চোখের কোল বসে গেছে। মাথার চুল উসকোখুসকো। শার্টের দুটো বোতাম খোলা। কপালে ঘামের ফোঁটা। অল্প-অল্প হাঁপাচ্ছেন।
ঘরে ঢুকেই আমার গ্লাসটপ টেবিলের ওপরে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন অশোক, ‘সীমারেখা কোথায়?’
আমি হাসলাম। বললাম, ‘উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? বসুন—।’
‘শিগগির বলুন—রেখা কোথায়?’ অশোকেন্দুর গলা কাঁপছিল।
আমি আর-একটা গ্লাস তৈরি করলাম। সুরা, সোডা এবং জল যথাযথ অনুপাতে মেশালাম। ওঁর সামনে এগিয়ে দিয়ে শান্তভাবে বললাম, ‘বসুন। এটা খেয়ে একটু রিল্যাক্স করুন। আপনি এসেছেন…ভালোই হয়েছে। আপনার সঙ্গে কতকগুলো জরুরি কথা আছে—।’
আমার নির্লিপ্ত মেজাজ দেখে অশোক কেমন যেন হকচকিয়ে গেলেন। ওঁর উত্তেজনার বারুদে ধীরে-ধীরে যেন জল পড়ল। জামার হাতা দিয়ে মুখ মুছলেন। চোখও। তারপর ধরা গলায় বললেন, ‘পরশু থেকে রেখাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আসলে আপনার ইস্যুটা নিয়ে ওর সঙ্গে একটু ঝগড়া হয়েছিল তাতে ও রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ভেবেছিলাম দু-চার ঘণ্টা পর ফিরে আসবে—কিন্তু আসেনি। পরদিন আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছি। সরাসরি সব কথা তো সবাইকে বলা যায় না—তাতে নিজেদেরই কেচ্ছা বেরিয়ে পড়বে।’ বড়-বড় শ্বাস নিলেন অশোক। চেয়ারে বসতে গিয়েও বসলেন না। গ্লাসটা ধরতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘…তবু যতটা সম্ভব ঠারেঠোরে খোঁজ নিয়েছি। খোঁজ পাইনি। সীমারেখা কোথায় কেউই বলতে পারল না। তখন বাকি রইলেন আপনি…।’
কথা বলতে-বলতে টেবিলটাকে পাশ কাটিয়ে আমার কাছাকাছি চলে এলেন অশোক। আচমকা কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, ‘তুই—তুই সব জানিস। বল, রেখা কোথায়?’
অশোক কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বটে, তবু একইসঙ্গে মসৃণ ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে আমার গলায় চেপে ধরেছেন।
‘চেঁচালেই গলা ফাঁক করে দেব। বল, রেখা কোথায়।’
আমি ভয় পেলাম। হঠাৎই গলা শুকিয়ে জিভটা শিরীষ কাগজের টুকরোর মতো ঠেকল। কিন্তু বেশ কষ্ট করে মুখের হাসি-হাসি ভাবটা বজায় রাখলাম। কারণ, কানের নীচে ছুরির ধারালো চাপটা টের পাচ্ছিলাম। কোনওরকমে আওয়াজ বের করে বললাম, ‘বলছি—সব বলছি। আপনি প্লিজ ঠান্ডা হয়ে বসুন। প্লিজ…।’
অশোকেন্দু কী ভাবলেন। গলায় ছুরির ছাপটা নরম হল। বুঝলাম, মানুষটার একরোখা ভাব একটু কমেছে। তাই ‘লোহা গরম থাকতে-থাকতে পেটানো দরকার’ সেই সূত্র মেনে অনুরোধ-উপরোধের বন্যা বইয়ে দিলাম।
কাজ হল। অশোকেন্দু আমার মুখোমুখি চেয়ারে বসলেন। ছুরিটাকে ঢুকিয়ে ফেললেন পকেটে। তারপর: ‘এবার বলুন, সীমারেখা কোথায়?’
