বৃদ্ধের পোশাক থেকে আতর টাইপের একটা গন্ধ বেরোচ্ছিল। কাউন্টার ডিঙিয়ে ওপাশে ঢুকতেই গন্ধটা আরও উগ্র হল।
পীতাম্বরের কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছিল।
আধুনিক পদ্ধতিতে ই-মেইল-এ বিজ্ঞাপন। মোবাইল নম্বরে ফোন করে শোনা গেল আধুনিক তরুণীর মিষ্টি গলা। অথচ আসল জায়গায় এসে এ কী উলটো ছবি! যেমন সেকেলে জরাজীর্ণ দোকানঘর তেমনই নড়বড়ে দোকানদার! ব্যাপারটা পুরোপুরি ঠাট্টা নয়তো?
পরদা সরিয়ে ভেতরের ঘরটায় ঢুকলেন বৃদ্ধ। পিছন-পিছন পীতাম্বরও।
ঢুকতেই পীতাম্বরের নাকে বিচিত্র গন্ধের একটা ঝাপটা এসে ধাক্কা মারল। ওঁর মনে হল, একটা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে এসে পড়েছেন। কারণ, ঘরটা শিশি-বোতলে ছয়লাপ। তার কোনওটায় সাদা পাউডার, কোনওটায় রঙিন তরল, আবার কোনওটায় ছোট কিংবা বড় ট্যাবলেট। এ ছাড়া শুকনো গাছগাছড়া শেকড়বাকড়ও কিছু কম নেই।
ঘরের এককোণে একটা ছোট টেবিল। তার দু-দিকে মোট তিনটে চেয়ার। টেবিলে কিছু কাগজপত্র, খাতা, তিনটে বলপয়েন্ট পেন, আর একটা পুরোনো মডেলের টেলিফোন।
বৃদ্ধ একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন। একটু হাঁপ ছেড়ে টেবিলের উলটোদিকের একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ‘বসুন।’
পীতাম্বর চারপাশে নজর বোলাতে-বোলাতে বসে পড়লেন।
‘এবারে বলুন স্যার, আপনার কী উপকার করতে পারি…।’
‘ওই যে বললাম…ওই পয়জন গেম-এর ব্যাপারটা…।’
পীতাম্বরকে খুঁটিয়ে দেখলেন বৃদ্ধ। তারপর ধীরে-ধীরে বললেন, ‘আসলে ওই গেমের একটা অ্যানিমেশান সিডি আমরা বিক্রি করি। দাম দুশো তিরিশ টাকা। কম্পিউটারে গেমটা লোড করে আপনি খেলতে পারেন। মানে, টাইম পাস করার জন্যে। ওতে অনেক অপশন আছে, অনেক পাজল আছে পয়েন্ট আছে—আপনি ভালোই এনজয় করতে পারবেন…।’
পীতাম্বরের মুখে বিরক্তি আর হতাশা ফুটে উঠেছিল। সেটা লক্ষ করে খুকখুক করে হাসলেন বৃদ্ধ। ভুরু উঁচিয়ে সরাসরি তাকালেন পীতাম্বরের চোখে। বললেন, ‘বুঝতে পারছি, আপনি খুশি হননি…।’
কেমিক্যালের শিশি-বোতলগুলোর দিকে ইশারা করে দেখালেন পীতাম্বর: ‘এগুলো তা হলে কী? ওই গেমের জন্যে? নাকি…।’
‘ঠিক ধরেছেন।’ ওপর-নীচে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ: ‘এগুলো আসল পয়জন গেমের জন্যে।’ হঠাৎই শিরদাঁড়া সোজা করে বসলেন। ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘বলুন, কে আপনাকে ট্রাবল দিচ্ছে? কাকে আপনি মাইনাস করতে চান?’
পীতাম্বর এ ধরনের সরাসরি প্রশ্নে একটু বিব্রত হলেন। চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন। এদিক-ওদিক তাকালেন।
বৃদ্ধ হেসে বললেন, ‘সিক্রেসি আমার গুডউইল। আমি ক্লায়েন্টদের চাহিদা মেটাই—বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিই, ব্যস।’
কেমিক্যালের গন্ধে পীতাম্বরের দম আটকে যাচ্ছিল। মাথার ওপরে ছোট একটা পাখা ঘুরলেও পীতাম্বর বেশ ঘামছিলেন।
‘আমি…মানে…।’
‘আপনি কি আপনার ওয়াইফকে সরাতে চান?’
