেখছে!
অতি কষ্টে হাসি থামিয়ে অনামিকা বলল, এবার তো মানবে যে, সময় হয়ে গেছে। কোনও লেখারই সঠিক মানে তোমার চোখে আর ধরা পড়বে না। আচ্ছা, আমার এই কড়ে আঙুলটা ধরো তো! বলে ও টেবিলের ওপরে রাখা বাঁ-হাতটা এগিয়ে দিল আমার কাছে।
অন্য সময় হলে ওর হাতের ছোঁয়া পাওয়ার আশায় আমার মন আবেগে উথালপাতাল হয়ে যেত, রক্তকণিকা-রক্তকণিকায় বেধে যেত মরণপণ লড়াই।
কিন্তু এখন ওর কড়ে আঙুলহীন বাঁ-হাতটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন গুড়গুড় করে উঠল। একটা পরদেশি ভয় ঠান্ডা শিরদাঁড়া বেয়ে কুলকুল করে নামতে লাগল।
আমি অনামিকার কথা অমান্য করতে পারলাম না।
চায়ের কাপটা আলতো করে সরিয়ে দিলাম একপাশে। তারপর আমার বাঁ-হাত গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যেতে লাগল ওর বাঁ-হাতের দিকে কড়ে আঙুলের শূন্যস্থান লক্ষ্য করে।
শূন্যস্থানে পৌঁছেই আমি অবাক!
আমার ছোঁয়ায় ওর কড়ে আঙুল আমি দিব্যি টের পেলাম। অথচ সেই কড়ে আঙুলটা আমি একফেঁটাও দেখতে পাচ্ছি না!
আমি হতবাক হয়ে অনামিকার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ও ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, ইন্দ্রজিৎ সেন, এবার বুঝতে পারছ, তোমার গল্প শেষ!
আমি ওর কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সে কথাই জানালাম ওকে। তারপর বললাম, এসব কাণ্ডকারখানা আমার কাছে ভূতুড়ে ঠেকছে। বরং চলো, আমরা অন্য কোথাও গিয়ে একটু নিরালায় বসে গল্প করি। তোমাকে ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে।
অনামিকা ওর বাঁ-হাতটা টেনে সরিয়ে নিল। তারপর শক্ত গলায় বলল, তুমি দেখছি ভালো কথার মানুষ নও! তা হলে খারাপভাবেই কিছু করা যাক।
কথাটা বলেই ও ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আবার সেই ধাতব বলটা বের করল। ওটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কী একটা করতে লাগল।
সঙ্গে-সঙ্গে দেখি রেস্তোরাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কালো ফুলশার্ট কালো জিন্স পরা ছিপছিপে লম্বা চেহারার লোকটা। মুখে অভিব্যক্তির কোনও লেশমাত্র নেই।
একটা নাম-না-জানা আতঙ্ক আমাকে পাগল করে দিল।
আমার ডানহাতটা ব্রিফকেসের ওপরেই ঘোরাফেরা করছিল। এক ঝটকায় ব্রিফকেসটা খুলে ফেললাম। চোখের পলকে জেনারেটার গান বের করে অনামিকাকে লক্ষ্য করে ফায়ার করলাম।
ও হাতের বলটা নিয়ে কী একটা করল। দেখলাম, জেনারেটার গানের তীব্রশক্তির কণার স্রোত ওকে মোটেই কাবু করতে পারল না। ও অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় উঠে দাঁড়িয়ে শ্বেতপাথরের টেবিলটাকে উলটে দিল আমার ঘাড়ের ওপর। আর একইসঙ্গে দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার করে কী যেন বলল।
রেস্তোরাঁয় হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। চেয়ার উলটে টেবিল কাত করে যে যেদিকে পারে ছুটছে। সেইসঙ্গে কানে আসছে আতঙ্কের চিৎকার।
কালো পোশাক পরা লোকটা এসবে ভ্রূক্ষেপও করল না। হরিণের মতো সাবলীল তিনটে লাফ দিয়ে ও চলে এল আমার কাছে।
আমি তখন মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছি। একইসঙ্গে জেনারেটার গানটাকে নিয়ে আসতে চাইছি শত্রুর মুখোমুখি।
কালো পোশাক পরা লোকটা ঝুঁকে পড়ে ডানহাতে আমার টুটি টিপে ধরল। আর বাঁ-হাতে জেনারেটার গানসমেত আমার ডানহাত চেপে ধরল।
আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বুঝতে পারছিলাম, এই লোকটার শক্তির সঙ্গে লড়াই করে কোনও লাভ নেই। লোকটার হাতগুলো কি ইস্পাতের তৈরি?
এক হ্যাঁচকায় সে আমাকে খাড়া করে দাঁড় করিয়ে দিল। তার পর এক ভয়ংকর মোচড় দিল আমার ডানহাতে। আমার কবজির জোড় যেন খুলে গেল। ব্যথার বিদ্যুৎ হাত বেয়ে ছিটকে গেল মাথায়। জেনারেটার গানটা খসে পড়ল হাত থেকে। মেঝেতে পড়ে রইল অনাথের মতো।
রেস্তোরাঁর লোকজন সব ফাঁকা হয়ে গেছে। শুধু মালিক চোখ ছানাবড়া করে জরাজীর্ণ ক্যাশ কাউন্টারে বসে আছে। আর তিনজন বেয়ারা আতঙ্কে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে রাঁধুনিদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে।
অনামিকা ওদের সবাইকে উদ্দেশ করে গলা তুলে বলল, আপনাদের কোনও ভয় নেই। আমরা শুধু একে ধরে নিয়ে যেতে এসেছি। আমরা সিক্রেট পুলিশের লোক।
কথাটা বলে সুন্দর করে হাসল ও।
