আরে, ভয় পেলেন নাকি? হ্যাঁ, তা ভয় পাওয়ারই কথা। যেভাবে মূর্তিটা বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, দেখে একেবারে জীবন্ত বলে মনে হয়। বর্শার ফলাটা দেখেছেন? একটু বাঁকানো। কেমন যেন অদ্ভুতরকমের, তাই না? কেন বানানো হয়েছিল মূর্তিটা? কী করে জানব বলুন! সবই রাজা-বাদশাদের খেয়াল। তবে মনে হয়, অন্দরমহলের যাদের ঢোকার হুকুম নেই, তাদের সাবধান করে দেওয়ার জন্যেই এটাকে তৈরি করা হয়েছিল। তা যে জন্যেই তৈরি হয়ে থাকুক, বাচ্চারা কিন্তু এটা দেখে ভীষণ মজা পায়। সত্যি কথা বলতে কী, যখন সব ট্যুরিস্টদের ফোর্ট দেখানো শেষ করে আমি সন্ধের পর জায়গাটা টহল দিতে বেরোই, তখন এই বাঁকানো ফলার বর্শাটা আমার সঙ্গে নিই। ওটাকে আমার কেমন বন্ধু বলে ভাবতে ভালো লাগে। এক হাতে হ্যারিকেন, এক হাতে বর্শা নিয়ে যখন মহল থেকে মহলে ঘুরে বেড়াই, তখন আমার নিজেকেই ১৭০০ সালের প্রেত বলে মনে হয়। অন্ধকারে এই জায়গাটা যেন ধীরে-ধীরে জেগে ওঠে। যদি আপনার আপত্তি না থাকে, স্যার, তা হলে বর্শাটা আমি সঙ্গে নিচ্ছি। দেখেছেন তো, এতদিনের জিনিস হলেও এখনও কেমন ঝকঝক করছে! আসলে আমিই এটাকে শান দিয়ে পালিশ করে নতুনের মতো করে রেখেছি—এইজন্যেই মূর্তিটার টান বাচ্চাদের কাছে অনেক বেড়ে গেছে।
…হ্যাঁ, এটাই সেই অভিশপ্ত কুয়ো। সেই ঘটনার পরই এই লোহার ঢাকনাটা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনার নিশ্চয়ই ভেতরটা দেখতে ইচ্ছে করছে? কী বলছেন, আমার আপত্তি না থাকলে? না, না, আমার আবার আপত্তি কীসের! দেখানোটাই যে আমার কাজ। ওই তো, ঢাকনার মধ্যিখানে যে-আংটাটা লাগানো রয়েছে, এই বর্শার হাতলটা ওর ফাঁকে ঢুকিয়ে চাড় দিলে ঢাকনাটা সহজেই খুলে যাবে। তা ছাড়া এটা খোলা আমার অভ্যেস আছে…এই নিন, এবার দেখুন…।
দেখছেন, কুয়োর ভেতরের গা বেয়ে জং ধরা লোহার সিঁড়ি কেমন খাড়া নেমে গেছে? আগেকার দিনে এইরকম সিঁড়ি খুব ব্যবহার করা হত।…এই সিঁড়ি বেয়েই তো ভেতরে নেমে গিয়েছিল তিতিরের স্বামী। তুলে এনেছিল কচি বউয়ের ডেডবডি। ভাবা যায় না, তাই না? কিন্তু লোকটা বুঝতে পেরেছিল, ওর জন্যেই ওর বউ সুইসাইড করেছে। সেইজন্যেই হয়তো ওইরকম সাহসের কাজ করতে পেরেছিল।
তিতিরের স্বামীর খবর জিগ্যেস করছেন? কেন, শোনেননি আপনি? ওই ঘটনার পর সে পাগল হয়ে যায়। তখন তাকে পাঠানো হয় পাগলা-গারদে। এখনও সে সেইখানেই খাঁচায় বসে আছে।
যদ্দুর আমি শুনেছি, মেয়েটা অনেকদিন ধরেই স্বামীর আড়ালে ওইসব লটরপটর চালিয়ে যাচ্ছিল—বুঝতেই তো পারছেন…। তারপর একদিন যখন মেয়েটা বুঝল, ওর পেটে বাচ্চা এসেছে, তখন ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। এত খোলামেলা ভালোবাসার জন্যে নিজেকেই শাপশাপান্ত করতে লাগল। তখন একদিন ও গেল ওর ভালোবাসার লোকের কাছে; জানতে চাইল, এখন ও কী করবে—।’
এবং লোকটা ওকে বোকার মতো কথা বলতে বারণ করল। বলল, এর মধ্যে করাকরির কী আছে? ওর তো জলজ্যান্ত স্বামীদেবতা রয়েছে একটা; তা হলে আবার ভয় কীসের! শুধু ওকে যা করতে হবে, তা হল মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ বসে থাকা। ব্যস!
