হীরার খবরটাই আপনাকে দিতে এসেছিলুম, স্যার। ভেবেছিলুম আপনি বকশিশ দেবেন। কী বলছেন…আপনার মন-মেজাজ ভালো নেই! আগেই আপনি খবরটা পেয়েছেন? তা হলে তো আমার বকশিশটাই মার গেল, স্যার। তা যাক। আপনার দয়া আমি কোনওদিন ভুলব না। আমার বউ সাত জন্মে যে-সুখ পেত না, সেই সুখ ওকে আপনি দিয়েছেন–হ্যাঁেক না কেন এক রাতের জন্যে! আমার আধপেটা সংসারকে সিকি-পেটা হওয়ার হাত থেকেও বাঁচিয়েছেন। কী বলছেন, স্যার? ঠিক বুঝতে পারলেন না? ও, হীরু আপনাকে বলেনি বুঝি ওর পেটে খোকা ছিল! তিন মাসের। বলেনি? হাঃহাঃহাঃ–দেখেছেন, কী বদমায়েশ! বরাবরটা আমার সঙ্গে ওরকম ছেনালি করত। আপনি কি চমকে উঠলেন, স্যার? জানেন, আমিও প্রথম শুনে ওরকম চমকে উঠেছিলুম। কোত্থেকে খাওয়া জোটাব এই নতুন পেটের? আমার দিনমজুরি, আর হীরুর ঝি-গিরি…ওতে কি হয়? আমরা স্যার মুখসুখ মানুষ, জন্মরোধের কায়দাকানুন জানি না। তাই গোলমাল যত আমাদেরই হয়। তবে আপনি খুব বাঁচিয়েছেন, স্যার। এখন হীরাও গেছে, বে-আক্কেলে বাচ্চাটাও গেছে। আপনার আশীর্বাদে আমি এখন বোধহয় পুরো পেট খেতে পাব। এ কী, স্যার! এক ঢোকে বোতলের ঘোড়ার লেজ ছুঁয়ে ফেললেন? আমরা যেরকম ঢোক ঢোক জল খেয়ে পেট ভরাই, আপনিও সেরকম, স্যার? যত দেখছি, সত্যি অবাক হচ্ছি।
ভালো খবর তো শোনালাম, স্যার। এবার খারাপও একটু আছে, সেটাও বলে ফেলি। তবে আমাকে কোনওরকম দোষ দেবেন না, স্যার। আমি আপনার ভালোই চাই, তাই তো এসেছি। একটা কথা কী জানেন স্যার, কাল রাতের ব্যাপারটায় হীরু বোধহয় তেমন খুশি হয়নি। কী করে হবে! ও যে আমার চেয়েও মুখ, বোকা। ও গান করে করে সবই বলল বটে কিন্তু তারপর পেটে দু হাত চেপে এমন পাগলের মতো চিৎকার শুরু করল যে, সারা বস্তির লোক একেবারে ছুট্টে এল। ও খালি চিৎকার করে বলছিল স্যার, আপনাকে ছাড়বে না। কিছুতেই ছাড়বে না–আরও কত কী। কিন্তু, সত্যি বলতে কী স্যার, সব শুনে প্রথমটা আমারও যে একটু রাগ হয়নি তা নয়। কিন্তু আমি কী করতে পারি, স্যার। আমার এই হাড় বের করা শরীরে শক্তি নেই, আমার মামলা করার পয়সা নেই, আমার একগাদা জোয়ান বন্ধু নেই। তার ওপর আপনার কাছে তো আবার বন্দুক আছে! তাই পরে নিজেকে সামলে নিয়ে ভেবেছিলুম, যা হওয়ার হয়ে গেছে। সবই তো ভগবানের হাত। হাজার হোক, বউটা একবারটি অন্তত মেমসাহেবি ঠাটে থেকেছে। কিন্তু হীরু বোধহয় মানতে পারেনি, স্যার। খালি বলছিল রাত এগারোটায় আমার সব্বোনাশ করেছিস, আমিও রাত এগারোটাতেই তোর সব্বোনাশ করব!…শুনলেও হাসি পায়, স্যার। তবে সকালে উঠে ওর ঝোলানো দেহটা যখন নামাই, তখন ওর মুখটা দেখে ভীষণ ভয় পেয়েছিলুম। চোখ দুটো ভাটার মতো বেরিয়ে আসছে, মাথার চুলগুলো সব এলো, টুকটুকে জিভটা দাঁতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে। যেন সাক্ষাত মা কালী! আপনি কপালে হাত ঠেকালেন, স্যার? আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন! সত্যি, আপনি মহান স্যার, আপনি মহা। যাই হোক, সব লোক যখন জানতে চাইল বউটা মলো কেন, তখন আমার জন্যে বসে না থেকে ওরা নিজেরাই জবাব দিয়ে দিলে খিদে, পেটের খিদে। আমি আর মুখ খুলিনি, স্যার। দুনিয়ার সবাই জানে, গরিবরা পেটের জ্বালাতেই মারা যায়।
হীরুকে পুড়িয়ে গঙ্গাচান করে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল, স্যার। পোড়ানোর টাকা তো ছিল না। ওকে ফুটপাথে ফেলে লোকের কাছ থেকে ভিক্ষে করে টাকা তুলতে হয়েছে। বেলা যত বেড়েছে ওর শরীরটা তত ফুলে ফেঁপে উঠেছে, ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি ভনভন করতে শুরু করেছে। কিন্তু কী করব, স্যার..কী বলছেন? আপনার কাছে আসতে পারতাম? না, স্যার, ছিঃ, তা হলে আপনার চরিত্রে যে কালি লাগত! সে কি প্রাণ থাকতে আমি করতে পারি? জানেন, স্যার, এখানে আসার আগে দুটো ঘণ্টা মাঠে-ঘাঠে বেড়িয়েছি। বস্তির ঝোঁপড়ায় আর ফিরতে পারিনি। মনটা কেমন হু হু করে উঠেছে। হাজার হলেও বউটা আমার খারাপ ছিল না, স্যার। কিন্তু আপনিও তো কম ভালো লোক নন। তাই তো হঠাৎ খেয়াল হওয়ায় ছুটে এলুম আপনার কাছে। আপনাকে সাবধান করতে। এগারোটা বোধহয় বেজে এল স্যার। ওই তো! আপনার বসবার ঘরের দামি দেওয়ালঘড়িতে ঢং ঢং শব্দ শুরু হয়েছে। শুনুন স্যার, শুনুন! এক, দুই, তিন…চার; জানেন, স্যার, হীরু বলেছিল, ঘরের বাতিগুলো দপ করে নিভে গেলে বুঝবে আমি…শুনুন, শুনুনু!..ছয়…সাত…আট– কী হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে, স্যার। জানলা-দরজার পাল্লাগুলো ঠাস ঠাস করে বাড়ি খাচ্ছে ঝড় উঠল বুঝি?নয়–দশ–এগারো–এই যা। কী বলছেন স্যার, লোডশেডিং? আপনি এত বড় লেখাপড়া-জানা লোক হয়ে এই ভুলটা করলেন, স্যার? দেখছেন না, আশপাশের সবকটা বাড়িতেই আলো জ্বলছে! শুধু আপনার বাড়িতেই।
