সে-কথা জিগ্যেস করতেই টেবিলে চাপড় মেরে হেসে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘ওটাই তো আসল মিস্ট্রি। ওটার জন্যেই তো আমার এত পসার।
‘এবার মনোযোগ দিয়ে কৌশলটা শুনুন…’ বৃদ্ধ বড় করে একটা হাই তুললেন। হাঁ করে মুখের সামনে দু-আঙুলে কয়েকবার তুড়ি বাজালেন। তারপর: ‘ওই বিষটার একটা অ্যান্টিডোট—মানে, প্রতিষেধক—বাবা তৈরি করতে পেরেছিলেন। আসলে সেটাও একরকমের হালকা বিষ।
‘বিষ মেশানো খাবার খাওয়ার আগে…ঠিক তিনঘণ্টা আগে…ওই অ্যান্টিডোটটা খেয়ে নিতে হবে। তা হলেই আপনি হয়ে গেলেন পুরোপুরি সুরক্ষিত। তখন মনের আনন্দে বিষ মেশানো খাবার খান—নো প্রবলেম। তবে হ্যাঁ…’ মাথা চুলকোলেন বৃদ্ধ। চোয়ালে হাত বোলালেন। বললেন, ‘তবে হ্যাঁ…একটু কষ্ট তো হবেই। আপনি বিষ মেশানো খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বেন, নার্সিংহোমে যাবেন, জীবন নিয়ে একটু টানাটানি হবে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত যমরাজ জিতবে না…আপনিই জিতবেন। আর…বুঝতেই পারছেন, আপনাকে সন্দেহ করার কোনও প্রশ্নই উঠবে না…।’
টেবিলে চাপড় মেরে বক্তৃতা শেষ করলেন বৃদ্ধ। মুখে তৃপ্তির হাসি। কারণ, ব্যাপারটা তিনি ক্লায়েন্টকে ঠিকমতো বোঝাতে পেরেছেন।
পীতাম্বরও মনে-মনে খুশি হয়েছিলেন। সত্যিই এই প্ল্যানটায় হিসেবের কোনও ফাঁক নেই। তবে একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে: বিষটায় কোনও গন্ধ নেই তো! খাবারে মেশানোর পর যদি উৎকট কোনও গন্ধ পাওয়া যায়…?
সেই প্রশ্ন করতেই বৃদ্ধ হেসে বললেন, ‘নো প্রবলেম। মাংসের ঝোল।’
‘মাংসের ঝোল মানে?’
‘আপনার ওয়াইফ মাংস খেতে পছন্দ করেন তো?’
‘পছন্দ মানে! ও পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণী। কষা মাংস ওর হট ফেবারিট।’
‘চমৎকার। বেশ করে মশলাপাতি দিয়ে কষে মাংস রান্না করার বন্দোবস্ত করবেন। মানে, দুজনের জন্যে। তাতে আমি যে-শিশিটা দেব ওটার লিকুইডটা পুরোটা ঢেলে দেবেন। ব্যস—কাজ শেষ।’
ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন পীতাম্বর। কোথাও কোনও রিস্ক ফ্যাক্টর আছে কিনা সেটাই খতিয়ে দেখছিলেন। পদ্মাবতীর মুখটা মনে পড়ল ওঁর। কল্পনায় দেখলেন, সেই সুন্দর মুখটা চোখের পলকে নীল হয়ে গেল।
মনে-মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। এখন পিছিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। তাই বৃদ্ধের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কত?’
‘বিশহাজার।’
‘বিশহাজার?’ আলট্রানিউ পয়জনের দাম শুনে আঁতকে উঠলেন পীতাম্বর।
‘হ্যাঁ, স্যার—বিশহাজার।’ হাসলেন বৃদ্ধ: ‘দামটা বেশি মনে হলে আপনি বরং ছুরি দিয়ে কাজ সেরে নিন—বিশটাকায় হয়ে যাবে। আর যদি ঘরোয়া কোনও ব্লান্ট ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করেন তা হলে পুরো বিনিপয়সায় হয়ে যাবে…।’ একটু কেশে নিয়ে আরও যোগ করলেন, ‘আপনার যা সমস্যা তাতে বিশহাজার তো জলের দর!’
