পদ্মাবতী বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। ওর গায়ে গোলাপি নাইটি জাতীয় যে-বস্তুটি চাপানো রয়েছে সেটা বোধহয় কাচের তৈরি। অথবা, গোলাপি রং-টা পদ্মাবতীর গায়ের রং-ও হতে পারে।
বউকে অচেনা পুরুষের চোখ দিয়ে দেখতে চাইলেন পীতাম্বর। সত্যি, ওর সারা শরীরে শুধুই মারকাটারি বক্ররেখা। ওর দিকে তাকানোমাত্রই দুটো জিনিসের কথা মনে পড়ে: সুকুমার রায়ের ‘খাই খাই’ কবিতা, আর ‘আবার খাব’ সন্দেশের কথা।
কিন্তু পীতাম্বর তো আর ‘অচেনা’ পুরুষ নন! তিনবছর আগে তাই ছিলেন। সুতরাং এখন পদ্মাবতীর দিকে তাকালে ও-দুটো জিনিসের কথা ওঁর আর মনে পড়ে না। বরং মনে পড়ে কবিতায় পড়া ‘ডাকিনী যোগিনী এল কত নাগিনী…’ লাইনটা। কিন্তু তা সত্ত্বেও পদ্মাবতীর নেশার টান এড়াতে পারেন না পীতাম্বর। কী করে যেন তিরিশের এই মেয়েটা বাহান্নর পীতাম্বরকে এখনও বশ করে রাখতে পারছে। শুধু মাঝে-মাঝে ভেতরে-ভেতরে উথলে ওঠা প্রচণ্ড বিদ্রোহে ফেটে পড়তে চান পীতাম্বর—কিন্তু ওই পর্যন্তই। কোন এক ম্যাজিকে এই মায়াবী মেয়েটা ওঁকে সামলে নেয়—যেমন, এখন।
স্বামীকে কাছে ডেকে পদ্মাবতী যেভাবে হামলে পড়ে তাঁকে আদর করতে শুরু করল তাতে মেনকাও লজ্জা পাবে। পীতাম্বর অবাক হয়ে কাঠ-কাঠ অবস্থায় আদর খাচ্ছিলেন আর ভাবছিলেন কতক্ষণ ব্যালান্স রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন।
পদ্মাবতীর আদরের কোনও সীমানা নেই। তা ছাড়া কতরকম কলাকৌশল যে ও জানে! ওর পাল্লায় পড়লে চিতায় ওঠা পুরুষও জেগে উঠবে। পীতাম্বরের মনে হচ্ছিল, ব্যাপারটা ঠিক স্বামী-স্ত্রীর আদর নয়, পদ্মাবতী কোনও ব্লু-ফিল্ম-এর শুটিং-এ শট দিচ্ছে।
সে যা দেয় দিক—মনের অনিচ্ছাসত্ত্বেও পীতাম্বরের শরীর অনেকক্ষণ আগেই জেগে উঠেছিল। পদ্মাবতী তাকে মেঝেতে পেড়ে ফেলল। তারপর প্রবল ঝটাপটি করে ডাকিনী-যোগিনীর মতো পীতাম্বরকে কাবু করে বলতে গেলে ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিল।
একটু পরে পদ্মাবতী উঠে দাঁড়ালেও পীতাম্বর তুলোঠাসা পুতুলের মতো এলোমেলো হাত-পা ছড়িয়ে মেঝেতে পড়ে রইলেন। বড়-বড় শ্বাস নিয়ে হাঁপাতে লাগলেন। তৃপ্তিতে ঘুম পেয়ে যাচ্ছিল প্রায়। কিন্তু এখনই অফিসে বেরোতে হবে—কামাই করা যাবে না। তাই জোরে মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে পদ্মাবতীর ঘোর কাটালেন পীতাম্বর। শরীরটা আধপাক গড়িয়ে খানিকটা হামাগুড়ি দিয়ে হাতে-পায়ে ভর দিয়ে ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
পদ্মাবতীর দিকে তাকালেন পীতাম্বর। সত্যি, এসব ব্যাপারে ওর ক্যালির কোনও জবাব নেই। তখন পীতাম্বরের ওকে দারুণ লাগে। কিন্তু বাকি সময়টা অসহ্য।
পীতাম্বর একটু সঞ্চয়ী মনের মানুষ। ফলে আয় করেন দু-হাতে, কিন্তু ব্যয় করেন কড়ে আঙুলে। আর পদ্মাবতী যেন সেই ‘সঞ্চয় প্রকল্প’-এর পদ্ম বনে মত্ত হাতি। দু-হাতে খরচ করাটাই ওর প্রথম কথা এবং শেষ কথা। ব্যাপারটা অপছন্দ হলেও পীতাম্বরের কিছু করার নেই। কারণ, পদ্মার নেশায় পড়ে ওকে বিয়ে করার সময় সব সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানা ওর নামে লিখে দিয়েছেন।
‘কী হল? কী ভাবছ?’