আমি গলায় বারকয়েক হাত বুলিয়ে বললাম, ‘আপনি এক্সাইটেড হয়ে এসব কী কাণ্ড করতে যাচ্ছিলেন? যদি সত্যিই ওই ছুরিতে একটা অঘটন ঘটে যেত, আপনি কি পার পেতেন? সীমারেখাই পুলিশে খবর দিত। হয়তো এ-কথাও বলত যে, আমার মার্ডারের ব্যাপারে আপনাকেই ও সন্দেহ করে…।’
অশোকেন্দু অদ্ভুতভাবে হাসলেন, বললেন, ‘অত ভেবে মানুষ খুন করে না। তা ছাড়া খুনের সাক্ষী পুলিশ পাবে কোথা থেকে? আপনার অফিসে তো এখন একটা দারোয়ান ছাড়া আর কেউ নেই। ঢোকার সময় ওকে পাঁচশো টাকা বকশিস দিয়েছি। টাকা নিয়ে ও হাওয়া খেতে গেছে। ও ফিরতে-ফিরতে আমার কাজ শেষ হয়ে যাবে। তা ছাড়া আপনার চেম্বারে ঢোকার প্যাসেজের দরজাটা আমি ভেতর থেকে লক করে দিয়েছি। এখানে আমাদের কেউ ডিসটার্ব করতে আসবে না…।’ টেবিলে আঙুলের টোকা মেরে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন। তারপর:’আর সীমারেখার কথা বলছেন? আপনি খরচ হয়ে গেলে প্রথম ক’দিন হয়তো ও কান্নাকাটি করবে। তারপর সামলে নেবে। আর পুলিশ-টুলিশে খবর ও দেবে না। আপনিই যখন আর নেই তখন পুলিশে খবর দিয়ে ও শুধু-শুধু কেন কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির পাবলিসিটি করবে?’ বরং দু-বেলা খাওয়া-পরা-ফূর্তির নিশ্চিন্ত জীবনকেই বেছে নেবে। আমার টাকায় লাইফকে এনজয় করতে রেখা ভালোবাসে…আমার হাসলেন—তবে এবারের হাসিটা আত্মবিশ্বাসের: ‘…তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে বুঝতে পারছেন?’
আমি ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লাম, বললাম, ‘হুঁ, বুঝতে পারছি—।’
‘তা হলে শিগগির বলে ফেলুন, ‘সীমারেখা কোথায়—।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম: ‘নাঃ, আর লুকিয়ে লাভ নেই। সত্যি কথাটা আপনাকে বলেই ফেলি…।’
‘গুড।’ ঠোঁট বেঁকিয়ে সামান্য হাসলেন অশোকেন্দু।
ওঁর গ্লাসটার দিকে ইশারা করে বললাম, ‘নিন। চিয়ার্স—।’
অশোক গ্লাসটা এবার নিলেন, চুমুক দিলেন। আমার কথা শোনার জন্যে ওঁর চোখ আগ্রহ নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
টেবিলের একপাশে একটা শৌখিন টিফিনবক্স রাখা ছিল। সামান্য ঝুঁকে পড়ে ওটা কাছে টেনে নিলাম।
স্টিলের ঢাকনাটা খুলতেই মাটন কাবাবের ফুরফুরে গন্ধ ঝাপটা মারল। পেঁয়াজ আর ক্যাপসিকাম দিয়ে ফ্রাই করা ছোট-ছোট বোনলেস মাংসের টুকরো।
আমার চেয়ারের পেছনের পরদা সরিয়ে একটা টমেটো সসের শিশি বের করে নিলাম। শিশিটায় ঝাঁকুনি দিয়ে টিফিন কৌটোর চিত করা ঢাকনায় সস ঢাললাম। অশোকেন্দুকে ইশারা করে বললাম, ‘নিন, দারুণ খেতে…।’ তারপর আমি একটুকরো কাবাব তুলে নিয়ে সসে ঠেকিয়ে মুখে ফেললাম: ‘আঃ, গ্র্যান্ড!’
