আমি ছুটে গেলাম ওর কাছে। দেখি ঠোঁট ফাঁক হয়ে আছে, দাঁত দেখা যাচ্ছে, ঠোঁটের কোণে একফোঁটা রক্ত, আর ওর নরম গলায় কালশিটের দাগ।
আমি ভয়ে পাথর হয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি ওর পালস দেখলাম। কোনও সাড় নেই। ওর নাকের কাছে হাত রাখলাম। না, নিশ্বাস পড়ছে না। তখন ঝুঁকে পড়লাম ওর শরীরের ওপর। বুকে কান চেপে ধরলাম। না, কোনও শব্দ নেই।
আমি ঘামতে শুরু করলাম। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। ভয়ে-ভয়ে তাকালাম আয়নার দিকে। কোথায় গেল লোকটা? নিশ্চয়ই অপকর্মটি সেরে লুকিয়ে পড়েছে।
আমি দৌড়ে গেলাম ফ্ল্যাটের দরজার কাছে। যা ভেবেছি তাই! দরজার লক, ছিটকিনি সব ঠিকঠাক রয়েছে। বাইরের কেউ ফ্ল্যাটে ঢোকেনি। সুতরাং আর কাউকে সন্দেহ করার প্রশ্নই ওঠে না। আমি যখন বাথরুমে ঢুকেছি তখনই সুযোগ বুঝে ওই লোকটা বেরিয়ে এসেছে আয়নার ভেতর থেকে। ঘুমিয়ে থাকা নন্দিনীকে নিয়ে নিজের সাধ মিটিয়েছে। তারপর ওকে খুন করে আয়না দিয়ে চম্পট দিয়েছে।
আমি যে এখন কী করি! দরজা খুলে বাইরে গিয়ে কাউকে ডাকাডাকি করতে যাব সে-উপায় নেই। কারণ সেই ফাঁকে লোকটা হয়তো টুক করে বেরিয়ে আসবে আয়না থেকে, তারপর কায়দা করে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে সোজা হাওয়া হয়ে যাবে, তখন তাকে আর কে খুঁজে পাবে!
আমি নন্দিনীকে জাপটে ধরে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করলাম।
কাঁদতে-কাঁদতেই বললাম, তুই আমাকে চেঁচিয়ে একবার ডাকতে পারলি না!
নন্দিনী ফ্যাকাসে মুখে শূন্য চোখে চুপচাপ তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
হঠাৎই আমার দীপেশের কথা খেয়াল হল। ওকে ফোন করে ব্যাপারটা বলি। তারপর বাকি যা ব্যবস্থা করার ও করবে।
দীপেশকে ফোন করতেই ও-প্রান্ত থেকে ওর ঘুম জড়ানো গলা পেলাম।
হ্যালো।
সন্দীপ বলছি।
দীপেশ চমকে উঠল। উৎকণ্ঠার সুরে বলল, কী ব্যাপারে রে, এত রাতে?
আমি ওকে সব বললাম।
দীপেশ স্তম্ভিত হয়ে গেল। অস্পষ্ট গলায় নন্দিনীর নামটা দু-বার বিড়বিড় করল। তারপর বলল, তুই এ কী করলি, সন্দীপ?
আমি?—দীপেশ বোধহয় আমার কথা ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। তাই ওকে বুঝিয়ে বললাম, আমি কিছু করিনি। আয়নার ওই লোকটা গলা টিপে নন্দিনীকে খতম করেছে। আমি এখন ফ্ল্যাটে বসে পাহারা দিচ্ছি যাতে শয়তানটা পালাতে না-পারে। তুই তো আমার থিয়োরিটাকে আমল দিলি না—এবার দেখ, আমার কথা ঠিক হল কি না!
দীপেশ আমার কথা বুঝতে চাইল না। ও শুধু বলেই যেতে লাগল, ছি, ছি, সন্দীপ, তুই এটা কী কাজ করলি! তুই কেন এসব করলি? নন্দিনীকে তুই…।
দীপেশের গলা বুজে এল। আমি শুধু ওর ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
অনেকক্ষণ পর দীপেশ বলল, তুই ফ্ল্যাট ছেড়ে কোথাও যাস না যেন। আমি আধঘণ্টার মধ্যেই লোকজন নিয়ে যাচ্ছি।
না, না, আমি এখানেই আছি—নন্দিনীকে ফেলে আর কোথায় যাব!
