এ কী, স্যার, আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন যে? কী বলছেন, আমি সবকিছু আপনাদের দেখাইনি? তাই কি কখনও হয়? এই দেখানোটাই যে আমার চাকরি! আপনারা যদি স্যাটিসফাইড না হন, তা হলে কালই মিস্টার সেনগুপ্ত আমার চাকরি খেয়ে নেবেন। এ-দুর্গের দেখাশোনার ভার ওঁর ওপরেই আছে কিনা। কুয়ো? কুয়োটা তো আপনারা দেখলেন, ওই তো! কী বলছেন? ওটা নয়? অন্য আর-একটা কুয়ো? যেখানে—যেখানে তিতু সরকার, মানে তিতির সরকার নামে কচি মেয়েটা আত্মহত্যা করেছিল?
শ-শ-শ-শ! আস্তে, স্যার, আস্তে বলুন! দেখছেন তো, এখনও জনাকয়েক ট্যুরিস্ট ওপাশটায় ঘোরাফেরা করছে। তা ছাড়া, মিস্টার সেনগুপ্ত যদি একবার এসব কথা শুনতে পান, তা হলে আর রক্ষে থাকবে না। তিনি চান না, দশবছর আগেকার ওই ঘটনা নিয়ে কেউ আর কোনওরকম ঘাঁটাঘাঁটি করুক।
হ্যাঁ, কুয়োটা আমি চিনি। কিন্তু ওই যে বললাম, মিস্টার সেনগুপ্তের বারণ আছে। না, স্যার, তা আমি পারি না। তা হলে আমার চাকরিটাই চলে যাবে।…আচ্ছা, আপনি যখন এত করে বলছেন—তা ছাড়া আপনার কাছ থেকে বকশিশ নেওয়ার পর তো আর আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পারি না! কুয়োটা আপনি সত্যিই দেখতে চান? কিন্তু হঠাৎ এ-কুয়ো দেখার সাধ হল কেন বলুন তো? ও, মেয়েটা মারা যাওয়ার পর যে-সব রিপোর্টার এসেছিল, আপনি তাদের মধ্যে ছিলেন? তাই বলুন! কী যেন নাম বললেন মেয়েটার, তিতির সরকার?
না, তখন এ-চাকরি আমি করতাম না। কিন্তু আর-সবাইয়ের মতো খবরের কাগজগুলো খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়েছিলাম। তা হলে স্যার আপনি একমিনিট অপেক্ষা করুন, আমি অন্য ট্যুরিস্টদের বেরোনোর রাস্তাটা দেখিয়ে দিই। তা ছাড়া পাঁচটা প্রায় বাজে, বন্ধ করার সময়ও হয়ে গেছে…।
নিন, এবার বলুন—এখন আর কোনও ভয় নেই। ওঃ, সারাটা দিন যা ধকল গেছে! শেষ দলটাকে বের করে দিয়ে এবার নিশ্চিন্তি! না, আর কেউ এখানে আসবে না। বাইরের জং ধরা ভারি দরজাটায় আমি খিল এঁটে দিয়ে এসেছি। না, না, বাইরের কোনও শব্দই এখানে শোনা যায় না, আর সেইজন্যেই আমাদের কথাও বাইরের কোনও প্রাণীর কানে যাবে না—অবশ্য নিশাচর প্যাঁচাদের কথা আলাদা। এই অন্ধকার ঠাসা দুর্গেই ওদের রাজত্ব। তা ছাড়া সন্ধেও তো হয়ে এল।
আপনি ওই কুয়োটা তা হলে দেখতে চান? যেখানে তিতির সরকার নামে মেয়েটা ডুবে মারা গিয়েছিল? কিন্তু কাজটা করা আমার ঠিক হচ্ছে না। মিস্টার সেনগুপ্ত যদি একবার জানতে পারেন, তা হলে ভীষণ রেগে যাবেন। না, আপনি ঠিকই বলেছেন, তাঁকে জানানোরই—বা দরকার কী? হাঃ-হাঃ-হাঃ…।
আসুন, স্যার, এদিক দিয়ে আসুন। এই বড় হলঘরটা পেরিয়ে আমাদের যেতে হবে। আমাকে আপনার পেছন-পেছন আসতে বলছেন? আমার কিন্তু অবাক লাগছে, না বলতেই ঠিক রাস্তাটা আপনি চিনলেন কী করে! দেখবেন, সাবধান, এখানকার পাথুরে মেঝেটা ভীষণ এবড়োখেবড়ো।
