কেমন করে বলতে পারেন?
বিষ মেশানো খাবার খেল তিনজন। একজন মারা গেল। বেঁচে রইল দুজন।
বলুন, কোন ম্যাজিকে এটা সম্ভব?
ই-মেইলটায় এইরকম অদ্ভুত তীব্র সব প্রশ্ন। আর তার সঙ্গে কার্টুন ছবির ঢঙে আঁকা অ্যানিমেশান। খাবার টেবিলে বসে সবাই খাবার ভাগ করে নিচ্ছে। তাতে নীলরঙের বিষ মেশানো হচ্ছে। তারপর সবাই তৃপ্তি করে খাচ্ছে। এবং কয়েকজন টেবিলেই ঢলে পড়ছে—বাকি কয়েকজন দিব্যি বেঁচে থাকছে।
সিনেমার মতো বারবার একই ঘটনা দেখাচ্ছে কার্টুন অ্যানিমেশান। তার নীচে বিজ্ঞাপনের কায়দায় নানান স্লোগান লেখা। আর সবশেষে একটা মোবাইল নম্বর। নম্বরটার পাশে লাল রঙের হরফে লেখা: রয়েছে ইফ ইউ ওয়ান্ট টু প্লে দ্য পয়জন গেম কনট্যাক্ট ইমিডিয়েটলি।
পীতাম্বর ই-মেইলটা বারবার পড়লেন। তারপর পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলেন। কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে মোবাইলের বোতাম টিপে নম্বরটা স্টোর করে নিলেন।
পদ্মাবতী এখন বাড়িতে নেই। নিশ্চয়ই কুকুরটাকে বগলদাবা করে কোথাও ঘুরতে গেছে। অথবা দুজনে কোনও জলপান স্টোর্সে পাশাপাশি গ্লাস হাতে বসে চাপা গলায় বুড়বুড়ি কাটছে।
তবুও কী ভেবে কম্পিউটার-টেবিল ছেড়ে ঘরের বাইরে এলেন পীতাম্বর। ফ্ল্যাটের এ-ঘর ও-ঘর একবার ভালো করে দেখে নিয়ে নিশ্চিত হলেন যে, পদ্মাবতী সত্যিই ফ্ল্যাটে নেই।
তারপর ‘আলট্রানিউ পয়জন গেম’-এর ফোন নম্বরে ফোন করলেন।
‘গুড মর্নিং। আলট্রানিউ পয়জন গেম। মে আই হেলপ ইউ?’ মিষ্টি গলায় একটি মেয়ে কথা বলল।
পীতাম্বর মাথা চুলকোলেন দুবার। তারপর খসখসে গলায় বললেন, ‘আপনাদের এই নতুন পয়জন গেমটার ব্যাপারে একটু ডিটেইলসে জানতে চাই…।’
কথাবার্তা চালাতে কোনও অসুবিধে হল না। ওদের ঠিকানা লিখে নিলেন পীতাম্বর। বললেন, যে, আগামীকাল তিনি ওদের অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করবেন।
মেয়েটি একগাল হেসে বলল, ‘আই ওয়েলকাম ইউ টু আওয়ার গেমল্যান্ড, স্যার..।’
পীতাম্বরের বুকের ভেতরে ধকধক শব্দ হচ্ছিল। বারবার ভাবছিলেন, ব্যাপারটা কি শুধু গেম, নাকি তার চেয়েও কিছু বেশি?