ফোন রেখে দিলাম।
তারপর শুধু অপেক্ষা। আয়নার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা আর পাহারা। ওই শয়তান অসভ্য লোকটাকে আমি কিছুতেই ছাড়ব না।
অনেকক্ষণ পর সিঁড়িতে যেন বেশ কয়েকজোড়া ভারী বুটের শব্দ পেলাম। তারপরই কলিংবেল বেজে উঠল। আর একইসঙ্গে ফ্ল্যাটের দরজায় অধৈর্যভাবে ‘দুমদুম’ করে ধাক্কা মারল কেউ।
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দীপেশ লোকজন নিয়ে এসে গেছে। আমার দায়িত্ব শেষ। সব দায়িত্ব শেষ।
ঘুমে দু-চোখ জড়িয়ে আসছে আমার।
আলো নিভে গেলে বুঝবে
স্যার, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি? সবে দেওয়ালঘড়ি রাত দশটা বলছে, সবে আপনার সাদা ঘোড়া মার্কা বোতলের ঘোড়ার কেশর পর্যন্ত খরচা হয়েছে, আর আপনি ঘুমিয়ে পড়লেন। এই সময়েই তো আপনাদের মতো বড়সাহেবদের আশনাই আর ফুর্তি জমে ওঠে, মনটা মরা গরু দেখা শকুনের মতো ডানা ঝাপটায়! ভেবেছিলুম, আপনার এই ফুর্তির সময়ে এসে আরও একটা খুশির খবর শোনাব, তা বুঝি আর হয়ে উঠল না। আমি তো স্যার ভয়ে ভয়ে আসছিলুম, বুকটা ধুকুপুকু করছিল, কালকের দিনটা আমার বুঝি আর আধপেটা খেয়ে থাকতে হবে না!
যতই বলুন স্যার, প্রথমে ঢুকতে গিয়েই সদর দরজাটা খোলা দেখে আমার ভারী আশ্চর্য লেগেছে। আপনি তো দরজা এরকম হাট করে খোলা রাখেন না, তাও আবার রাতে! সোজা তো ঢুকে পড়েছিল, তবে সত্যি করে বলছি, আপনার শোবার ঘরে ঢুকতে কেউই আমায় আটকায়নি। সব চাকরবাকর বোধহয় খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়েছে। আর আমাদের মতো, ছোটলোকদের মতো, আপনার তো স্যার আর একটা বউ থুড়ি–মেমসাহেব নেই যে, যখন-তখন আপনার সুখ-শান্তির বিঘ্ন করবে! আপনার মেমসাহেবরা আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। ভীষণ ব্যস্ত! সত্যি, আপনি দেবতা স্যার, দো! অতগুলো পাপীতাপী মেয়েমানুষকে একা তুষ্ট রেখেছেন। সেইজন্যেই কি স্যার আপনাকে এখন এত ক্লান্ত লাগছে? আপনি ভীষণ বোকার মতো হাত-পা ছড়িয়ে মুখ ঢেকে উপুড় হয়ে আছেন? বিছানাটা লন্ডভন্ড? না কি কাল রাতের পর ওটা আর পাট করে সাফসুতরো করেননি? আপনার চোখেমুখেও কেমন কালির ছাপ। এ একদম বেমানান! কোথায় আপনাকে হাসিখুশি দেখব ভেবেছিলুম..স্যার, স্যার, উঠুন। দেখুন, আমি কে এসেছি! আমি হীরার সোয়ামি, স্যার, হীরার সোয়ামি! এই তো…চোখ মেলেছেন…হা হা, এই যে আমি, আপনার বিছানার পাশে, মেঝেতে। আমরা নীচু জাত, নীচে থাকাই ভালো–যাক গে, যা বলছিলুম, আপনার বেশি সময় আর নষ্ট করব না। প্রথমেই স্যার আপনাকে সেলাম জানাই, অন্তত এক রাতের জন্যে হলেও আমার বউকে মেমসাহেব বানিয়ে দেওয়ার জন্যে! স্যার, হীরা হীরুর কপালে এত সুখ জুটেছে! ওই মখমল বিছানায় ও শুয়েছে! আপনার রাজবাড়ির খাবার খেয়েছে। আপনার ধবধবে চকচকে ফরসা বুখে মাথা রেখে শোয়ার সুযোগ পেয়েছে! আপনি কী দয়ালু স্যার, আমাদের মতো নোংরা ছোটলোকদের ঘেন্না করেন না। হীরার গায়ের রং কালো কুচকুচে বলে ওকে ঘেন্না করেননি। উলটে কালো হীরে বলে সোহাগ করেছেন। হ্যাঁ স্যার, ও আমাকে সবই বলেছে। একটুও বাদ দেয়নি। আমাদের মতো গরিবদের জীবনে এ-সুখ কি বারবার আসে? আপনিই বলুন! হীরা তাই কিছু বাদ দেয়নি, গলায় শাড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ার আগে স্যার গান করার মতো সুর করে সব বলে গেছে। ও খুব ভালো গাইত, স্যার! কিন্তু আমার মতো আধপেটা খাওয়া সংসারের বউ হয়ে বড়সাহেবদের বাড়ি দিনরাত্তির ঝিগিরি করলে কি আর গানের গলা খোলে? কিন্তু কাল রাতের কথা অন্য, স্যার। কাল যে হীরু ভালোমন্দ খেয়েছিল! গান তো গাইবেই!
