অশোক হাত বাড়িয়ে একটুকরো কাবাব পেঁয়াজ আর ক্যাপসিকাম সমেত গুছিয়ে নিলেন। সস মাখিয়ে মুখে দিয়ে তৃপ্তি করে চিবোতে-চিবোতে বললেন, ‘উঁ, একসেলেন্ট। হ্যাঁ, আপনি কী যেন বলছিলেন…।’
‘হ্যাঁ…বলছি। শুনলে আপনার অবাক লাগবে…সীমারেখা কখনও সেভাবে আমাকে ভালোবাসেনি। ও আমাকে—।’
আমাকে বাধা দিয়ে অশোকেন্দু বললেন, ‘ওসব গালগল্প ছেড়ে আসল কথা বলুন।’ তারপর গ্লাসে চুমুক দিলেন।
‘বিশ্বাস করুন, এটাই আসল কথা। এটাই ভেতরের কথা। আর এটা আমি জেনেছি মাত্র তিনদিন আগে। অথচ ওকে বিয়ে করব বলে আমি মনে-মনে তৈরি ছিলাম। আমি…মানে, আমরা দুজনেই তৈরি ছিলাম।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘সবই আমার কপাল! সেদিন যখন রেখাকে বললাম, ”এসো, এবার একটা দিন ঠিক করে সাতপাক হয়ে যাক,” তখন ও বেঁকে বসল। বলল, ”কেন, এই তো বেশ চলছে—এটা খারাপ কী! ডিভোর্সের ব্যাপারটা খুব ডেলিকেট। আমি অনেক ভেবে দেখেছি…আমি ওসব পারব না। প্লিজ, তুমি একটু আমার দিকটা ভেবে দ্যাখো…।”
‘ব্যস, সব আশনাই শেষ। বললাম না, সবই আমার কপাল। সারাটা জীবন আমি ব্যর্থ প্রেমের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। তাই আমি ড্রিঙ্ক করি মনের দুঃখে।’
আমি একটুকরো কাবাব মুখে দিলাম। স্বাদ নিতে-নিতে আয়েস করে চিবোতে লাগলাম। অশোকেন্দু কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখছিলাম। চোখ না সরিয়েই টিফিনবাস্কের দিকে হাত বাড়ালেন। বললেন, ‘আপনার কাবাবে ভাগ বসাচ্ছি…আপনি কিছু মাইন্ড করছেন না তো?’
‘দুর, কী যে বলেন! রেখার খোঁজে আপনি আসতে পারেন ভেবেই বেশি করে তৈরি করেছি।’
‘আপনি এটা রান্না করেছেন নাকি?’ ব্যঙ্গের সুরে প্রশ্ন করলেন অশোক।
‘হ্যাঁ। কেন, খেতে খারাপ লাগছে?’
‘না, না। দারুণ…।’
‘আসলে ব্যাচিলার মানুষ। একা-একা থাকি। তাই রান্না শিখতে হয়েছে বহুকাল আগেই…। যাকগে, যা বলছিলাম…।
‘প্রথম আমি ভালোবেসেছিলাম তানিয়া চৌধুরীকে। হয়তো ও-ও আমাকে। তারপর একদিন বিয়ের কথা উঠল। তাতে ও অসভ্যের মতো হেসে ফেলল। বলল, আমার সঙ্গে নাকি বন্ধুত্ব করা যায়, কিন্তু বিয়ে করা যায় না। হঠাৎ আমার মধ্যে এমন বিয়ের বাতিক জেগে উঠল কেন…বেশ তো চলছিল। তো এইরকম সব কথাবার্তা বলল তানিয়া। বিয়ে করার সাধটা যে একটা বাতিক সেটা ওর কাছেই প্রথম জানলাম।
‘কিন্তু আমার মুশকিলটা কোথায় জানেন, মিস্টার বোস? আমি কখনও হার মানতে শিখিনি। তাই একদিন ডেকে পাঠালাম তানিয়াকে…ওকে গঙ্গার ধারে আসতে বললাম…আউটরাম ঘাটে।’
কথার ফাঁকে-ফাঁকে কাবাব আর গ্লাস চলছিল। গ্লাস খালি হলেই আমি সোডা, জল আর ইয়ে মিশিয়ে দিচ্ছিলাম। আর আয়েস করে কাবাব চিবোচ্ছিলাম দুজনেই।