পীতাম্বর টাকা খরচ করার চেয়ে জমাতেই বেশি ভালোবাসেন। পদ্মাবতীর উচ্ছৃংখল খরচের লাটসাহেবিয়ানা পীতাম্বরকে ভেতরে-ভেতরে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। তাই বৃদ্ধের মুখে বিষের দাম শুনে তিনি রীতিমতো ধাক্কা খেয়েছেন। কিন্তু…।
এ ছাড়া উপায়ও তো নেই।
তবে একটাই সান্ত্বনা, এই বিশহাজার টাকা খরচ করার পর তিনি পদ্মাবতীর বেপরোয়া খরচের জ্বালাপোড়া থেকে মুক্তি পাবেন—চিরকালের জন্যে।
পীতাম্বর মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, ‘ও. কে., এগ্রিড। বিশহাজার।’
‘আপনি বুদ্ধিমান। থ্যাংক ইউ—’ হেসে বললেন বৃদ্ধ, ‘এবারে আপনার কাজ হল পাঁচহাজার টাকা অ্যাডভান্স দেওয়া। তারপর পরশুদিন সন্ধেবেলা এসে বাকি পনেরো দিয়ে…ইয়ে…মানে ওষুধের শিশিদুটো নিয়ে যাওয়া…।’
পরশু পনেরোহাজার টাকা দিয়ে দেওয়ার পর যদি বাই চান্স ওষুধে কাজ না হয়, তখন?
পীতাম্বর বেশ দোটানায় পড়ে গেলেন। কেস জন্ডিস হয়ে গেলে পীতাম্বর কার নামে অভিযোগ করবেন? আর কার কাছেই-বা করবেন? এই বুড়োটা যদি ডাহা ঠকায়, তখন? আচ্ছা, পরশুদিন পাঁচহাজার দিলে হয় না—তার পরে, কাজ ঠিকমতো চুকে গেলে বাকি দশ?
সে-কথাই বৃদ্ধকে বললেন পীতাম্বর।
বৃদ্ধ হেসে বললেন, ‘হতে পারে—তবে একটা কন্ডিশান আছে। পরশুদিন আপনাকে আইডেন্টিটি প্রূফ আর অ্যাড্রেস প্রূফ নিয়ে আসতে হবে—মানে, ভোটার কার্ড আর লেটেস্ট ইলেকট্রিক বিল কিংবা টেলিফোন বিল নিয়ে আসতে হবে। তা না হলে, আলট্রানিউ পয়জনের কাজ মিটে গেলে যদি আপনি আর টাকা না দেন? তখন আমি কার পেছনে টাকার জন্যে ঘুরব?…যদি রাজি থাকেন তা হলে পাঁচহাজার টাকা দিন—।’
অ্যাড্রেস প্রূফের কথা বলতেই পীতাম্বরের মুখে ফুটে ওঠা অস্বস্তির ভাব বৃদ্ধের নজর এড়ায়নি। তিনি গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘বেকার দুশ্চিন্তা করবেন না। আগেই তো বলেছি, সিক্রেসি আমাদের গুডউইল। ক্লায়েন্টদের ট্রাস্ট যদি একবার চলে যায় তা হলে আমার ব্যবসা দু-দিনেই লাটে উঠবে। সুতরাং—’ একবার কানের লতি চুলকে নিলেন: ‘সুতরাং পরশু সন্ধেবেলা সাতটা নাগাদ নিশ্চিন্তে চলে আসুন আইডেন্টিটি প্রূফ আর অ্যাড্রেস প্রূফ নিয়ে…সঙ্গে ক্যাশ পাঁচহাজার টাকা।’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন: ‘এখন তা হলে পাঁচহাজার দিন…।’
পীতাম্বর নীরবে শর্ত পালন করলেন।
বৃদ্ধ একটা খাতা খুলে ছোট-ছোট হরফে কীসব লিখে নিলেন। তারপর খাতা থেকে মুখ তুলে বললেন, ‘তা হলে এই কথা রইল। পরশু সন্ধে সাতটা।’