এই কথা ভাবতে-ভাবতেই পরদিন পয়জন গেমের ঠিকানায় পৌঁছে গেলেন পীতাম্বর। এবং ওদের দোকান—কিংবা অফিস—দেখে রীতিমতো হতাশ হলেন।
থুত্থুড়ে একটা তিনতলা বাড়ি কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার বাইরের পলেস্তারা-খসা নোনা-ধরা চেহারাটা এমন যেন আগমার্কা ভূতুড়ে বাড়ি। দেখে পীতাম্বরের মনে হল, জোরে ঝড়ঝাপটা এলেই কাঠামোটা হুড়মুড় করে খসে পড়বে।
বাড়ির একতলায় একটা ছোট দরজা। তার মাথাতেই একটা বড় সাইনবোর্ড। বোর্ডের লেখা যথেষ্ট রং-চটা হলেও পড়া যাচ্ছে: রানিবালা চিকিৎসালয়। তার নীচে লেখা: অব্যর্থ কবিরাজি ঔষধে বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়া দোকানের ঠিকানাটা শেষ লাইনে লেখা। কাঁচা হাতে নতুন রং বুলিয়ে ঠিকানাটাকে স্পষ্ট করা হয়েছে।
ঢুকব-কি-ঢুকব-না করেও দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়লেন পীতাম্বর। বাড়িটার বাইরের চেহারা যেমন ভেতরটাও তাই। সামনে তেলচিটে ধরা কাঠের শো-কেস কাম কাউন্টার। তার কাচগুলো সব ময়লা হলদেটে। কোনও-কোনও ফাটা কাচ আঠা দিয়ে কাগজ জুড়ে মেরামত করা হয়েছে।
ঘরের পিছনের দেওয়ালে দুটো বড়-বড় কাঠের আলমারি। আলমারির পাল্লায় কাচ বসানো। তবে কয়েকটা খোপে কাচ নেই। আর কয়েকটা ফাটা কাচ কাগজ সেঁটে সামাল দেওয়া হয়েছে। কাচগুলো ময়লা হলেও তার ভেতর দিয়ে তাকে রাখা প্রচুর শিশি-বোতল বেশ নজরে পড়ছে। ডানদিকের আলমারির পাশ ঘেঁষে একটা সরু পথ। পথের মুখ কালো পরদায় ঢাকা।
পীতাম্বর ঘরটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। ঘরের ফাঁকা দেওয়ালের বেশিরভাগ অংশই নানান ঠাকুর-দেবতার ক্যালেন্ডারে ঢাকা। সিলিং-এ ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে একটা বেঢপ মাপের পাখা ঘুরছে। তার হাওয়ায় ক্যালেন্ডারগুলো ছটফটে পাখির মতো উড়ছে।
ঘরে কাউকে দেখতে পেলেন না পীতাম্বর। ভুরু কুঁচকে গেল। তা হলে কি চলে যাবেন? কিন্তু ঠিকানাটা তো ঠিক-ঠিক মিলেছে!
শেষ পর্যন্ত কাউন্টারে ঠকঠক করে শব্দ করলেন, আর একইসঙ্গে ডেকে উঠলেন, ‘কেউ আছেন?’
সঙ্গে-সঙ্গে ‘আছি—আছি—’ বলতে-বলতে একগাল স্মিত হাসি নিয়ে একজন বেঁটেখাটো চেহারার বৃদ্ধ কালো পরদা সরিয়ে কাউন্টারের কাছে চলে এলেন। রং ফরসা। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। মাথার চুল সাদা ধপধপে হলেও গোঁফে সাদা-কালোর মিশেল রয়েছে।
বৃদ্ধের গায়ে একটা ময়লা ঘিয়ে রঙের ফুলহাতা শার্ট। পায়ে একইরকম ময়লা একটা খাকি প্যান্ট।
পীতাম্বর লক্ষ করলেন, বৃদ্ধ একটু খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটছেন।
‘বলুন—’ বলে ছোট্ট করে কাশলেন। ডানদিকের গালটা একবার চুলকে নিলেন।
‘আমার ই-মেইল-এ আপনাদের একটা গেম—মানে, আলট্রানিউ পয়জন গেম—তার একটা অ্যাড দেখেছি…।’ পীতাম্বর ইতস্তত করে একটু থামলেন।
বৃদ্ধের উজ্জ্বল চোখ সরাসরি ভেদ করল পীতাম্বরকে। একটু হেসে যেন অভয় দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—বলুন…।’
‘মানে, ওই পয়জন গেমটা সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিতে এসেছি। ওটার অ্যানিমেশান দেখে এত ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে…।’
‘তাই?’ পীতাম্বরকে জরিপ করলেন বৃদ্ধ। একটুকরো শব্দ করে হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আসুন—ভেতরে আসুন—।’
কাউন্টারের একপাশের ডলা তুলে বৃদ্ধ পীতাম্বরকে ভেতরে আসতে ইশারা করলেন।