পীতাম্বর চমকে উঠে বললেন, ‘কই, কিছু না তো?’
পদ্মাবতী জলতরঙ্গের শব্দ করে হাসল। পীতাম্বরের সামনেই ড্রেস বদলাতে শুরু করল। নতুন পোশাক পরতে-পরতে বলল, ‘শোনো, দুপুর দুটো নাগাদ জিমি আসবে। তারপর আমরা একটু বেরোব…ফিরতে রাত হবে…। তুমি ডিনার করে শুয়ে পোড়ো…।’
পীতাম্বরের গা জ্বালা করে উঠল। এই জিমিটার জন্যই পদ্মাবতীকে আরও অসহ্য লাগে। ছেলেটার যেমন কুকুরের মতো নাম তেমনই কুকুরের মতো স্বভাব। সবসময় পদ্মাবতীকে ঘিরে ছোঁকছোঁক করছে। জিভ বের করে লালা ঝরাচ্ছে।
পীতাম্বর ভালো করেই জানেন, পদ্মাবতী ডিভোর্স চায় না—জিমিকে বিয়ে করতেও চায় না। কারণ, পীতাম্বরের টাকাপয়সা, এসি ফ্ল্যাটের আরাম, প্রিমিয়াম গাড়ির নরম গদি সবই পদ্মার দারুণ পছন্দ। তার পাশাপাশি ওর দরকার একটা পোষা তেজি যুবক—যে সবসময় মুখবুজে ওর ফরমাশ খাটবে আর ওর প্রবল আহ্লাদের চাপে কখনও কাহিল হয়ে পড়বে না। ফলে পদ্মাবতী যে উৎফুল্ল থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু পীতাম্বর? সবসময় অসহ্য এক টানাপোড়েনের মধ্যে বেঁচে রয়েছেন—নাকি মরে রয়েছেন! চোখের সামনে রোজ জিমির হ্যাংলাপনা পীতাম্বরের মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পদ্মার মুখের ওপর কিছু বলতে পারেন না—শুধু ভেতরে-ভেতরে ছটফট করেন।
যদি পদ্মাবতীকে কোনওভাবে সরিয়ে দেওয়া যেত? তা হলে জিমির সমস্যাটাও আর থাকত না। পীতাম্বরের গলায় এঁটে বসা ফাঁসটা খুলে যেত তখন।
সেই দিনটার কথা ভেবে পীতাম্বরের মন ভালো হয়ে যায় পলকে। ইস, যদি…।
পদ্মাবতী চোখের সামনে থেকে সরে যাওয়ার পরেও পীতাম্বর ঘোর লাগা মানুষের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। আসলে তখন ভাবছিলেন, কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ‘আলট্রানিউ পয়জন গেম’ মেইলটার মধ্যে।
বিষ মেশানো খাবার একই টেবিলে বসে খাবে ছ’জন। কিন্তু মারা যাবে চারজন। দুজন দিব্যি বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকবে। এটা কীভাবে সম্ভব?
আপনি কি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন?
বিষ মেশানো খাবার একইসঙ্গে বসে সমানভাবে ভাগ করে খাবে তিনজন। কিন্তু মারা যাবে দুজন। তৃতীয়জন বেঁচে থাকবে।
