হাসলাম আমি: ‘শেষ মানে শেষ। ফুলস্টপ। ওকে আমি ডিনারে নেমন্তন্ন করেছিলাম। বাড়িতেই। সে-রাতে ঝমাঝম বৃষ্টি হচ্ছিল—রাত ন’টায় রাস্তায় কোনও লোক ছিল না। ও এল ভিজে একসা হয়ে। বলল, ওর হাজব্যান্ড ড্রিঙ্ক করে বেহেড হয়ে পড়ে আছে।
‘বেশ জুত করে আমরা ডিনার সারলাম। তারপর ভারী চপারের এক কোপে কুন্তলের গলার নলি কেটে দিলাম। ডাইনিং টেবিলে সে একেবারে রক্তরক্তি কাণ্ড।
‘যাই হোক, মাঝরাত পর্যন্ত খুব খাটুনি গেল আমার। ওর বডিটা টেনে নিয়ে গেলাম বাড়ির পেছনের ছোট বাগানটায়। রক্ত-টক্ত সব ধুয়ে-মুছে নিলাম। তারপর বডিটা ছোট-বড় টুকরোয় কুচিয়ে ছড়িয়ে দিলাম বাগানে।
‘আপনাকে বলা হয়নি, আমার কুকুর পোষার শখ আছে। তিনটে ডোবারব্যাম। কালো রঙের। কান ক্রপ করা। ওদের দু-দিন না খাইয়ে চেন বেঁধে রেখেছিলাম। চেন খুলে দিতেই গন্ধের টানে ওরা ছুটল বাগানে। নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি চলল—তার সঙ্গে চাপা হিংস্র গর্জন। সেদিন প্রায় সারারাত ধরে ওদের ফূর্তি চলেছিল। এবং কুন্তলিনী জাস্ট ভ্যানিশ হয়ে গেল এই দুনিয়া থেকে।’
আমি চাপা বিষণ্ণ গলায় একঘেয়ে সুরে কুন্তলিনীর শেষকৃত্যের কথা শোনাচ্ছিলাম। লক্ষ করলাম, অশোকেন্দু বেশ গোল-গোল চোখ করে আমাকে দেখছেন। প্রাণপণে বুঝতে চেষ্টা করছেন, গল্পটা বানানো, না সত্যি।
গ্লাসে মদিরা ঢাললাম। অশোকেন্দুর গ্লাসেও। তারপর আমরা প্রায় একইসঙ্গে চুমুক দিলাম।
‘পরশু সকালে, এই ন’টা নাগাদ, সীমারেখা আমাকে ফোন করেছিল। ওকে আবার রিকোয়েস্ট করলাম। হতভাগার মতো কেঁদেও ফেললাম। কিন্তু ও অটল-অনড়। যেমন চলছে চলুক না। ডিভোর্সের কথা বলে আমি নাকি ফর নাথিং কমপ্লিকেশান তৈরি করছি। এত অবুঝ হওয়ার কোনও মানে হয়!
আমি কান্না থামিয়ে মন শক্ত করলাম। সীমাকে বাড়িতে ডেকে পাঠালাম…।’
‘হ্যাঁ, পরশু সন্ধে থেকেই ওকে পাওয়া যাচ্ছে না।’ উত্তেজিতভাবে বললেন অশোকেন্দু। সামনে ঝুঁকে কাবাব তুলে নিলেন আবার। চিবোতে-চিবোতে জড়ানো গলায় বললেন, ‘আপনি জানেন রেখা কোথায় আছে। বলুন, ও কোথায়?’
আমি গ্লাসে দুবার চুমুক দিয়ে বললাম, ‘সীমারেখা আমার কাছেই আছে। ও আর ফিরবে না, মিস্টার বোস—।’
অশোকেন্দু আমার শেষ কথাটা হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু ওঁর হাসিটা কেমন শুকনো দেখাল। তবু সহজ হওয়ার চেষ্টায় কাবাব খেতে-খেতে জড়ানো স্বরে বললেন, ‘রেখা ফিরবে না এটা হতেই পারে না। বলুন, ও কোথায় আছে?’