বৃদ্ধের প্রশ্নে যেন ইলেকট্রিক শখ খেলেন পীতাম্বর। ওঁর শরীর কেঁপে গেল। মনের কথা পড়তে পারে নাকি এই বুড়োটা!
দোকানদার সবজান্তা-হাসি হাসলেন: ‘অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই। আমার কাছে হাজব্যান্ড-ওয়াইফ-এর কেসই বেশি আসে। হয় হাজব্যান্ড ওয়াইফকে সরাতে চায়, নয় ওয়াইফ হাজব্যান্ডকে। আপনি…।’
বৃদ্ধকে কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়ে পীতাম্বর বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—ওয়াইফকে।’
জিভ টাকরায় ঠেকিয়ে একটা দুঃখের শব্দ করলেন বৃদ্ধ। নরম গলায় বললেন, ‘একটা সময়ের পর সব বিয়ে কেমন তেতো হয়ে যায়। তখন মনটা মুক্তি চায়। কিন্তু ”মুক্তি, ওরে মুক্তি কোথায় পাবি…” ‘ হাসলেন বৃদ্ধ: ‘আর সেইজন্যেই আপনাদের মতো নিপীড়িত ক্লায়েন্টদের আমি সার্ভিস দিই…।’
‘এবারে আসল কথায় আসি—’ হাতে হাত ঘষে পীতাম্বরের দিকে ঝুঁকে এলেন বৃদ্ধ: ‘যে আলট্রানিউ পয়জনটার কথা আপনাকে এখন বলব সেটা আমার বাবার আবিষ্কার। আমার বাবা নেপালপদ সরকার এককালের বিখ্যাত কোবরেজ ছিলেন। খাবার তৈরি মোদক একবার খেলে মানুষ নেশার ফাঁদে পড়ে যেত। বাবা সবসময়েই হাজাররকম গাছগাছড়ার নির্যাস আর কেমিক্যাল নিয়ে হাজাররকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তো ওইসব করতে-করতেই একদিন—আজ থেকে প্রায় বাহাত্তর বছর আগে—এক মারকাটারি বিষ আবিষ্কার করলেন। তার কেমিক্যাল ফরমুলা এখন আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।’
পীতাম্বর অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘মারকাটারি বিষ মানে?’
এ-প্রশ্নে বৃদ্ধ বেশ মজা করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘মারকাটারি মানে একেবারে স্পেশাল টাইপের অব্যর্থ বিষ। এই ধরুন খাবারের মধ্যে এই বিষ মাপা পরিমাণে মিশিয়ে আপনি আর আপনার ওয়াইফ একসঙ্গে খেয়ে নিলেন। আপনার ওয়াইফ যে মারা যাবেন তার একেবারে ফুল গ্যারান্টি। কিন্তু আপনি, বিষাক্ত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেও বেঁচে যাবেন। মানে, দু-চারদিন নার্সিংহোমে কাটাতে হলেও প্রাণে বেঁচে যাবেন। তখন পুলিশ আপনাকে মোটেই সন্দেহ করবে না—যেহেতু একই বিষ মেশানো খাবার আপনিও খেয়েছেন, অথচ লাকিলি আপনি বেঁচে গেছেন।
‘ব্যস, তখন মুক্তি—এবং মনের মতো করে নবজীবন শুরু। এককথায় আনন্দের আর সীমা নেই? কী বলেন?’
পীতাম্বর মন্ত্রমুগ্ধের মতো বৃদ্ধের কথা শুনছিলেন। এসব কি রূপকথা, নাকি বাস্তব? ওঁর বুকের ভেতরে হাতুড়ি পেটাচ্ছিল কেউ, আর অঝোরে লোভের লালা ঝরছিল।
কিন্তু ভদ্রলোকের কথাবার্তায় কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে না! বিষ মেশানো খাবার খেলেন দুজন—কিন্তু একজন বেঁচে যাবে কেমন করে? তার রহস্যটা বৃদ্ধ এখনও ফাঁস করেননি।