‘তারপর?’ আগ্রহে জানতে চাইলেন অশোক। ওঁর চোখে কৌতুকের খেলা দেখে বুঝতে পারছিলাম আমার গল্পটা এখনও গল্পই থেকে গেছে ওঁর কাছে।
‘…তানিয়া এল। সন্ধে হল। দুজনে বসে অনেক গল্প করলাম। আমি অনেক কান্নাকাটি করলাম। তারপর হঠাৎ ওকে খুন করে ফেললাম।
‘নির্জন রাত। নরম গলা। আর আমার শক্ত হাত। কোনও অসুবিধেই হল না ওকে খতম করতে।’ মুখের কাবাবের টুকরোটা শেষ করে গ্লাসে চুমুক দিলাম: ‘পরদিন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ওর ডেডবডি পাওয়া গিয়েছিল। ওর প্রেমিক হওয়ার সুবাদে পুলিশ আমাকে প্রচণ্ড হ্যারাস করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে পারেনি। কারণ, কোনও প্রমাণ ছিল না ওদের হাতে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘ব্যস। তানিয়া শেষ—তানিয়ার গল্পও শেষ। এবার কুন্তলিনীর গল্প শুরু…।’
অশোকেন্দুর মুখ থেকে কৌতুকের আস্তরণ অনেকটা সরে গেছে। শান্তভাবে গ্লাসে চুমুক দেওয়ার চেষ্টা করলেও লক্ষ করলাম, ওঁর হাত কাঁপছে। একটু যেন উশখুশ করছেন এখন।
‘কুন্তলিনী কে?’
‘আমার দ্বিতীয় প্রেমিকা। কুন্তলিনী রায়। ও ম্যারেড ছিল—সীমারেখার মতো। ওর হাজব্যান্ডের নাম ছিল অলক।
‘যাই হোক, দ্বিতীয়বারেও সেই একই গল্প। কুন্তলকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসতাম। ওর পাতলা চেহারা, টানা-টানা চোখ আর চওড়া ঠোঁটে যে কী ম্যাজিক ছিল কে জানে! তা ছাড়া খুব সুন্দর গান গাইতে পারত। ওর দিকে তাকিয়ে আমি সব ভুলে যেতাম। তাই ওকে ”ছেলেভোলানো মেয়ে” বলে ডাকতাম—ওকে খ্যাপাতাম।
‘মাসছয়েক চলেছিল আমাদের প্রবল প্রেম। তারপর, এক সন্ধ্যায়, ওর একক সঙ্গীতের আসর শেষ হওয়ার পর ওকে বিয়ের কথা বললাম।
‘না, কুন্তল তানিয়ার মতো বাজে ভাবে হেসে ওঠেনি। বরং খুব সিরিয়াস মুখ করে বলে উঠেছে, ”অলককে আমি ভীষণ ভয় পাই। বেসিক্যালি হি ইজ আ বিস্ট। ড্রিঙ্ক করলে ওর আর কোনও জ্ঞান থাকে না। ডিভোর্স-টিভোর্সের কথা বললে হি উইল জাস্ট গো ওয়াইল্ড। সব রাগে ছারখার করে দেবে, তছনছ করে দেবে। তুমি আমাকে ক্ষমা কোরো, প্লিজ…।”
‘ক্ষমা শব্দটা আমি খুব ঘেন্না করি, মিস্টার বোস। আমার দিকটা কুন্তলিনী মোটেই ভাবেনি। ও আমার সঙ্গে রিলেশানটা শেষ করে দিতে চাইল। তাই আমিও ওকে শেষ করে দিলাম…শেষ…চিরকালের মতো।’
আমি একটুকরো কাবাব তুলে নিয়ে সস ছুঁইয়ে কামড় দিলাম। বললাম, ‘দারুণ টেস্টফুল, না? আসলে এটা একটা স্পেশাল কাবাব…।’
অশোকেন্দুও কাবাব চিবোচ্ছিলেন। একটু যেন থমকে গেলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘শেষ করে দিলেন মানে?’