কিন্তু সে বুঝল, তার প্রস্তাবটা তিতিরের পছন্দ হয়নি। নিজের স্বামীকে ঠকিয়ে বাচ্চার দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা ওর মোটেই ভালো লাগছে না। তিতির চেয়েছিল, সেই বিপদের সময় সে এসে ওর পাশে দাঁড়াক; চেয়েছিল, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে; চেয়েছিল, নিজের স্বামীকে আবার আগের মতো ফিরে পেতে। কারণ, আমার মনে হয়, মেয়েটা ওর স্বামীকে সত্যিই প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত; শুধু ওই লোকটার চটকের কাছে ওর ভালো-মন্দ জ্ঞান কদিনের জন্যে গুলিয়ে গিয়েছিল…।
যাকগে, সে-কথা থাক, আসল কথায় ফিরে আসি। তারপর সেই লাভার ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। বলল, কিছুদিন তাকে ভাবার সময় দেওয়া হোক। তারপর তারা এ নিয়ে আবার আলোচনা করবে; দেখবে, কী করা যায়। এবং পরদিন তিতিরকে রেখে সে গ্রাম ছেড়ে সটকে পড়ল—জানি না কোথায়।
না, স্যার, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি তো তখন এখানে ছিলাম না, তাই সব কিছু ঠিক-ঠিক জানাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শুধু কল্পনার রং মিশিয়ে গল্পটা আপনাকে বলছিলাম। হয়তো আসলে ঘটনাটাই ছিল অন্যরকম। না, আপনার কথামতন, মিস্টার সেনগুপ্তই যদি সেই লোক হন, তা হলে তিনি পালাননি—গ্রামেই ছিলেন এবং তাঁকে নিয়ে যথারীতি জঘন্য কাদা ছোড়াছুড়িও হয়েছিল। কিন্তু এখন শুধু আমি নয়, গ্রামের আরও অনেক লোকের ধারণা, মিস্টার সেনগুপ্ত হয়তো সত্যিই নির্দোষ ছিলেন।
যাই হোক, মেয়েটা ওর স্বামীর কাছে গিয়ে সরাসরি সব ঘটনা খুলে বলল—শুধু তার নামটুকু ছাড়া—সে-নাম ও কাউকেই বলেনি। সব শুনে সে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তা হওয়ারই কথা; কারণ, লোকে বলে, সে নাকি বউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করত, ভীষণ ভালোবাসত ওকে। শুনেছি, তিতিরকে ওই ঘটনার জন্যে সে কোনওরকম বকাঝকা করেনি। শুধু শান্ত নির্বাকভাবে মেয়েটার অবাক চোখের সামনে আস্তে-আস্তে বেরিয়ে গিয়েছিল। এবং যখন জলভরা চোখ নিয়ে মেয়েটা তাকে অনুসরণ করল, পা জড়িয়ে ধরল, তখন সে আর সইতে পারেনি—ঘুরে দাঁড়িয়ে এক চড় মেরেছিল বউয়ের গালে। নিজের কষ্ট-পাওয়া মনের অবস্থাটা সে আর চাপতে পারেনি। বলেছিল, শেষ পর্যন্ত এই আমার পাওনা ছিল?