দশবছর আগেকার ওই ইতিহাস নিয়ে কেউ আবার নতুন করে চর্চা করুক, সেটা মিস্টার সেনগুপ্ত পছন্দ করেন না। কেন জানেন? কারণ, ওই ঘটনা ওঁর মানসম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। মিস্টার সেনগুপ্তকেই গ্রামের লোকেরা তিতির সরকারের লাভার বলে সন্দেহ করেছিল। ওই লাভারই মেয়েটাকে ধীরে-ধীরে ঠেলে দিয়েছিল মৃত্যুর দিকে। সন্দেহ করার কারণও অবশ্য ছিল। মানে মেয়েটা ছিল মিস্টার সেনগুপ্তের কারখানার ফোরম্যানের বউ। ওরা ওঁর বাড়ির কাছাকাছিই থাকত। ফলে সরকারদের সঙ্গে ওঁর বেশ মেলামেশা ছিল। আর চুপিচুপি বলি স্যার, তিতির সরকারকেও সেনগুপ্তসাহেবের মনে ধরেছিল। বলতে গেলে তিনি ওদের পরিবারেরই একজন হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে মেয়েটা ওভাবে মারা যাওয়ার পর ওঁকেই যে লোকে সন্দেহ করবে এ আর বেশি কথা কী! উনি যদি একবার জানতে পারতেন কারা ওঁর নামে এইসব বাজে কথা রটাচ্ছে, তা হলে আর দেখতে হত না—তাদের কোর্ট পর্যন্ত দৌড় করিয়ে ছাড়তেন। একবছর ধরে তো ওঁর সংসারে অশান্তি লেগে ছিল। বউয়ের সঙ্গে দিনরাত উনি ঝগড়া করে গেছেন। বারবার বলেছেন, ওঁর কোনও দোষ নেই। আমরা ভেবেছিলাম, মিসেস বোধহয় ওঁকে ছেড়েই চলে যাবেন…যাক সে-কথা, এখন ওঁরা বেশ সুখে আছেন, তা ছাড়া দশবছর সময়টাও তো নেহাত কম নয়। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, এখন যদি আবার সেই পুরোনো কাসুন্দি নিয়ে জিভ চালাচালি হয়, তা হলে আমার অবস্থাটা কী হবে! না স্যার, আপনার কথা আমি বলছি না, আপনি সেরকম লোকই নন। তাই যদি ভাবতাম, তা হলে আপনাকে এত সব কথা বলতামও না, আর ওই কুয়োটা দেখাতাম না।
লোকে বলে, মেয়েটা নাকি আশ্চর্যরকম সুন্দরী ছিল। বয়েসও ছিল খুব কম—মাত্র একুশ। গায়ের রং ছিল যেন দুধে-আলতা। লোকে বলে, খবরের কাগজে মেয়েটার যে-ছবি ছাপা হয়েছিল, তার চেয়ে অন্তত একশো গুণ সুন্দরী ছিল ও। চোখ ছিল কালো হিরের মতো উজ্জ্বল, চকচকে। কী বলছেন, কালো নয়? একটু কটা চোখে? কী জানি, হবে হয়তো। কারণ সবই আমার শোনা কথা, আর আপনি নিজে তো রিপোর্টার হিসেবে স্পটে হাজির ছিলেন। দেখবেন, সিঁড়ির শেষ ধাপটা খেয়াল রাখবেন—ওটা খানিকটা ভাঙা আছে। কিন্তু…কটা চোখ বলছেন? না, স্যার, এ নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে তর্ক করতে চাই না। শুধু ভাবছি আপনার কী স্মৃতিশক্তি!
যাকগে, মোটের ওপর মেয়েটা ছিল অল্পবয়েসি, অসম্ভবরকম সুন্দরী, নিষ্পাপ, আর কিছুটা সরল প্রকৃতির—সাধারণত গ্রামের মেয়েরা যা হয়ে থাকে। ওর বাবা মিস্টার সেনগুপ্তের বাগানেই মালির কাজ করত। আপনি হয়তো ওকে কখনও দেখেননি। না, না, খবরের কাগজওলাদের দেওয়ার মতো নতুন কোনও খবর ওর কাছে ছিল না। তবে লোকটা ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিল। তারপরই তো ওর স্ট্রোক মতন হল। তখন মিস্টার সেনগুপ্ত ওকে টাকাকড়ি দিয়ে কাছাকাছি একটা চাকরিতে লাগিয়ে দেন। তারপর…দেখবেন, চৌকাঠে হোঁচট খাবেন না যেন। এইখান থেকেই শুরু হল অন্দরমহল। একটু দাঁড়ান, হ্যারিকেনটা জ্বেলে নিই। মাঝে-মাঝে সন্ধের পর আমি এদিকটায় আসি, তাই একটা হ্যারিকেন সবসময়েই এই দরজার পাশটায় রাখা থাকে। কী বললেন? কেন আসি? হুঁঃ—সে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন! কেমন যেন নেশার মতো হয়ে গেছে।…দেশলাই আছে আপনার কাছে? আমারটা দেখছি একেবারে খালি! হ্যাঁ, এই—ই—ব্যস! নিন, এবার চলুন—।