আমি কাবাবসুদ্ধু টিফিনবক্সটা অশোকের মুখের সামনে তুলে ধরে বললাম, ‘এইখানে। এই সীমাকাবাব আমি নিজের হাতে রান্না করেছি—।’
অশোক বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করলেন। কাশতে-কাশতে ওঁর মুখ বেগুনি হয়ে গেল। উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন। যন্ত্রণা কমাতে বুক খামচে ধরলেন। তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন টেবিলের ওপরে। ওঁর গ্লাস, সসের শিশি, সব ভেঙে চুরমার। গোটা টেবিল সুরার গন্ধে ম’-ম’ করে উঠল।
আমি আপনমনেই ঠোঁটের কোণে হাসলাম। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলাম। সীমারেখার নম্বর ডায়াল করলাম।
ও ফোন ধরতেই বললাম, ‘সব শেষ। আর কোনও প্রবলেম নেই। অশোকেন্দু এইমাত্র বিষম খেয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। তোমার সঙ্গে অ্যাট লিস্ট ফিফটিন ডেজ আমার কোনও কনট্যাক্ট থাকবে না। আমাকে একদম ফোন-টোন করবে না। বরং বিধবার রোলে পারফেক্ট অ্যাক্টিং-এর চেষ্টা করো। তুমি এক্ষুনি হোটেল থেকে বাড়ি ফিরে যাও। ও. কে? আই লাভ ইউ, অসীমা…।’
‘আই লাভ ইউ টু—।’ মিষ্টি গলা ভেসে এল।
পরশু থেকে সীমারেখা হোটেল আইল্যান্ড-এ আছে। আর অশোকেন্দুর হার্ট প্রবলেমের খবর ও-ই আমাকে দিয়েছিল। তবে বাকি গালগল্প—মানে, তানিয়া, কুন্তলিনী ইত্যাদি সব আমারই তৈরি।
আমি ছোট্ট করে বললাম, ‘চিয়ার্স’। তারপর আরাম করে গ্লাসে চুমুক দিলাম। একটুকরো কাবাব তুলে নিয়ে সস মাখিয়ে মুখে দিলাম।
সত্যি, নিখুঁত খুনের মজাই আলাদা।
ইনস্পেক্টর রনি ও অলৌকিক সার্কাস (নভেলেট)
সার্কাসের বাঘের খেলা থেকেই যত গোলমালের শুরু।
সার্কাস দেখতে গিয়েছিলাম। একাই। কিন্তু সার্কাস দেখতে আমার এখন আর ভালো লাগে না। কারণ, সার্কাস দেখতে গেলে মনে পড়ে যায় আমার মেয়ে টুসির কথা। ওকে সঙ্গে নিয়ে বেশ কয়েকবার সার্কাস দেখেছি। ও বাঘ-সিংহের খেলা দেখতে ভালোবাসত। লাল-নীল-সবুজ রঙের ম্যাকাও পাখির কেরামতি দেখে ছোট-ছোট হাতে খুব হাততালি দিত। কতই বা বয়েস ছিল তখন ওর–বড় জোর আট। এখন যদি ও আমার পাশে থাকত তা হলে বয়েসটা আরও দু-বছর বেশি হত।
বাঘের খেলা দেখাচ্ছিল রিং-মাস্টার। পরনে সোনালি পোশাক, হাতে বৈদ্যুতিক চাবুক। তাকে ঘিরে নটা হিংস্র ডোরাকাটা বাঘ ভিজে বেড়ালের মতো বসে আছে। দেখে কে বলবে, এদের থাবার এক ঘায়ে এরকম আড়াইজন রিং-মাস্টার খতম হয়ে যেতে পারে!
সার্কাসটা একটু নতুনরকমের। বাঘের খেলা বা সিংহের খেলা দেখানোর সময়ে এরা কোনওরকম লোহার রেলিং ব্যবহার করে না। তার বদলে কাজে লাগায় অদৃশ্য ফোর্স ফিল্ড। সেটা পেরিয়ে জন্তু-জানোয়ার বা মানুষ, কেউই দর্শকদের নাগাল পাবে না। এ ছাড়া, দর্শকদের সুবিধের জন্যে প্রায় দোতলা-সমান উঁচুতে টাঙানো রয়েছে চার-চারটে বিশাল মাপের লিকুইড ক্রিস্টাল টিভি পরদা। তাতে বাঘ আর রিং-মাস্টারের মুখের ক্লোজ আপ ছবি দেখা যাচ্ছিল।
